× ই-পেপার প্রচ্ছদ সর্বশেষ বাংলাদেশ রাজনীতি দেশজুড়ে বিশ্বজুড়ে বাণিজ্য খেলা বিনোদন মতামত চাকরি শিক্ষা আজকের কার্টুন ফিচার সকল বিভাগ ছবি ভিডিও লেখক আর্কাইভ কনভার্টার

মাদকে চা শ্রমিকদের সর্বনাশ

ইসমাইল মাহমুদ, মৌলভীবাজার

প্রকাশ : ১২ জুলাই ২০২৫ ১০:০৬ এএম

মাদকে চা শ্রমিকদের সর্বনাশ

বাংলাদেশের মানুষের প্রাত্যহিক জীবনের এক অবিচ্ছেদ্য অংশ হয়ে উঠেছে সকালের এক কাপ চা। দেশের শতাধিক চা বাগানে উৎপাদিত এই চা শুধু স্বাদ ও আরামের উৎসই নয়, বরং এর পেছনে রয়েছে হাজারো শ্রমিকের কঠোর পরিশ্রম ও জীবনের গল্প। দেশের পঞ্চগড়ে ৩৭টি চা বাগান, হবিগঞ্জে ২৪টি, চট্টগ্রামে ২২টি, সিলেটে ১৯টি, ঠাকুরগাঁওয়ে ১০টি ও রাঙ্গামাটিতে ২টি চা বাগান থাকলেও সর্বাধিক চা উৎপাদনকারী জেলা মৌলভীবাজারকে (৯২টি) বলা হয় বাংলাদেশের ‘চায়ের রাজধানী’। এখানকার সবুজে ঘেরা চা বাগানগুলো যেমন সৌন্দর্যের প্রতীক, তেমনি শ্রমিকদের জীবনের বাস্তবতা অনেকটাই কঠিন ও বঞ্চনাপূর্ণ। চা শ্রমিকদের ন্যূনতম মজুরি, অপ্রতুল সুবিধা এবং দীর্ঘদিনের সংস্কৃতির অংশ হয়ে ওঠা মদ সেবনের প্রবণতা এই সমাজে এক গভীর সামাজিক সংকট তৈরি করেছে। ব্রিটিশ ঔপনিবেশিক আমলে চা বাগানে শুরু হওয়া মদ ব্যবস্থাপনা আজও বহন করে চলেছে নানা অসংগতি ও বিভ্রান্তির ইতিহাস।

চা শ্রমিকরা জানায়, ব্রিটিশ আমল থেকেই বাগানগুলোতে শ্রমিকদের মাঝে মদ তৈরি ও মদপানের সংস্কৃতি চালু করে দেওয়া হয়। বলা হতো, পরিশ্রমের পর মদ পান শরীর ও মন চাঙ্গা রাখে। এই মিথ আজও অনেক শ্রমিকের জীবনে গভীরভাবে প্রভাব ফেলছে। বর্তমানে মৌলভীবাজার জেলার ৯২টি চা বাগানের মধ্যে ৪৫টিতে কেরু অ্যান্ড কোম্পানির লাইসেন্সধারী বৈধ দেশীয় মদের দোকান রয়েছে। বাকি চা বাগানগুলোতে বৈধ মদের দোকান নেই। তবে বাগানের কিছু চা শ্রমিক তাদের নিজেদের বসতবাড়িতে অবৈধ চোলাই, লাংগি, চোয়ানি ও হাড়িয়া ইত্যাদি মদ তৈরি করেন; যা নিজেরা পানের পাশাপাশি বিক্রিও করেন। স্থানীয় প্রশাসন ও মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তর এসব অবৈধ মাদক কারখানায় প্রায়ই অভিযান চালালেও থেমে থাকেনি চা বাগানের আদি এই ঐতিহ্যটি।

মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরের তথ্য মতে, ২০২৩ ও ২০২৪ সালে এই ৪৫টি বাগানে কেরু অ্যান্ড কোম্পানির সরবরাহ করা মদ বিক্রি হয়েছে প্রায় ৮ লাখ ৪২ হাজার ৭২৬ প্রুফলিটার, যার বিপরীতে সরকার রাজস্ব পেয়েছে ৪ কোটি ৬৭ লাখ ৪৯ হাজার ৬০২ টাকা। যদিও এই রাজস্ব অর্জনের পেছনে শ্রমিকদের পরিবারে শারীরিক অসুস্থতা, পারিবারিক অশান্তি এবং অর্থনৈতিক দুর্দশার বাস্তবতা অনেক বেশি দৃশ্যমান। তবে আশার খবর হলো, পরিস্থিতি ধীরে ধীরে পরিবর্তনের দিকে যাচ্ছে। চা শ্রমিকদের সন্তানরা স্কুল-কলেজে পড়ছে, পরিবারে শিক্ষার আলো ছড়াচ্ছে। ফলে মদপানে বাধা হয়ে দাঁড়াচ্ছে পরিবারের সদস্যরাই।

খাইছড়া চা বাগানের শ্রমিক রিপন ভূঁইয়া বলেন, দৈনিক ১৭০ টাকা মজুরি এবং অন্য ভাতাসহ সপ্তাহে ১ হাজার ২০০ টাকার মতো পাই আমি। প্রতি সপ্তাহের বুধবার পাই পুরো সপ্তাহের টাকা। বছর দুয়েক আগেও সপ্তাহের মজুরি হাতে পেয়েই চলে যেতাম মদের দোকানে। এখন আর যাই না। শরীর খারাপ হয়ে গিয়েছিল, পরিবারও বাধা দিয়েছে।

ব্রিটিশদের রেখে যাওয়া এই ‘মদের পাট্টা’ সংস্কৃতিকে চক্রান্ত আখ্যা দিয়ে এর অবসান চান অনেকেই। চলতি বছরের ১২ জানুয়ারি মৌলভীবাজারের কমলগঞ্জ উপজেলার কুরমা চা বাগান মাঠে চা শ্রমিকদের সমাবেশে প্রধান অতিথির বক্তব্য রাখতে গিয়ে জাতীয় নাগরিক কমিটির (এনসিপি) উত্তরাঞ্চলের মুখ্য সংগঠক সারজিস আলম বলেন, চা বাগানে কোনো মদের পাট্টা থাকবে না। সেগুলো ভেঙে গুঁড়িয়ে দিতে হবে।

বাংলাদেশ চা শ্রমিক ইউনিয়নের (বাচাশ্রই) অর্থ সম্পাদক পরেশ কালিন্দি জানান, আগে প্রায় সব শ্রমিকই মদে আসক্ত ছিলেন। এখন অর্ধেকের বেশি শ্রমিকই মদ ছাড়ছেন।

তবে শুধু অভ্যন্তরীণ শ্রমিক নয়, বহিরাগত মাদকসেবীরাও বাগান এলাকায় মদ পান ও বিশৃঙ্খলা ছড়িয়ে দিচ্ছে বলে অভিযোগ স্থানীয়দের। কালিঘাট ইউনিয়নের মেম্বার ইদ্রিছ আলী বলেন, মদের দোকান থাকায় মাতালদের উৎপাতে নারী শ্রমিকরা প্রায়ই নিগৃহীত হন। আমরা সরকারের কাছে এসব দোকান বন্ধের দাবি জানাই। কুলাউড়া উপজেলার কাপনাপাহাড় চা বাগানের পঞ্চায়েত কমিটির সহসভাপতি অজন্তী বাউড়ি বলেন, আমাদের বাগানের শ্রমিক পরিবারের অনেক ছেলেমেয়ে শিক্ষার কারণে তাদের মধ্যে সচেতনতা বেড়েছে। পরিবারের কেউ মদ পান করতে চাইলে তারা বাধা হয়ে দাঁড়ান। এখন বাগানের কম সংখ্যক শ্রমিকই মদ পান করেন। 

বাচাশ্রই সাধারণ সম্পাদক (ভারপ্রাপ্ত) নিপেন পাল বলেন, আমরা চা বাগানগুলোতে মদের দোকান বন্ধে দীর্ঘদিন থেকে আন্দোলন করছি। কিন্তু মদকসেবীদের বিরাট অংশ শ্রমিক থাকায় তাদের প্রতিনিধি হিসেবে আমরা পেরে উঠতে পারি না।

কমলগঞ্জ উপজেলা পরিষদের সাবেক ভাইস চেয়ারম্যান ও বাংলাদেশ চা শ্রমিক ইউনিয়নের উপদেষ্টা রামভজন কৈরী বলেন, আমাদের দেশের চা শ্রমিকদের অর্থনৈতিক ও সামাজিকভাবে দাবিয়ে রাখতে ব্রিটিশরা চা বাগানগুলোতে পরিকল্পিতভাবে মদের পাট্টা (দেশীয় মদের দোকান) স্থাপন করে গেছে। ব্রিটিশদের চাপিয়ে দেওয়া সংস্কারগুলো আজও চা শ্রমিকদের বয়ে বেড়াতে হচ্ছে।

শেয়ার করুন-

মন্তব্য করুন

Protidiner Bangladesh

সম্পাদক : মারুফ কামাল খান

প্রকাশক : কাউসার আহমেদ অপু

রংধনু কর্পোরেট, ক- ২৭১ (১০ম তলা) ব্লক-সি, প্রগতি সরণি, কুড়িল (বিশ্বরোড) ঢাকা -১২২৯

যোগাযোগ

প্রধান কার্যালয়: +৮৮০৯৬১১৬৭৭৬৯৬ । ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন (প্রিন্ট): +৮৮০৯৬১১৬৭৭৮১০, +৮৮০১৮৮০৭৪৪৫৮০ | ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন (অনলাইন): +৮৮০১৮৮০৭৪৪৫৮০, +৮৮০১৭৯৯৪৪৯৫৫৯ । ই-মেইল: [email protected]

সার্কুলেশন: +৮৮০৯৬১১৬৭৭৮০৭, +৮৮০১৮৮০৭৪৪৩৩২ । ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন মূল্য তালিকা