হুমায়ুন মাসুদ, চট্টগ্রাম
প্রকাশ : ০৫ জুলাই ২০২৫ ১০:৩৫ এএম
আপডেট : ০৫ জুলাই ২০২৫ ১০:৩৮ এএম
চলতি বছরের ৯ জানুয়ারি মাছ ধরতে সাগরে যায় ‘এফভি যৌথ উদ্যোম’ নামের একটি ফিশিং জাহাজ। ২২ দিন পর ৩১ জানুয়ারি জাহাজটি উপকূলে ফিরে আসে। এই সময়কালে জাহাজটিতে উৎপন্ন হয় ১০ কেজি অপচনশীল বর্জ্যÑ যার বেশিরভাগই ছিল প্লাস্টিক বজ্য। এসব বর্জ্য মূলত নাবিকদের ব্যবহৃত খাবার ও পানীয় পণ্যের প্যাকেট থেকে তৈরি হয়।
আগে এসব বর্জ্য সাগরেই ফেলে দেওয়া হতো। তবে সাম্প্রতিক সময়ে সামুদ্রিক মৎস্য অধিদপ্তরের নির্দেশনায় নাবিকরা এখন সেসব বর্জ্য উপকূলে ফিরিয়ে আনছেন, ফলে দূষণ থেকে রক্ষা পাচ্ছে সামুদ্রিক জীববৈচিত্র্য।
এফভি যৌথ উদ্যোম জাহাজটি ২০২৪ সালের ৫ ডিসেম্বর থেকে চলতি বছরের ২৪ মার্চ পর্যন্ত মোট চারটি যাত্রায় সমুদ্রে মাছ ধরেছে। এই চার ট্রিপে নাবিকরা মোট ৩৮ কেজি অপচনশীল বর্জ্য উপকূলে ফিরিয়ে এনেছেনÑ যার মধ্যে ছিল যথাক্রমে ১২, ১০, ৮ ও ৬ কেজি করে বর্জ্য।
এভাবে অপচনশীল বর্জ্য উপকূলে নিয়ে আসার কারণে বছরে অন্তত ২৫ মেট্রিক বর্জ্য সাগরে কম পড়বে বলে জানিয়েছেন সামুদ্রিক মৎস্য দপ্তরের কর্মকর্তারা।
সামুদ্রিক মৎস্য দপ্তরের সহকারী পরিচালক ফারুক হোসাইন সাগর প্রতিদিনের বাংলাদেশকে জানান, চলতি বছরের জানুয়ারি থেকে চালু হওয়া এই উদ্যোগে দেখা যাচ্ছে, ২৫০টি বাণিজ্যিক ফিশিং জাহাজ বছরে প্রায় ২৫ মেট্রিক টন অপচনশীল বর্জ্য সমুদ্রে ফেলা থেকে বিরত থাকবে। ইতোমধ্যে প্রতিটি জাহাজে দুটি করে বর্জ্য বিন বসানো হয়েছে এবং প্রতিটি ট্রিপ শেষে ওই বর্জ্য উপকূলের নির্ধারিত ডাম্পিং স্টেশনে জমা দেওয়া হচ্ছে।
খোঁজ নিয়ে জানা যায়, সমুদ্রে মাছ ধরতে যাওয়া একটি জাহাজে প্রায় ৩০-৪০ জন নাবিক থাকেন এবং তারা সব খাবার চট্টগ্রাম থেকে নিয়ে যান। এসব খাবারের বেশিরভাগ থাকে পলিথিনে মোড়ানো, যা খাওয়া শেষে আগে সাগরে ফেলে দেওয়া হতো। এই বর্জ্যের কারণে সাগরে ঘোস্ট ফিশিং, মাছের প্রজনন ব্যাঘাতসহ বাস্তুতন্ত্রে নানাবিধ ক্ষতির সৃষ্টি হচ্ছিল। এমনকি মাছের সরবরাহও দিন দিন কমে আসছিল বলে জানান নাবিকরা।
২০২৪ সালের ডিসেম্বরে এই সংকট মোকাবিলায় পরিকল্পনা নেয় সামুদ্রিক মৎস্য দপ্তর। জানুয়ারি থেকে শুরু হয় তা বাস্তবায়ন। বর্তমানে ২৬৪টি বাণিজ্যিক জাহাজের মধ্যে ২৫০টিতেই বসানো হয়েছে বর্জ্য বিন। মৎস্য দপ্তরের হিসাবে, একটি জাহাজ বছরে গড়ে ১০ বার সমুদ্রে যায় এবং প্রতি ট্রিপে ১০ কেজির মতো বর্জ্য উৎপন্ন করে। ফলে বছরে প্রায় ২৫ হাজার কেজি বা ২৫ টন বর্জ্য সাগরে না পড়ে উপকূলে ফিরে আসছে।
বাংলাদেশ মেরিন ফিশারিজ অ্যাসোসিয়েশনের সচিব আবিদ হোসেন প্রতিদিনের বাংলাদেশকে বলেন, মৎস্য দপ্তরের আহ্বানে সব ফিশিং জাহাজে বিন বসানো হয়েছে এবং নাবিকদের নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে প্লাস্টিক বর্জ্য সেখানে ফেলার জন্য। এ ছাড়া তিনি বলেন, দেশের ৩৩-৩৪ হাজার যান্ত্রিক নৌযান, যেগুলো এখনও এই কর্মসূচির আওতায় আসেনি, সেগুলোকেও সচেতন করতে পারলে দূষণ আরও কমবে।
সামুদ্রিক মৎস্য দপ্তরের পরিচালক আবদুস ছাত্তার প্রতিদিনের বাংলাদেশকে বলেন, এই উদ্যোগ ব্যক্তিগত পর্যায়ে শুরু হলেও এখন তা নীতিগতভাবে বিস্তৃত হচ্ছে। তিনি বলেন, ‘আমরা মাছ কমে যাওয়ার কারণ খুঁজতে গিয়ে দেখেছি, প্লাস্টিক বর্জ্য সাগরের বাস্তুতন্ত্র ধ্বংস করছে। তখন থেকেই আমরা এই দূষণ প্রতিরোধে কাজ শুরু করি। এখন সবাই সচেতন হচ্ছে।’
তিনি আরও জানান, এখনও যেসব যান্ত্রিক নৌযান নিবন্ধনের বাইরে আছে, তাদের নিয়েও পরিকল্পনা চলছে। সবার সহযোগিতায় বঙ্গোপসাগরকে দূষণমুক্ত রাখা এবং টেকসইভাবে মৎস্য সম্পদ আহরণ করা সম্ভব বলেও আশাবাদ ব্যক্ত করেন তিনি।