মেরিনা লাভলী, রংপুর
প্রকাশ : ১৬ জুলাই ২০২৫ ০৯:১৬ এএম
শহীদ আবু সাঈদের গ্রাম বাবনপুর। মেঠোপথ, মাটির ঘরবাড়ি। দিনভর পাখির ডাকে মুখর চারদিক। আবু সাঈদের বাড়ির সামনে দাঁড়িয়ে আছে কাঁঠালগাছ। সেই গাছের শীতল ছায়ায় চিরনিদ্রায় এ শহীদ। কবরের পাশে বাঁশঝাড়ের সামনে উড়ছে জাতীয় পতাকা। সেখানে থাকা লাল-সবুজ রঙের সাইনবোর্ডে বড় করে লেখা ‘বীরশ্রেষ্ঠ শহীদ আবু সাঈদ : সমাধিস্থল’।
রংপুরের পীরগঞ্জ উপজেলার মদনখালী ইউনিয়নের সন্তান আবু সাঈদের কবরের সামনে প্রতিদিনই নির্যাতিত মানুষেরা দুহাত তুলছেন। স্বাধীনতার আনন্দে স্বস্তির মোনাজাতে ঝরাচ্ছেন চোখের পানি। আবু সাঈদের বাড়িতে সেই মাটির ঘর এখনও রয়েছে। ছোট্ট ঘরে কাঠের চৌকি, মাটির শিকে। ‘হে দুরন্ত মেধাদীপ্ত আবু সাঈদ/সর্বজনীন মেধার মুক্তির স্লোগানে তুমি ছিলে অগ্রণী সৈনিক। অযোগ্য নয়; যোগ্য মেধার জয়গান হবে বাংলায়/এই সংগ্রামে তুমি ছিলে মেধাদীপ্ত এক সাহসী তরুণ। তাই চব্বিশের বৈষম্যবিরোধী ছাত্র সংগ্রামে তোমাকে চলে যেতে হলো অকালে/আর জাতির হাতে তুলে দিয়ে গেলে নতুন এক বাংলাকে।’ ঘরের মাটির দেয়ালে আবু সাঈদের আত্মত্যাগ ও বীরত্ব নিয়ে কবিতা, ছড়া, শোকবার্তা সাঁটিয়েছে বিভিন্ন সংগঠন। আবু সাঈদের বাড়ির প্রবেশমুখে নতুন টিনশেডের ঘর তোলা হয়েছে। সেখানে থাকেন আবু সাঈদের বাবা-মা ও ভাইয়েরা। সরকার, জুলাই ফাউন্ডেশন, বিভিন্ন রাজনৈতিক দল, সংগঠন, প্রশাসনের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাসহ নানা শ্রেণি-পেশার মানুষের আর্থিক সহযোগিতা পেয়েছে আবু সাঈদের পরিবার। তাই অভাব-অনটন নেই তাদের সংসারে। তবে আবু সাঈদের স্মৃতি প্রতিনিয়ত আবেগ তাড়িত করে তাদের। এখনও মা মনোয়ারা বেগম ছেলের জার্সি, কাপড়-চোপড় হাতড়ে মনকে সান্ত্বনা দেন। ছেলে হারানোর বেদনা আষাঢ়ের মেঘের মতো জমে আছে পরিবারের বুকে, যা বৃষ্টি হয়ে ঝরে তাদের চোখ বেয়ে।
এদিকে ১৬ জুলাই ‘শহীদ আবু সাঈদ দিবস’ হিসেবে ঘোষণা করেও তা বাতিল করা এবং আবু সাঈদের হত্যাকারীরা গ্রেপ্তার না হওয়া নিয়ে ক্ষোভ রয়েছে তার পরিবারে। আবু সাঈদ হত্যার বিচার শুরু হলেও এখন পর্যন্ত মাত্র চার আসামি পুলিশের সাবেক সহকারী উপপরিদর্শক (এএসআই) আমির হোসেন, কনস্টেবল সুজন চন্দ্র রায়, বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক প্রক্টর শরিফুল ইসলাম ও নিষিদ্ধ সংগঠন ছাত্রলীগ নেতা ইমরান চৌধুরী আকাশ গ্রেপ্তার হয়েছে। প্রভাবমুক্ত প্রশাসন, গোয়েন্দা সংস্থাসহ চৌকস আইনশৃঙ্খলা বাহিনী থাকা সত্ত্বেও আসামিরা গ্রেপ্তার না হওয়ায় হতাশা প্রকাশ করেছেন তারা।
আবু সাঈদের বড় ভাই রমজান আলী বলেন, ‘আমার ভাই হত্যার এক বছর হয়ে গেল। আমরা বিচার পেলাম না। শুধু বলা হয়েছে আবু সাঈদ হত্যা মামলায় চারজন কারাগারে ও ২৬ জনের গ্রেপ্তারি পরোয়ানা জারি হয়েছে। শুধু গ্রেপ্তারি পরোয়ানা জারি করলে হবে না। পলাতক আসামিরা দেশের বাইরে থাকলে তাদের ফিরিয়ে এনে জুলাই গণঅভ্যুত্থানের মঞ্চ সাজিয়ে সেখানে তাদের ফাঁসিতে ঝুলিয়ে বিচার সম্পন্ন করতে হবে।’
আবু সাঈদের বড় ভাই আবু হোসেন বলেন, ‘১৯৯০ সালে নুর হোসেন শহীদ হয়েছিলেন। এখনও সেই নুর হোসেন দিবস পালন করা হয়। তাহলে ১৬ জুলাই আবু সাঈদ দিবস কেন বাতিল করা হলো। কোন ষড়যন্ত্রের কারণে শহীদ আবু সাঈদ দিবস পালন করা হবে না তা রাষ্ট্রের কাছে জানতে চাই।’
আবু সাঈদের মা মনোয়ারা বেগম বলেন, ‘সংসারে এখন অভাব নাই। শুধু হারিয়ে যাওয়া আবু সাঈদের অভাব। রংপুরে প্রাইভেট পড়ানোর কারণে আবু সাঈদ বেশিদিন বাড়িতে থাকত না। ছুটি পাইলে দুই-চার দিন থেকে চলে যেত। এ বাড়ির ঘরে-দুয়ারে বেড়াত আবু সাঈদ, সেটাই মনে পড়ে। আমার যেটার অভাব ছিল, মায়ের দুঃখ দেখে আবু সাঈদ সেটা এনে দিত।’
বাবা মকবুল হোসেন বলেন, ‘আমার ছেলেকে গুলি করে পুলিশ হত্যা করেছে। আমার ছেলের বুক ঝাঁজরা করে দিয়েছে তারা। আমি ছেলে হত্যার বিচার চাই। এখন পর্যন্ত আবু সাঈদ হত্যা মামলায় চারজনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। বাকি আসামিদের এখনও আইনের আওতায় আনা হয়নি। তাদের যেন গ্রেপ্তার করে দ্রুত আইনের আওতায় আনেÑ এটাই সরকারের কাছে প্রত্যাশা। সেই সাথে যুগে যুগে আবু সাঈদ বীরশ্রেষ্ঠ হয়ে থাকুক। এটাই আমার চাওয়া।’