ফেনী, পটুয়াখালী ও নোয়াখালী প্রতিবেদক
প্রকাশ : ০৮ জুলাই ২০২৫ ২১:৫৯ পিএম
আপডেট : ০৮ জুলাই ২০২৫ ২২:০১ পিএম
ফেনীতে ভারী বৃষ্টিপাতে শহরের চিত্র। প্রবা ফটো
টানা ভারী বৃষ্টিপাতে জলাবদ্ধতা, নদীর পানি বৃদ্ধি ও স্থবির জনজীবনের চিত্র ফুটে উঠেছে দেশের উপকূলীয় ও দক্ষিণ-পূর্বাঞ্চলের কয়েকটি জেলায়। ফেনী, পটুয়াখালী ও নোয়াখালীতে বৃষ্টির রেকর্ড, ভেঙেছে গত কয়েক বছরের পরিসংখ্যান। দেখা দিয়েছে রাস্তা ভাঙন, শিক্ষা কার্যক্রম স্থগিত, দোকান, ঘরবাড়ি, নদীর পাড়ে ধস ও যোগাযোগ বিচ্ছিন্নতার মতো সংকট। সংশ্লিষ্ট প্রশাসন ও স্থানীয় কর্তৃপক্ষ সতর্ক অবস্থানে রয়েছে। তবে স্থানীয় বাসিন্দাদের দুর্ভোগ চরমে। প্রতিদিনের বাংলাদেশের প্রতিবেদকদের পাঠানো প্রতিবেদনে বিস্তারিত তুলে ধরা হলো-
ফেনীতে মুহুরী নদীর পানি বিপদসীমার ওপরে
ফেনীতে গত ২৪ ঘণ্টায় সর্বোচ্চ ৪০৬ মিলিমিটার বৃষ্টিপাত রেকর্ড করেছে আবহাওয়া অফিস, যা বিগত কয়েক বছরে জেলায় সর্বোচ্চ। ভারী বর্ষণ ও উজান থেকে নেমে আসা পানির কারণে মুহুরী ও সিলোনিয়া নদীর পানি বিপদসীমার ওপরে দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে।
ফেনী পানি উন্নয়ন বোর্ডের উপবিভাগীয় প্রকৌশলী মো. আবুল কাশেম জানান, মুহুরী নদীর পানি বিপদসীমার ৬৫ সেন্টিমিটার ওপর দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে, যা বন্যা পরিস্থিতি তৈরি করতে পারে। তিনি বলেন, ‘সীমান্তবর্তী মুহুরী, কহুয়া ও সিলোনিয়া নদীর পানি বাড়ছে, ভাঙন রোধে সতর্ক অবস্থানে রয়েছি।’
শহর ঘুরে দেখা যায়, টানা বৃষ্টিতে শহরের ডাক্তারপাড়া, শহীদ শহীদুল্লা কায়সার সড়ক, নাজির রোড, পেট্রোবাংলা এলাকা, পাঠানবাড়ি, শাহীন একাডেমি, সদর হাসপাতাল মোড়সহ নিচু এলাকাগুলো পানিতে তলিয়ে গেছে। দোকানপাট ও বাসাবাড়িতে পানি ঢুকে ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে।
ফুলগাজী উপজেলায় মুহুরী নদীর ভাঙনে দুটি দোকান নদীতে বিলীন হয়ে গেছে। রাজসপুর সড়কের বাঁধ ভেঙে ওই অঞ্চলের সড়ক যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়েছে।
শিক্ষা কার্যক্রমও বাধাগ্রস্ত হয়েছে। ফেনী সরকারি কলেজের এক শিক্ষার্থী জানান, ‘রাস্তাঘাট ডুবে যাওয়ায় পরীক্ষা দিতে যাওয়া অসম্ভব হয়ে পড়েছে, অথচ বোর্ড থেকে এখনও স্থগিতের কোনো নির্দেশনা আসেনি।’
ফেনী আবহাওয়া অফিসের ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা মো. মজিবুর রহমান বলেন, জেলায় টানা দুই দিন ধরে মাঝারি ও ভারী বৃষ্টিপাত হচ্ছে। মঙ্গলবার বেলা ৩টা পর্যন্ত ২৪ ঘণ্টায় সর্বোচ্চ ৪০৬ মিলিমিটার বৃষ্টিপাত রেকর্ড করা হয়েছে; যা বিগত কয়েক বছরে সর্বোচ্চ। আগামী ২-৩ দিন জেলাজুড়ে বৃষ্টিপাত অব্যাহত থাকার সম্ভাবনা রয়েছে।
ফেনী পৌরসভার প্রশাসক গোলাম মো. বাতেন বলেন, অতিবৃষ্টি ও অপর্যাপ্ত ড্রেনেজ ব্যবস্থার কারণে শহরে জলাবদ্ধতার সৃষ্টি হয়েছে। বৃষ্টি বন্ধ হলে পানি নেমে যাবে। ইতোমধ্যে পৌরসভার ৭টি টিম কাজ শুরু করেছে।
অতিভারী বৃষ্টিতে পটুয়াখালী শহরের অর্ধেক এলাকায় জলাবদ্ধতা
সোমবার রাত থেকে আজ মঙ্গলবার দুপুর পর্যন্ত পটুয়াখালীতে ২৪ ঘণ্টায় ২৩২ দশমিক ৪ মিলিমিটার বৃষ্টিপাত রেকর্ড হয়েছে। সকাল ৬টা থেকে ৯টার মধ্যেই পড়ে ৮৮ দশমিক ২ মিলিমিটার বৃষ্টি।
জেলা শহরের মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল, আদালত পাড়া, কলাতলা সড়ক, জুবিলি স্কুল রোড, এসডিও রোড, সবুজবাগ, গোরস্তান রোডসহ অধিকাংশ এলাকায় হাঁটু থেকে কোমর সমান পানি জমে যায়। জলাবদ্ধতায় দোকানপাট ও ঘরে পানি ঢুকে আসবাবপত্র ও পণ্যদ্রব্যের ক্ষতি হয়। অধিকাংশ শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান বন্ধ করে দেওয়া হয়।
ভুক্তভোগীরা অভিযোগ করেছেন, বছরের পর বছর ময়লা-আবর্জনায় বন্ধ ড্রেনেজ ব্যবস্থা ও অকার্যকর স্লুইসগেট ব্যবস্থাপনার কারণেই এই জলাবদ্ধতা। এক বাসিন্দার কথায়, ‘নির্বাচিত জনপ্রতিনিধির অনুপস্থিতিতে সমস্যাগুলোর সমাধান মিলছে না।’
পৌর প্রশাসক জুয়েল রানা বলেন, ‘ড্রেনের মুখ ও স্লুইসগেট খুলে দেওয়া হয়েছে, নদীতে ভাটা পড়লে দ্রুত পানি নেমে যাবে।’
নোয়াখালীতে টানা বৃষ্টিতে দুর্ভোগ
নোয়াখালীতে টানা ২৪ ঘণ্টার ভারী বর্ষণে সদর, সেনবাগ, বেগমগঞ্জ, চাটখিল ও সুবর্ণচরের নিচু এলাকাগুলোতে ভয়াবহ জলাবদ্ধতা সৃষ্টি হয়েছে। মাইজদীর ডিসি অফিস, পাঁচ রাস্তার মোড়, জেলা খানা সড়ক, পৌর বাজারের মতো গুরুত্বপূর্ণ স্থানগুলো পানিতে ডুবে গেছে।
জেলা আবহাওয়া অফিস জানিয়েছে, ২৪ ঘণ্টায় ১৪০ মিলিমিটার বৃষ্টিপাত রেকর্ড করা হয়েছে। মৌসুমি বায়ুর প্রভাবে আগামী দিনগুলোতেও বৃষ্টির পূর্বাভাস রয়েছে।
একাধিক শিশুরা স্কুলে যাওয়ার পথে কাদায় পড়ে আহত হয়েছে। সাধারণ মানুষের অভিযোগ, জলাবদ্ধতা নতুন কিছু নয়- প্রতি বছরই দেখা দেয়, কিন্তু কোনো স্থায়ী সমাধান নেই।
জেলা আবহাওয়া কর্মকর্তা মো. রফিকুল ইসলাম জানান, মঙ্গলবার দুপুর ১২টা পর্যন্ত ২৪ ঘণ্টায় ১৪০ মিলিমিটার বৃষ্টিপাত রেকর্ড করা হয়েছে। মৌসুমি বায়ুর প্রভাবে আরও বৃষ্টি হতে পারে, যা পরিস্থিতি আরও খারাপ করতে পারে।
জেলা প্রশাসক খন্দকার ইসতিয়াক আহমেদ বলেন, ‘প্রধান সড়কগুলোতে পানি নেই, কিছু গলিপথে সমস্যা রয়েছে। দ্রুত পদক্ষেপ নেওয়া হচ্ছে।’