ফেনী প্রতিবেদক
প্রকাশ : ১৫ জুলাই ২০২৫ ২২:০৬ পিএম
টানা বর্ষণ ও উজান থেকে নেমে আসা পাহাড়ি ঢলে ফেনীর পাঁচটি উপজেলার বিস্তীর্ণ নিম্নাঞ্চল ও নদীতীরবর্তী এলাকায় সৃষ্টি হওয়া বন্যা পরিস্থিতির উন্নতি হয়েছে। অধিকাংশ এলাকার পানি নেমে গেলেও কিছু এলাকায় এখনও জলাবদ্ধতা রয়ে গেছে।
জেলা প্রশাসনের প্রাথমিক তথ্য অনুযায়ী, বন্যায় সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে গ্রামীণ সড়ক, কৃষি, মৎস্য, প্রাণিসম্পদ এবং বসতবাড়ি। তবে ক্ষয়ক্ষতির পূর্ণাঙ্গ হিসাব এখনও নিরূপণ করা সম্ভব হয়নি।
জেলা প্রশাসনের তথ্যমতে, জেলায় প্রায় ১২৬টি গ্রামীণ সড়কসহ ৩০০ কিলোমিটার সড়ক ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে, যার আর্থিক মূল্য প্রায় ৯০ কোটি টাকা। শতাধিক বাড়িঘর আংশিক বা পুরোপুরি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। এ ছাড়া ৩ হাজার ৪৭০ হেক্টর ফসলি জমি পানির নিচে তলিয়ে আছে। প্রাণিসম্পদ খাতে ক্ষতি হয়েছে প্রায় ৬৫ লাখ টাকার।
জেলার ছয়টি উপজেলায় মোট ২ হাজার ৩৩০টি পুকুর, দীঘি ও মৎস্য খামার বন্যায় ভেসে গেছে, যার ক্ষতির পরিমাণ প্রায় ৮ কোটি টাকা।
পরশুরামের ধনীকুন্ডা এলাকার কৃষক গোলাম রহমান বলেন, ‘৫ বিঘা জমির সব শাকসবজি বন্যার পানিতে নষ্ট হয়ে গেছে। বছর ঘুরতে না ঘুরতেই আবারও ক্ষতির মুখে পড়েছি। এভাবে চললে না খেয়ে থাকতে হবে।’
জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপপরিচালক মোহাম্মদ আতিক উল্লাহ বলেন, ‘অনেক এলাকায় এখনও পানি রয়েছে। পানি পুরোপুরি সরে গেলে ক্ষয়ক্ষতির প্রকৃত চিত্র পাওয়া যাবে। ক্ষতিগ্রস্ত কৃষকদের জন্য প্রণোদনার প্রস্তাবনা সরকারকে দেওয়া হবে।’
ফুলগাজীর দক্ষিণ শ্রীপুর গ্রামের মাছচাষি মহি আলমগীর জানান, তিনটি পুকুরে প্রায় ৩ বিঘা জমিতে মাছ চাষ করছিলাম। সব মাছ ভেসে গেছে। প্রায় আড়াই লাখ টাকার ক্ষতি হয়েছে।
পরশুরামের অলকা গ্রামের মাছচাষি আরিফুর রহমান বলেন, ‘নেট জাল দিয়ে পুকুর ঘিরেও রক্ষা করা যায়নি। বাঁধ ভেঙে পানির তীব্র স্রোতে সব ভেসে গেছে। সরকারি সহায়তা ছাড়া এ ক্ষতি থেকে উঠে দাঁড়ানো অসম্ভব।’
ফেনী জেলা মৎস্য কর্মকর্তা আমিনুল ইসলাম বলেন, উপজেলা পর্যায়ে ক্ষয়ক্ষতির চূড়ান্ত প্রতিবেদন তৈরির কাজ চলছে। প্রণোদনার জন্য ক্ষতিগ্রস্ত চাষিদের তালিকা সরকারের কাছে পাঠানো হবে।
বিজয়পুরের বিসমিল্লাহ পোল্ট্রি খামারের মালিক আবুল হাসান বলেন, বন্যার পানিতে খামারে থাকা ১ হাজার ৫০০ মুরগি মারা গেছে। এক মুহূর্তেই দীর্ঘদিনের স্বপ্ন শেষ হয়ে গেল।
জেলা প্রাণিসম্পদ কর্মকর্তা ডা. মো. মোজাম্মেল হক বলেন, প্রাণিসম্পদ খাতে এবারও বড় ধরনের ক্ষতি হয়েছে। দাপ্তরিকভাবে কোনো সহায়তা বরাদ্দ হলে তা খামারিদের হাতে পৌঁছে দেওয়া হবে।
ফেনী পানি উন্নয়ন বোর্ডের নির্বাহী প্রকৌশলী আকতার হোসেন মজুমদার বলেন, সব ভাঙন মেরামতের প্রাক্কলন এখনও তৈরি হয়নি। তবে দেবপাড়া এলাকাসহ কয়েকটি স্থানে বাঁধ মেরামতের কাজ শুরু হয়েছে।
উল্লেখ্য, গত ৮ জুলাই উজান থেকে নেমে আসা পাহাড়ি ঢলে মুহুরী, কহুয়া ও সিলোনিয়া নদীর বন্যা নিয়ন্ত্রণ বাঁধের ৪১টি স্থানে ভেঙে পড়ে। এতে ফেনীর পাঁচটি উপজেলার ১৩৭টি গ্রাম প্লাবিত হয় এবং ভয়াবহ বন্যার সৃষ্টি হয়।