গোপালগঞ্জে সহিংসতা
গোপালগঞ্জ প্রতিবেদক
প্রকাশ : ১৯ জুলাই ২০২৫ ২২:৫১ পিএম
এনসিপি নেতাকর্মীদের ওপর হামলা ও সংঘর্ষের পর থেকে মাঝেমধ্যে শিথিল রেখে কয়েকদিন ধরে গোপালগঞ্জে চলছে কারফিউ। এ কারণে খেটে খাওয়া মানুষ থেকে শুরু করে বিপাকে পড়েছে ব্যবসায়ী ও সাধারণ মানুষ। দিন এনে দিন খাওয়া কর্মজীবীরা পড়েছেন সবচেয়ে বেশি বিপদে।
এদিকে জেলাজুড়ে চলছে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সাঁড়াশি অভিযান। প্রতিদিনই গ্রেপ্তার হচ্ছে শত শত লোক। ফলে জনমনে গ্রেপ্তার আতঙ্ক তৈরি হয়েছে। এরই মধ্যে গতকাল রাত ৮টা থেকে আজ রবিবার সকাল ৬টা পর্যন্ত কারফিউ বর্ধিত করা হয়েছে। গতকাল বিকাল ৫টায় জেলা ম্যাজিস্ট্রেট (জেলা প্রশাসক) মুহাম্মদ কামরুজ্জামান কারফিউ বৃদ্ধির ঘোষণা দিয়ে জানান, পরিস্থিতি বিবেচনা করে কারফিউ বিষয়ে পরবর্তী সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে।
গত বুধবার পদযাত্রার অংশ হিসেবে এনসিপির সমাবেশ ঘিরে নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগ ও সহযোগী সংগঠনের কর্মীদের হামলা এবং আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সঙ্গে দফায় দফায় সংঘর্ষে রণক্ষেত্রে পরিণত হয় গোপালগঞ্জ। টানা ৫ ঘণ্টার ওই সংঘাতে নিহত হয় চারজন। পরে আহতদের মধ্যে আরেকজন ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে মারা যায়। সংঘাতের সময় পুলিশ সুপার কার্যালয়ে আটকা পড়া এনসিপির কেন্দ্রীয় নেতারা সেনাবাহিনীর সাঁজোয়া যানে করে গোপালগঞ্জ ত্যাগ করেন। এ সহিংসতার প্রেক্ষাপটে জেলা ম্যাজিস্ট্রেট প্রথমে ১৪৪ ধারা জারি করেন। পরে বুধবার সন্ধ্যা ৬টা থেকে বৃহস্পতিবার সন্ধ্যা ৬টা পর্যন্ত কারফিউ জারি করে। সেই সময় শেষে কারফিউ না তুলে তা অব্যাহত রাখার সিদ্ধান্ত জানায় সরকার।
কারফিউ শিথিল থাকলেও লোকজনের উপস্থিতি কম
গতকাল সকাল ৬টা থেকে রাত ৮টা পর্যন্ত ১৪ ঘণ্টা কারফিউ শিথিল থাকলেও শহরে লোকজনের উপস্থিতি ছিল কম। যানবাহন চলাচলও তেমন ছিল না। কিছু দোকানপাট খোলা থাকলেও খুব একটা বেচাকেনা হয়নি।
স্থানীয় লোকজন জানান, শনিবার এখানকার মার্কেট-ব্যবসা প্রতিষ্ঠানগুলোর সাপ্তাহিক ছুটির দিন ছিল। এ কারণে স্বাভাবিক সময়েও এদিন শহরে লোকজনের উপস্থিতি কম থাকে। এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে কারফিউ। আছে গ্রেপ্তার আতঙ্ক। ফলে কারফিউ শিথিল হলেও শহরে লোকজনের চলাচল তেমন একটা ছিল না। ইজিবাইক চালক উজ্জ্বল হোসেন বলেন, রাস্তায় নামছি, কিন্তু যাত্রী নেই। এমনিতেই শনিবার লোক কম থাকে, কারণ এদিন অধিকাংশ দোকানপাট বন্ধ থাকে। অনেক গ্রাম থেকে তেমন কোনো লোকজন শহরে আসে না। তার ওপর কারফিউ। আমাদের পেট চালানোই দায় হয়ে পড়েছে।
