আব্দুর রহমান মিল্টন, ঝিনাইদহ
প্রকাশ : ০৫ জুলাই ২০২৫ ১০:৪৭ এএম
ঝিনাইদহের শৈলকুপা স্বাস্থ্য কমপ্লেসের অ্যাম্বুলেন্স ড্রাইভার বকুল মিয়া ঠিকঠাক মতো চোখে দেখতে পান না। অথচ মুমূর্ষু রোগী নিয়ে ছুটতে হয় তাকে। এতে সব সময় সড়ক দুর্ঘটনার ঝুঁকি থাকে। ইতোমধ্যে কয়েকবার দুর্ঘটনায় পড়েছেনও। এসব কারণে তাকে ১৩ বার শোকজ ও কৈফিয়ত তলব করা হয়েছে। মেডিকেল বোর্ড তাকে শারীরিকভাবে অযোগ্য জানিয়েছে। তারপরও তিনি এখনও বহালতবিয়তে সরকারি হাসপাতালে দায়িত্ব পালন করে যাচ্ছেন।
এ নিয়ে স্বাস্থ্য বিভাগে ব্যাপক জল্পনা-কল্পনা, ক্ষোভ ও অসন্তোষ দেখা দিয়েছে। প্রশ্ন উঠেছে ড্রাইভার বকুল মিয়ার এত ক্ষমতার উৎস কোথায়? কেন তাকে এখনও অ্যাম্বুলেন্স ড্রাইভারের দায়িত্বে রাখা হয়েছে। তার কারণে যে রোগীর জীবন সংশয়ে পড়তে পারে। বড় ধরনের দুর্ঘটনার বিষয়টি উড়িয়ে দেওয়া যায় না। তিনি চোখে ভালো দেখেন না বলে কয়েকবার তো তার কারণেই রোগী নিয়ে অ্যাম্বুলেন্স দুর্ঘটনায় পড়েছে।
অ্যাম্বুলেন্স ড্রাইভার বকুল মিয়া দীর্ঘদিন ধরে ঝিনাইদহ, কালীগঞ্জ ও শৈলকুপার বিভিন্ন হাসপাতালে ড্রাইভার পদে চাকরি করছেন। কিন্তু বেশিরভাগ সময় তার জায়গায় অ্যাম্বুলেন্স চালান তার দুই ছেলে মিল্টন ও মিলন। এই বিষয়টি সংশ্লিষ্টদের নজরে এলেও এর বিরুদ্ধে কোনো কার্যকর ব্যবস্থা নিতে দেখা যায় এখনও।
তার বিরুদ্ধে বেশ কয়েকবার তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়েছে এবং প্রতিবারই তাকে দোষী সাব্যস্ত করা হয়েছে। তবুও তার বিরুদ্ধে কোনো শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি। উল্টো বর্তমানে তিনি দাপটের সঙ্গে সরকারি চাকরিতে বহাল রয়েছেন।
২০২০ সালের ১ জানুয়ারি শৈলকুপা উপজেলা স্বাস্থ্য কর্মকর্তা ডা. রাশেদ আল মামুন একটি চিঠিতে অভিযোগ করেন যে, বকুল মিয়া নিজে গাড়ি না চালিয়ে বহিরাগতদের দিয়ে অ্যাম্বুলেন্স চালাচ্ছেন। ২০২১ সালে এমনই এক ঘটনায় শৈলকুপা হাসপাতালের অ্যাম্বুলেন্সটি কিছু লোকজন নিয়ে কুষ্টিয়ায় গিয়ে আটকা পড়েন। পরে জানা যায়, গাড়িটি চালাচ্ছিলেন বকুল মিয়ার ছেলে মিল্টন। ওই বছরের ১৮ ডিসেম্বর কুষ্টিয়া মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল থেকে পুলিশ গাড়িটি উদ্ধার করে হাসপাতাল কর্তৃপক্ষের কাছে হস্তান্তর করেন।
গত বছরে কালীগঞ্জ হাসপাতালে বদলি হওয়ার পরেও বকুল মিয়া কর্তৃপক্ষের ছুটি ছাড়া কর্মস্থলে অনুপস্থিত থাকতেন। ৫ মার্চ তাকে শোকজ করা হলেও সন্তোষজনক জবাব দিতে পারেননি। ২০ এপ্রিল তাকে যশোরে গাড়ি মেরামতে পাঠানো হলে তিনি সেখানে না গিয়ে ঝিনাইদহে রাত কাটিয়ে ফেরেন। জবাব চাওয়ায় তিনি স্বাস্থ্য কর্মকর্তার সঙ্গে অসৌজন্যমূলক আচরণ করেন। পরবর্তী সময়ে একাধিক স্মারকে তাকে কারণ দর্শানোর নোটিস পাঠানো হলেও তিনি চরম ঔদ্ধত্য দেখান। এরপর তাকে ঝিনাইদহ সদর হাসপাতালে বদলি করা হয়।
সদর হাসপাতালে যোগদানের পরও তিনি নিজে গাড়ি চালানো বন্ধ রাখেন। তবে বহিরাগতদের দিয়ে সরকারি অ্যাম্বুলেন্স চালানো অব্যাহত রাখেন। বিষয়টি জানার পর হাসপাতালের তত্ত্বাবধায়ক ডা. সৈয়দ রেজাউল ইসলাম খুলনা বিভাগের পরিচালককে চিঠিতে এটি জানান। তারপরও তার আচরণে কোনো পরিবর্তন হয়নি বলে অভিযোগ রয়েছে।
সবশেষ গত বছরের ১৫ আগস্ট কালীগঞ্জ উপজেলার দুলাল মুন্দিয়া এলাকায় একটি অ্যাম্বুলেন্স দুর্ঘটনায় পড়েন। তদন্ত কমিটি বকুল মিয়ার স্বাস্থ্য পরীক্ষা শেষে তাকে অযোগ্য বলে ঘোষণা করে ৩১ আগস্ট প্রতিবেদন দাখিল করা হয়। তদন্ত কমিটিতে ছিলেন আবাসিক মেডিকেল অফিসার ডা. গুলশান আরা লিমা, ইনডোর মেডিকেল অফিসার ডা. নাঈম সিদ্দিকী ও মেডিকেল অফিসার ডা. রাজীব চক্রবর্তী।
বকুল মিয়া দাবি করেছেন, তিনি অসুস্থ থাকায় মাঝেমধ্যে তার ছেলে অ্যাম্বুলেন্স চালান। সিভিল সার্জন ডা. কামরুজ্জামান জানিয়েছেন, অভিযোগের পরিপ্রেক্ষিতে তাকে শৈলকুপায় বদলি করা হয়েছে। তবে তিনি যদি আবারও নিজে গাড়ি না চালান, তাহলে আরও কঠোর পদক্ষেপ নেওয়া হবে।
এদিকে বদলি আদেশের পর বকুল মিয়া ঢাকায় বদলি বাতিলের চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছেন বলেও অভিযোগ রয়েছে। একই সঙ্গে তার স্থলাভিষিক্ত ব্যক্তি হুমকি-ধমকিও দেওয়া হচ্ছে বলে অভিযোগ উঠেছে।