আবদুল্লাহ আল-মামুন, ফেনী
প্রকাশ : ০৯ জুলাই ২০২৫ ১৬:৪০ পিএম
প্রবা ফটো
সংকটপূর্ণ ফেনীর দাগনভূঞা উপজেলার জায়লস্কর ইউনিয়নের দক্ষিণ নেওয়াজপুর আশ্রয়ণ কেন্দ্র। খাবার পানির সংকট, চলাচলের অনুপযোগী কাঁচা রাস্তা, শিক্ষা ও নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্য সহজে পাওয়ার সুযোগ না থাকায় অনেক উপকারভোগী পরিবার বরাদ্দ পাওয়া ঘরে বসবাসে অনাগ্রহ দেখাচ্ছেন। ফলে বেশকিছু ঘরে ঝুলছে তালা, কিছু ঘরে বসবাস করছেন মূল বরাদ্দপ্রাপ্ত নয় এমন আত্মীয়-স্বজন।
সরেজমিন দেখা গেছে, মাতুভূঞা খালের পাড়ে ভূমিহীনদের জন্য নির্মিত আশ্রয়ণ কেন্দ্রের মোট ৬৮টি ঘরের মধ্যে বর্তমানে ৪৫টি পরিবার বসবাস করছে। বাকি ২৩টি ঘরে কেউ না থাকায় সেখানে তালা ঝুলছে। এরই মধ্যে অনেক ঘরের মেঝেতে ফাটল ধরেছে, কোথাও কোথাও দেওয়ালের পলেস্তারা খসে পড়ছে। নেওয়াজপুর আশ্রয়ণ কেন্দ্রে বসবাসরত পরিবারের শিশুদের জন্য নেই কোনো শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান। ফলে শিক্ষার মৌলিক অধিকার থেকে বঞ্চিত হচ্ছে আশ্রয়ণ কেন্দ্রের কোমলমতি শিশুরা।
স্থানীয়রা জানান, আশ্রয়ণ কেন্দ্রে ৮টি নলকূপ স্থাপন করা হলেও বর্তমানে ৭টি নলকূপই অকেজো হয়ে গেছে। একমাত্র সচল একটি নলকূপই এখন পুরো কেন্দ্রের পানির ভরসা। ফলে গোসল কিংবা অন্যান্য কাজে অনেককে নদীর পানির ওপর নির্ভর করতে হচ্ছে।
আশ্রয়ণ কেন্দ্রের ২৫৪ নম্বর ঘরের বাসিন্দা আইয়ুব আলী বলেন, পানির সমস্যা ও যাতায়াতের অসুবিধার কারণে অনেকে এখানে আসেননি। আমি ভূমিহীন, খুশিপুর থেকে এখানে এসে আশ্রয় নিয়েছি।
২৯৪ নম্বর ঘরের বাসিন্দা কোব্বাদ আহমেদ জানান, এই ঘরটি আমার ভাগিনার নামে বরাদ্দ। সে এখানে থাকে না, তাই আমি থাকি। আশপাশে দোকান, বাজার কিছুই নেই। ওষুধ কিংবা জিনিসপত্রের জন্য যেতে হয় বেকের বাজারে। রাস্তা কাঁচা হওয়ায় চলাচল কষ্টসাধ্য।
২৯৩ নম্বর ঘরের বাসিন্দা ফজলুল হক বলেন, এখানে স্কুল বা মাদ্রাসা নেই। আমাদের সন্তানদের দূরে পাঠিয়ে পড়াশোনা করাতে হয়। হীরাপুর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় আশ্রয়ণ কেন্দ্র থেকে অনেকে দূরে।
২৮৯ নম্বর ঘরের বাসিন্দা রাজমিস্ত্রি আব্দুল মোতালেব বলেন, উত্তর আলীপুর থেকে এখানে এসেছি। স্ত্রী-সন্তানসহ পাঁচজন নিয়ে অনেক কষ্টে আছি। পানির অভাবে নদীতে গোসল করি। স্কুল না থাকায় সন্তানের পড়ালেখায় সমস্যা হচ্ছে।
২৮৫ নম্বর ঘরের বাসিন্দা ছেমনা খাতুন জানান, স্বামী নেই। হাঁস-মুরগি বিক্রি করে কোনোভাবে জীবন চালাই। সরকার ছাগল ও হাঁস-মুরগি দেওয়ার কথা বলেছিল, কিন্তু দেয়নি। গত বছরের বন্যাতেও কোনো সাহায্য পাইনি। একই এলাকার আরেক বাসিন্দা শাহনাজ বেগম বলেন, বর্ষা এলে এখানে চলাচলে সমস্যা হয়। দোকান না থাকায় খাবার সংগ্রহেও অসুবিধা হয়।
২৮৪ নম্বর ঘরের বরাদ্দপ্রাপ্ত মফিজ জানান, ঘরটিতে আমার মেয়ে থাকে। আমি তুলাতুলি এলাকায় আমার শ্বশুর বাড়িতে থাকি।
২৯৩ নম্বর ঘরের বাসিন্দা ফজলুল হক বলেন, এখানে স্কুল বা মাদ্রাসা নেই। আমাদের সন্তানদের দূরে পাঠিয়ে পড়াতে হয়, যা খুবই কষ্টকর। হীরাপুর বিদ্যালয় অনেক দূরে হওয়ায় অনেকেই যেতে পারে না।
স্থানীয়দের অভিযোগ, যথাযথ তদারকির অভাব, মৌলিক সুযোগ-সুবিধার সংকট এবং অবকাঠামোগত দুর্বলতায় বছর না পেরোতেই আশ্রয়ণ কেন্দ্রে বাস অনুপযোগী পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে। এ ছাড়া আশ্রয়ণ কেন্দ্রের নিকটবর্তী হীরাপুর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় ও একটি মাদ্রাসা থাকলেও সেগুলো এতটাই দূরে যে ছোট ছোট শিশুদের পক্ষে সেখানে যাতায়াত করা প্রায় অসম্ভব। রাস্তাঘাট অনুপযোগী হওয়ায় অনেক সন্তানদের স্কুলে পাঠাতে পারেন না।
দাগনভূঞা উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা স ম আজহারুল ইসলাম বলেন, গভীর নলকূপের কথা জানতাম না, আপনাদের মাধ্যমে জেনেছি। এ বিষয়ে বিশেষ ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে। মক্তবভিত্তিক গণশিক্ষা কার্যক্রমের বিষয়ে তিনি জানান, ওই আশ্রয়ণ কেন্দ্রের কেউ লিখিভাবে অভিযোগ করলে গণশিক্ষাভিত্তিক কার্যক্রম চালু করার উদ্যেগ নেওয়া হবে।