ব্যবসায়ী কাজী জিহাদ হোসেন বলেন, আমরা রাজনীতি করি না, ব্যবসা-বাণিজ্য করি। তিন দিন পর আজ আড়ত খুলে কিছু আলু, পেঁয়াজ, মরিচ, রসুন, হলুদ বিক্রি করেছি। তবে অন্যান্য দিনের তুলনায় খুবই কম বেচাকেনা হয়েছে।
শহরের বড় বাজারের চাল ব্যবসায়ী পঙ্কজ সাহা বলেন, তিন দিন পর দোকান খুলেছি। সকালের দিকে কিছু কেনাবেচা হয়েছে। দুপুরের আগেই বাজার ফাঁকা হয়ে গেছে। একই বাজারের সবজি ব্যবসায়ী আব্দুল আলিম বলেন, সকালের দিকে বাজারে অনেকের আনাগোনা ছিল। দুপুর হওয়ার পর বাজার থেকে লোকজন কমতে শুরু করে। তারপর বাজার ফাঁকা হয়ে যায়। স্বল্প সময়ের মধ্যে সব শাকসবজি বিক্রি করেছি। পুনরায় কারফিউ বাড়ানোর কথা শুনে ক্রেতারা রাত ৮টার মধ্যেই ঘরে চলে যায়।
গোপালগঞ্জে ৪ মামলায় আসামি ৩০০৮
পুলিশের ওপর হামলা, গাড়ি ভাঙচুর, অগ্নিসংযোগ ও রাষ্ট্রবিরোধী কার্যকলাপে জড়িত থাকার অভিযোগে জেলার বিভিন্ন থানায় চারটি মামলা হয়েছে। এসব মামলায় মোট ৩৫৮ জনের নাম উল্লেখসহ ৩ হাজার ৮ জনকে আসামি করা হয়েছে। সর্বশেষ শুক্রবার রাতে গোপালগঞ্জ সদর থানায় সন্ত্রাস দমন আইনে আওয়ামী লীগ ও সহযোগী সংগঠনের ৪০৪ নেতাকর্মীকে আসামি করে মামলা হয়েছে। এর আগে বৃহস্পতিবার ওই সংগঠনের ৫৭৫ নেতাকর্মীকে আসামি করে একই আইনে মামলা করা হয়। অন্যদিকে কোটালীপাড়া থানায় গত বৃহস্পতিবার রাতে বিশেষ ক্ষমতা আইনে আওয়ামী লীগ ও সহযোগী সংগঠনের ১৬৫৫ জনকে আসামি করে মামলা হয়েছে। এছাড়া গত বৃহস্পতিবার রাতে কাশিয়ানী থানায় দায়ের হওয়া বিশেষ ক্ষমতা আইনের মামলায় আওয়ামী লীগ ও সহযোগী সংগঠনের ৩৭৪ জনকে আসামি করা হয়েছে। সবগুলো মামলার বাদী হয়েছে পুলিশ। সংশ্লিষ্ট থানার ওসিরা এসব তথ্য জানিয়েছেন।
২৪ ঘণ্টায় গ্রেপ্তার ১১৯
বুধবার থেকে গতকাল শনিবার দুপুর পর্যন্ত জেলার বিভিন্ন স্থানে অভিযান চালিয়ে ৩০৬ জনকে গ্রেপ্তার করে আদালতের মাধ্যমে কারাগারে পাঠিয়েছে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী। এর মধ্যে গত ২৪ ঘণ্টায় ১১৯ জনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। জেলার পাঁচটি থানা-পুলিশ সূত্রে জানা যায়, সদর থানায় নতুন ৪৪ জনসহ ৯২ জন, কাশিয়ানী থানায় নতুন ৩৩ জনসহ ৭৭ জন, মুকসুদপুরে নতুন ২২ জনসহ ৮৮ জন, টুঙ্গিপাড়ায় নতুন ১০ জনসহ ২৭ ও কোটালীপাড়ায় নতুন ১০ জনসহ ২২ জনকে গ্রেপ্তার করেছে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী।