রংপুর শিশু পুনর্বাসন কেন্দ্র
মেরিনা লাভলী, রংপুর
প্রকাশ : ০৫ জুলাই ২০২৫ ১৭:০৩ পিএম
আপডেট : ০৫ জুলাই ২০২৫ ১৭:০৯ পিএম
প্রতিদিনের বাংলাদেশসহ বিভিন্ন গণমাধ্যমে প্রকাশিত রংপুর সমন্বিত শিশু পুনর্বাসন কেন্দ্রে (বালিকা) শিশুদের শারীরিক, মানসিক ও যৌন নির্যাতনের ঘটনাটি আমলে নিয়েছেন আদালত। গত ২৯ জুন রংপুর মেট্রো কোতোয়ালি সিআর আমলি আদালতের বিচারক অতিরিক্ত চিফ মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট রাশেদ হোসাইন স্বপ্রণোদিত হয়ে মামলা (মিস কেস-২/২৫) করেছে।
এতে উল্লেখ করা হয়, গত ২৬ জুন গণমাধ্যমে প্রকাশিত বিভিন্ন সংবাদ পাঠ ও পর্যালোচনা করে দেখা যায়, রংপুর সমন্বিত শিশু পুনর্বাসন (বালিকা) কেন্দ্রে শারীরিক, মানসিক ও যৌন নির্যাতনের কারণে জীবন বাঁচাতে ৪ কিশোরী পালিয়ে যায়। উক্ত পুনর্বাসন কেন্দ্রের দায়িত্বরতরা ভিকটিম কিশোরীর চুল কেটে দেয় এবং কেন্দ্রের অনিয়মের কথা গোপন রাখতে তাকে চাপ প্রয়োগ করে। ভিকটিম কিশোরীর মা তাকে দেখতে গেলে পুনর্বাসন কেন্দ্রের কর্মকর্তারা দুর্ব্যবহার করেন। এ ছাড়া গত ১২ জুন ৪ কিশোরী নিখোঁজ হলেও এখনও ২ জন কিশোরীর সন্ধান মেলেনি। এমন অবস্থায় জনস্বার্থে ও ন্যায় বিচারের লক্ষ্যে রংপুর সমন্বিত শিশু পুনর্বাসন কেন্দ্র থেকে ৪ কিশোরী পালানোর কারণসহ গণমাধ্যমে প্রকাশিত সংবাদের প্রকৃত ঘটনা উদ্ঘাটনে বিস্তারিত তদন্ত হওয়া আবশ্যক মর্মে আদালতের কাছে প্রতীয়মান হয়েছে। পত্রিকায় প্রকাশিত ঘটনা বিষয়ে তদন্তে পুলিশ ব্যুরো অব ইনভেস্টিগেশনের (পিবিআই) পুলিশ সুপারকে নির্দেশ প্রদান করা হয়। আগামী ২৯ জুলাই তদন্ত প্রতিবেদন জমা দেওয়ার তারিখ নির্ধারণ করেছেন আদালত।
এদিকে নিখোঁজের ২১ দিন পর গত বৃহস্পতিবার বিকালে রংপুর সমন্বিত শিশু পুনর্বাসন কেন্দ্রের (বালিকা) নিবাসী রিতু আদালত চত্বরে আইনজীবী ও মানবাধিকার কর্মীদের শরণাপন্ন হয়েছেন। নির্যাতনের ভয়ে পালিয়ে যাওয়ার কারণ উল্লেখ করে পুনরায় নির্যাতনের কবলে না পড়তে আদালতের মাধ্যমে নিরাপদ স্থানে তাকে রাখার আবেদন করেছেন। আইনজীবী ও মানবাধিকার কর্মীরা বৃহস্পতিবার সন্ধ্যায় ঘটনার তদন্তকারী সংস্থা পিবিআইয়ের কাছে হস্তান্তর করেন। পিবিআই রিতুকে জিজ্ঞাসাবাদসহ নিরাপদ স্থানে রাখার কথা জানিয়েছে।
এর আগে গণমাধ্যম কর্মীদের রিতু আক্তার বলেন, সমাজসেবা কার্যালয় ও রংপুর সমন্বিত শিশু পুনর্বাসন কেন্দ্র (বালিকা) কর্মকর্তাদের যোগসাজশে প্রতি সপ্তাহে বাইরে থেকে বিভিন্ন পুরুষ কেন্দ্রে আসে। প্রতি সপ্তাহে নতুন নতুন মেয়েকে ধর্ষণ করত বহিরাগতরা। গত ১৫ জুন আমাকে ধর্ষণের তারিখ ছিল এবং পরবর্তী তারিখগুলোতে অন্য নিবাসীরা ধর্ষণের শিকার হতো। বিষয়টি জানতে পেরে সুযোগ বুঝে পুনর্বাসন কেন্দ্র থেকে স্মৃতি, কৃতি ও আশাসহ আমি পালিয়ে যাই এবং প্রত্যেকে যে যার মতো জায়গায় থাকে। আমি আমার এক পরিচিত আন্টির বাসায় আশ্রয় নিই। যেহেতু পুলিশ আমায় খুঁজছে, তাই আমি আদালত চত্বরে এসে আইনজীবী ও মানবাধিকার কর্মীদের সহযোগিতা চেয়েছি। তারা আমাকে নিরাপদ স্থানে রাখতে পুলিশের হাতে তুলে দিয়েছে। আমি সেন্টারের শিশুদের সঙ্গে অত্যাচারকারী এবং সেন্টারের সব কর্মকর্তার বিচার চাই।
পিবিআই রংপুরের পুলিশ পরিদর্শক মিন্টু চন্দ্র বণিক বলেন, আদালতের একটি মিস কেস আমাদের হাতে এসেছে। রংপুর সমন্বিত শিশু পুনর্বাসন কেন্দ্র (বালিকা) থেকে ৪ জন ভিকটিম মিসিং হয়েছিল। অভিযোগ রয়েছে তাদের ওপর শারীরিক, মানসিক ও যৌন নির্যাতন করা হয়েছে। এখন পর্যন্ত ৩ জন উদ্ধার হয়েছে। এর মধ্যে উদ্ধার হওয়া নিবাসী রিতু মনিকে আমরা জিজ্ঞাসাবাদ করব এবং তদন্ত করে প্রতিবেদন আদালতের কাছে জমা দেব।
উল্লেখ্য, নগরীর দেওডোবা ডাংগীরপাড় এলাকার রংপুর সমন্বিত শিশু পুনর্বাসন কেন্দ্রে গত ১২ জুন রাত থেকে নিখোঁজ হন নিবাসী নিতু, স্মৃতি, কৃতি ও আশা নামে চার কিশোরী। ১৫ জুন পরিবারের সদস্যরা স্মৃতি ও কৃতিকে নগরীর চিড়িয়াখানা এলাকা থেকে উদ্ধার করে পুলিশকে জানায়। পরে পুলিশ তাদের আদালতের মাধ্যমে পুনরায় পুনর্বাসন কেন্দ্রে পাঠায়। এ ঘটনায় পরিবারের সদস্যরা উদ্ধার হওয়া কিশোরীদের পুনর্বাসন কেন্দ্রে পাঠাতে অস্বীকৃতি জানায়। আপত্তির কারণ হিসেবে পুনর্বাসন কেন্দ্রে মেয়ের ওপর নির্যাতন ও তার জীবনের নিরাপত্তা নিয়ে তারা শঙ্কিত বলে গণমাধ্যমকে জানান। এ ঘটনায় ২৫ জুন আদালতের মাধ্যমে স্মৃতিকে নিজ জিম্মায় নেয় পরিবারের সদস্যরা। নিবাসী স্মৃতি অভিযোগ করেন, গণমাধ্যমে কথা বলার কারণে পুনর্বাসন কেন্দ্রের দায়িত্বপ্রাপ্তরা তার ওপর মানসিক নির্যাতনসহ তার চুল কেটে দিয়েছে। এদিকে পুনর্বাসন কেন্দ্রের নিবাসী আশা এখনও নিখোঁজ রয়েছে।