চট্টগ্রাম অফিস
প্রকাশ : ০৯ জুলাই ২০২৫ ২১:৪৪ পিএম
বান্দরবানের লামা উপজেলার মিরিঞ্জা এলাকায় বুধবার দুপুরে পাহাড় ধসে সড়কে মাটি জমে যান চলাচল বন্ধ হয়ে পড়ে। প্রবা ফটো
টানা বৃষ্টিতে চট্টগ্রামসহ পার্বত্য তিন জেলার জনজীবন বিপর্যস্ত হয়ে পড়েছে। চট্টগ্রামে ১৬৯ মিলিমিটার বৃষ্টিপাতে জলাবদ্ধতাসহ পার্বত্য জেলা বান্দরবান, খাগড়াছড়ি ও রাঙামাটিতে দেখা দিয়েছে পাহাড়ধস ও বন্যার আশঙ্কা। প্রশাসন আশ্রয়কেন্দ্র খুলে সতর্কতা জারি করলেও অনেকেই এখনও ঝুঁকিপূর্ণ অবস্থানে রয়ে গেছে। প্রতিদিনের বাংলাদেশের প্রতিবেদকদের প্রতিবেদনের বিস্তারিত :
চট্টগ্রামে রেকর্ড বৃষ্টি, জলাবদ্ধতায় নগরবাসীর দুর্ভোগ
সর্বশেষ ২৪ ঘণ্টায় (বুধবার (৯ জুলাই) সন্ধ্যা ৬টা পর্যন্ত) পতেঙ্গা আবহাওয়া অফিস ১৬৯ মিলিমিটার বৃষ্টিপাত রেকর্ড করেছে। এতে চকবাজার, কাতালগঞ্জ, বাদুরতলা, মুরাদপুর, পাঁচলাইশ ও আগ্রাবাদসহ নগরীর নিম্নাঞ্চল হাঁটু থেকে কোমর সমান পানিতে ডুবে গেছে। রাস্তায় যানবাহন কম থাকায় কর্মজীবীদের অনেকেই পায়ে হেঁটে কর্মস্থলে যেতে বাধ্য হয়েছেন।
পতেঙ্গা আবহাওয়া অফিসের পূর্বাভাস কর্মকর্তা ইসমাইল ভূঁইয়া প্রতিদিনের বাংলাদেশকে বলেন, ‘সন্ধ্যা ৬টা পর্যন্ত পূর্ববর্তী ২৪ ঘণ্টায় ১৬৯ মিলিমিটার বৃষ্টিপাত রেকর্ড করা হয়। আগামীকাল (আজ) সন্ধ্যা ৬টা পর্যন্ত একই ধরনের আবহাওয়া বিরাজ করবে। এ ছাড়া টানা বৃষ্টির কারণে নগরীর পাহাড়ি এলাকায় পাহাড়ধসের সৃষ্টি হতে পারে।’
আগ্রাবাদ এলাকার বাসিন্দা আবু বকর বলেন, ‘দিনভর বৃষ্টিতে এলাকাজুড়ে পানি। অফিসে যেতে এবং ফিরতে নাকাল হতে হয়েছে।’ চট্টগ্রামের পাহাড়ি এলাকায় পাহাড়ধসের আশঙ্কাও তৈরি হয়েছে বলে জানিয়েছেন পতেঙ্গা আবহাওয়া অফিসের পূর্বাভাস কর্মকর্তা ইসমাইল ভূঁইয়া। জেলা প্রশাসন ইতোমধ্যে পাহাড়ে ঝুঁকিপূর্ণভাবে বসবাসকারী ৬ হাজার ৫৫৮টি পরিবারকে সরিয়ে নিতে মাইকিং ও আশ্রয়কেন্দ্র খোলার কাজ শুরু করেছে।
বান্দরবানে সড়কে পাহাড়ধস, যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন
বান্দরবানের লামা উপজেলার মিরিঞ্জা এলাকায় পাহাড় ধসে সড়কে বুধবার দুপুরে মাটি জমে যান চলাচল বন্ধ হয়ে পড়ে। পরে দ্রুত উদ্যোগে কয়েক ঘণ্টার মধ্যে সড়ক চলাচল সচল করা হলেও জেলার বিভিন্ন অভ্যন্তরীণ সড়কে (লামা-আলীকদম, রুমা, থানচি, সূয়ালক, রোয়াংছড়ি-রুমা) কাদার কারণে গাড়ি চলাচল ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে উঠেছে।
বান্দরবান আবহাওয়া অফিসের ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা সনাতন কুমার মন্ডল জানান, গত ২৪ ঘণ্টায় (বুধবার বেলা ৩টা পর্যন্ত) জেলায় ১০৭ মিলিমিটার বৃষ্টিপাত রেকর্ড করা হয়েছে। আগের ২৪ ঘণ্টাতেও ১০৮ মিলিমিটার বৃষ্টিপাত হয়েছে। ভারী বৃষ্টিপাত অব্যাহত থাকায় জেলাজুড়ে পাহাড়ধসের ঝুঁকি বেড়েছে।
জেলা প্রশাসক শামীম আরা রিনি জানান, প্রশাসনের পক্ষ থেকে পাহাড়ি পাদদেশে বসবাসকারীদের সরিয়ে নিতে ২২০টি আশ্রয়কেন্দ্র খোলা হয়েছে। এ ছাড়া সাঙ্গু ও মাতামুহুরী নদীর পানি বিপদসীমার কাছাকাছি প্রবাহিত হচ্ছে।
খাগড়াছড়িতে পাহাড়ধস, বিচ্ছিন্ন দীঘিনালা-লংগদু সড়ক
খাগড়াছড়িতে চেঙ্গী ও মাইনী নদীর পানি অস্বাভাবিক হারে বাড়ছে। দীঘিনালা উপজেলার মেরুং ইউনিয়নের নিচু এলাকায় পানি ঢুকে পড়েছে, ডুবে গেছে দীঘিনালা-লংগদু সড়ক। ফলে রাঙামাটির লংগদুর সঙ্গে সারা দেশের সড়ক যোগাযোগ বুধবার দুপুর থেকে বন্ধ রয়েছে। জেলা শহরের মুসলিম পাড়া, রাজ্যমনি পাড়া, গঞ্জপাড়া, শালবনসহ বেশ কয়েকটি এলাকায় পানি ঢুকে পড়েছে।
পাহাড়ধসের ঝুঁকিতে থাকা প্রায় সাড়ে ৩ হাজার পরিবারকে নিরাপদ আশ্রয়ে নেওয়ার জন্য তিনটি আশ্রয়কেন্দ্র খোলা হলেও লোকজনের উপস্থিতি খুবই কম। জেলা পরিষদের চেয়ারম্যান শেফালিকা ত্রিপুরা বলেন, ‘অনেকে অনুরোধ সত্ত্বেও ঘর ছাড়ছেন না।’
জেলা প্রশাসক এবিএম ইফতেখারুল ইসলাম খন্দকার জানিয়েছেন, ঝুঁকিপূর্ণ এলাকায় নজরদারি বাড়ানো হয়েছে।
রাঙামাটিতে সতর্কতা জারি, কাপ্তাই হ্রদে পানি বৃদ্ধি
রাঙামাটিতে টানা তিন দিনের ভারী বৃষ্টিপাতে ১০টি উপজেলার জনজীবনে দুর্ভোগ তৈরি হয়েছে। প্রশাসনের পক্ষ থেকে ঝুঁকিপূর্ণ এলাকায় সতর্কতা জারি করে মাইকিং ও আশ্রয়কেন্দ্র প্রস্তুতের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। কাপ্তাই হ্রদের পানির স্তর বেড়ে ৯৫ দশমিক ৮৭ এমএসএলে পৌঁছেছে, যেখানে সাধারণত পানি থাকে ৮৫ এমএসএল। পানি বাড়ায় বিদ্যুৎ উৎপাদনও বেড়েছে। গত ২৪ ঘণ্টায় উৎপাদন হয়েছে ১৭২ মেগাওয়াট।
এভাবে পানি বৃদ্ধি পেলে কাপ্তাই বিদ্যুৎকেন্দ্রের উৎপাদন আরও বৃদ্ধি পাবে বলে জানিয়েছেন কেন্দ্রের ব্যবস্থাপক মাহমুদ হাসান। তিনি জানান, কাপ্তাই বিদ্যুৎকেন্দ্রে ৫টি ইউনিটে সর্বোচ্চ ২২০ থেকে ২৪০ মেগাওয়াট পর্যন্ত বিদ্যুৎ উৎপাদন করা সম্ভব।
একই সঙ্গে কাপ্তাই উপজেলায় পাহাড়ধসের ঝুঁকিও বেড়েছে। ঢাকাইয়া কলোনি, আফসারের টিলা, ওয়াগ্গা, চিৎমরম ও রাইখালী এলাকায় শতাধিক পরিবার ঝুঁকিতে রয়েছে।