আড়াইহাজার
এম আর কামাল, নারায়ণগঞ্জ
প্রকাশ : ০৩ জুলাই ২০২৫ ১৭:২৮ পিএম
আপডেট : ০৩ জুলাই ২০২৫ ১৭:৩২ পিএম
নারায়ণগঞ্জের আড়াইহাজারে কিশোরীদের ঘরছাড়া হওয়ার প্রবণতা ভয়াবহ অবস্থায় দাঁড়িয়েছে। প্রেমের ফাঁদে এসব কিশোরী ঘর ছাড়ছে বলে জানায় পরিবার ও সংশ্লিষ্টরা। যাদের অনেকের বয়স ১২ থেকে ১৬ বছর।
পুলিশ ও স্থানীয়রা জানান, গত দুই মাসে উপজেলার বিভিন্ন গ্রাম থেকে ৫০ জনেরও বেশি কিশোরী নিখোঁজ হয়েছে। এদের কেউ কেউ পুলিশের সহায়তায় উদ্ধার হলেও অনেকে এখনও নিখোঁজ। গড়ে প্রতিদিন একজন করে প্রেমের ফাঁদে পড়ে নিখোঁজ হয় বলে জানিয়েছে পুলিশ।
পরিবার ও স্থানীয়দের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, বেশিরভাগ কিশোরী ফেসবুক বা মেসেঞ্জারভিত্তিক প্রেমের সম্পর্ক গড়ে তোলে। আবার কিছু কিশোরী স্থানীয়ভাবে প্রেমের ফাঁদে পা দিচ্ছে। একপর্যায়ে তারা পরিবারকে না জানিয়ে নিরুদ্দেশ হচ্ছে। প্রেমিকের টানে সাড়া দিয়ে তারা পরিবার থেকে বিচ্ছিন্ন হচ্ছে।
ভয়ংকর ব্যাপার হলো, যাদের সঙ্গে পালিয়ে যাচ্ছে তারা প্রায় সবাই বিবাহিত অথবা বয়সে অনেক বড়। এদের কেউ কেউ মিথ্যা পরিচয় দেয়, কেউ প্রলোভন দেখায়, আবার কেউ ভিডিও কলের মাধ্যমে কিশোরীদের মানসিকভাবে নিয়ন্ত্রণ করে।
নাম প্রকাশ না করার শর্তে একজন ভুক্তভোগী অভিভাবক বলেন, আমার মেয়ে নবম শ্রেণিতে পড়ে। সে স্কুলে যাওয়ার কথা বলে আর ফিরে আসেনি। পরে খোঁজ নিয়ে দেখি সে ৩৫ বছরের এক লোকের সঙ্গে পালিয়েছে। সেই লোক বিয়ে করেছে এবং নিজের পরিচয় গোপন করেছিল।
পুলিশ বলেছে, পরিবার থেকে লিখিত অভিযোগ পাওয়ার পর তদন্ত করে কয়েকজন কিশোরীকে উদ্ধার করা হয়েছে। কিন্তু অনেকে লোকলজ্জার ভয়ে থানায় আসতে চান না। আবার অনেকে মামলা না করে মেয়েকে চুপচাপ খুঁজতে থাকেন। এতে সময় নষ্ট হয়। অপরাধীরা আরও শক্ত অবস্থানে চলে যায়।
আড়াইহাজার উপজেলার ইউএনও সাজ্জাত হোসেন বলেন, ‘এসব ঘটনার পুনরাবৃত্তিরোধে দরকার পারিবারিক সচেতনতা, স্কুলে কিশোর-কিশোরীদের মানসিক কাউন্সেলিং, অনলাইন নিরাপত্তা শিক্ষার ব্যবস্থা এবং পুলিশের সক্রিয় নজরদারি। অনেকে বলেন, এখনই প্রতিরোধ না করা গেলে আগামী দিনগুলোয় এই সংকট আরও জটিল হবে।
আড়াইহাজার থানার ওসি সাইফ উদ্দিন বলেন, ‘এই ধরনের ঘটনার পেছনে মূলত মোবাইল আসক্তি, ফেসবুকের অপব্যবহার এবং পরিবারের লোকজনের নজরদারির অভাব কাজ করছে। বেশকিছু ঘটনায় দেখা গেছে, মেয়েরা না বুঝেই প্রতারিত হয়ে ঘর ছেড়েছে। পরে অনেকেই বুঝতে পেরে কান্নাকাটি করছে। কিন্তু তখন অনেক ক্ষতি হয়ে গেছে। প্রতিদিন গড়ে ১ জন করে নিখোঁজের খবর মিলছে। গত দুই মাসে অন্তত ৫০টি এমন ঘটনা ঘটেছে।’
সদাসদী বহুমুখী উচ্চ বিদ্যালয়ের সহকারী শিক্ষিকা নারগিস আক্তার বলেছেন, ‘শিক্ষার্থীদের মধ্যে মোবাইল ফোনের ব্যবহার অভিভাবকদের নিয়ন্ত্রণে নেই। অনেক অভিভাবক স্মার্টফোন কিনে দিচ্ছেন। মেয়েরা নিজের রুমে ঘণ্টার পর ঘণ্টা কাটায়, কেউ জানে না কী করছে, কার সঙ্গে কথা বলছে। এ সুযোগেই অপরিচিত পুরুষেরা ফেসবুকে ফ্রেন্ড রিকোয়েস্ট পাঠিয়ে গল্প শুরু করে, পরে প্রেমে রূপ নেয়।’
রোকন উদ্দিন মোল্লা গার্লস ডিগ্রি কলেজের অধ্যক্ষ মোজাম্মেল হক বলেন, ‘আমরা প্রতিদিন ক্লাসে দেখি কিছু মেয়ের আচরণ বদলে যাচ্ছে। মনোযোগ নেই, চট করে কান্না পায়, কারও সঙ্গে কথা বলে না। পরে শুনি, সে প্রেমে পড়েছে। কেউ কেউ আবার পালিয়ে গেছে। এসব ঘটনা এখন নিয়মিত।’
উপজেলা মহিলা বিষয়ক কর্মকর্তা নাজমা আক্তার বলেন, ‘মেয়েদের চোখে এখন প্রেমের নামে একটা ফাঁদ ধরিয়ে দেওয়া হচ্ছে। যারা দিচ্ছে, তারা অনেকটা পেশাদার প্রতারকের মতো কাজ করছে। তারা জানে কীভাবে মন জয় করতে হয়। ভয়াবহ বিষয় হলো, এসব সম্পর্কের পরিণতি প্রায় সবসময়ই দুঃখজনক।’
আড়াইহাজার থানার ওসি বলেন, ‘শুধু পুলিশি অভিযান বা উদ্ধারে দায়িত্ব শেষ নয়। প্রতিটি পরিবারেরই দরকার নিজ সন্তানদের দিকে গভীর মনোযোগ দেওয়া। মোবাইল ব্যবহারে সীমা টানা। খোলামেলা যোগাযোগ স্থাপন এবং অনলাইনে কী করছে তা জানা। কিশোরী নিখোঁজ সংক্রান্ত ঘটনায় দ্রুত পদক্ষেপ নেওয়া হচ্ছে। অপরাধীদের বিরুদ্ধে কঠোর আইনি ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে।