শাহ্ আলম শাহী, দিনাজপুর
প্রকাশ : ২৬ জুন ২০২৫ ০৯:৫৯ এএম
দিনাজপুরের পার্বতীপুর উপজেলার ইন্দ্রপুর গ্রামে নিজ খামারের পাশে দেশি টেংরা মাছের পোনা হাতে উদ্যোক্তা মনির হোসেন
দিনাজপুরে আধুনিক প্রযুক্তির ব্যবহারে দেশি টেংরা মাছের পোনা উৎপাদনে ব্যাপক সাফল্য অর্জন করেছেন উদ্যোক্তা মনির হোসেন। তার কাছ থেকে আশপাশের অঞ্চলসহ দূর-দূরান্তের মৎস্য খামারিরা পোনা সংগ্রহ করে চাষ করছেন সুস্বাদু ও পুষ্টিগুণে সমৃদ্ধ টেংরা মাছ। দেশি টেংরা মাছের পোনা উৎপাদনে তার এই সাফল্য এখন অনেকের জন্য মৎস্যচাষে অনুপ্রেরণার উৎস হয়ে উঠেছে।
অন্যান্য মাছের তুলনায় টেংরা মাছের কাঁটা কম হওয়ায় এটি অনেকের কাছেই বেশ প্রিয়। খেতে সুস্বাদু ও পুষ্টিগুণে সমৃদ্ধ হওয়ায় এর বাজারমূল্যও তুলনামূলক বেশি। একসময় জলাশয় ও নদীতে প্রচুর পাওয়া গেলেও নানা কারণে হারিয়ে যেতে বসা দেশি টেংরা মাছ এখন পুকুরেই চাষ হচ্ছে।
এই টেংরা মাছের পোনা উৎপাদন হচ্ছে দিনাজপুরের পার্বতীপুর উপজেলার মমিনপুর ইউনিয়নের ইন্দ্রপুর গ্রামের একটি পুকুরে। মনির হোসেন নামে এক প্রশিক্ষিত যুবক প্রতিবেশী মোক্তার আলীর কাছ থেকে ২৫ হাজার টাকায় ৫০ শতক জমি লিজ নিয়ে শুরু করেছেন দেশি টেংরা মাছের পোনা উৎপাদন। আধুনিক প্রযুক্তির মাধ্যমে পোনা উৎপাদন করে মাত্র তিন মাসেই তিনি বিক্রি থেকে আয় করেছেন লক্ষাধিক টাকা।
মনির হোসেন (২৮) দিনাজপুর জেলার পার্বতীপুর উপজেলার মমিনপুর ইউনিয়নের ইন্দ্রপুর গ্রামের নূরুল হকের ছেলে। বেশি দূর পড়াশোনা করতে পারেননি তিনি। মনির হোসেন ২০১৯ সালে যুব উন্নয়ন প্রশিক্ষণ কেন্দ্রে প্রশিক্ষণ গ্রহণের পর একটি ছোট জলাশয়ে মাছ চাষ শুরু করেন এবং এতে লাভের সম্ভাবনা দেখে মাছ চাষে আগ্রহী হয়ে ওঠেন। এরপর কৃষিকাজের পাশাপাশি পুরোদমে মাছ চাষ শুরু করেন তিনি। দেশি টেংরা মাছের পোনা উৎপাদনে মনির হোসেন এখন অভাবনীয় সাফল্য অর্জন করেছেন।
মনির হোসেন জানান, ৫০ শতক পুকুরে মাছ চাষে তার মোট খরচ হয়েছে ২ লাখ টাকা। এক বছরে তিনি মাছ বিক্রি করে আয় করেছেন ৩ লাখ ৭০ হাজার টাকা। চলতি বছর নতুন করে তিনি আরও ২ একর পুকুর লিজ নিয়েছেন।
বর্তমানে তার খামারে ৩ জনের স্থায়ী কর্মসংস্থান এবং ৭ জন অস্থায়ীভাবে কাজ করছেন। মাছের পোনা উৎপাদনের পাশাপাশি পুকুরের চারপাশে তিনি ফলদ গাছ ও শাক-সবজি রোপণ করেছেন।
আশপাশের এলাকা ছাড়াও দূর-দূরান্ত থেকে মৎস্য বিক্রেতা ও খামারিরা তার কাছ থেকে পোনা কিনে নিয়ে যাচ্ছেন। অনেকেই অন্যান্য মাছের পরিবর্তে এখন সুস্বাদু ও পুষ্টিগুণে সমৃদ্ধ টেংরা মাছ চাষে আগ্রহ দেখাচ্ছেন। দেশি টেংরা মাছের পোনা উৎপাদনে মনির হোসেনের এই সাফল্য এখন অনেকের জন্যই মৎস্যচাষে অনুপ্রেরণার উৎস হয়ে উঠেছে।
মাছের পোনা বিক্রেতা মকছেদ আলী জানান, মনিরের পুকুর থেকে আমি সপ্তাহে ৩-৪ দিন হাঁড়িতে করে টেংরা মাছের পোনা নিয়ে বাইরে বিক্রি করি। এই পোনার চাহিদা অনেক বেশি। অনেকেই আগেই অর্ডার দিয়ে রাখেন। বিক্রি করে আমার ভালোই লাভ হয়।’
পল্লী কর্ম সহায়ক ফাউন্ডেশনের (পিকেএসএফ) সহায়তায় দেশি টেংরা মাছের পোনা উৎপাদনে উদ্যোক্তা হিসেবে মনিরকে শুরু থেকেই সহযোগিতা করে আসছে মৎস্য বিভাগ ও গ্রাম বিকাশ কেন্দ্র। গ্রাম বিকাশ কেন্দ্রের ‘সূচনা মহিলা সমিতিÑ ভবের বাজার শাখা’ থেকে কারিগরি সহায়তা ও প্রযুক্তি সম্প্রসারণের মাধ্যমে মনির হোসেন টেংরা মাছের পোনা উৎপাদন করে তা সর্বত্র ছড়িয়ে দিচ্ছেন।
গ্রাম বিকাশ কেন্দ্রের মৎস্য কর্মকর্তা মো. জাহিদুল ইসলাম জানান, টেংরা মাছ সুস্বাদু ও পুষ্টিগুণে ভরপুর হওয়ায় এর বাজারমূল্য বেশি। এই মাছ চাষে ভালো মুনাফা সম্ভব, যা পুকুর মালিকদের আয় বাড়াতে সহায়ক। শিক্ষিত বেকার যুবকরা আধুনিক পদ্ধতিতে পোনা উৎপাদন ও চাষ করে বেকারত্ব দূর করছেন। শুরু থেকেই মনির হোসেনকে সহায়তা করছে গ্রাম বিকাশ কেন্দ্র ও পল্লী কর্ম সহায়ক ফাউন্ডেশন।
দিনাজপুর জেলা মৎস্য কর্মকর্তা মো. তারিফুর রহমান সরকার বলেন, ‘উদ্যোক্তা মনির আমাদের গড়া। যুবকদের চাকরির পেছনে না ছুটে মাছ চাষে আগ্রহী করতে আমরা প্রশিক্ষণ দিচ্ছি। টেংরা চাষ পুষ্টি ও আয়ের পাশাপাশি দেশের অর্থনীতিতে বড় ভূমিকা রাখতে পারে।’
তিনি আরও বলেন, সঠিক পরিচর্যায় দেশি টেংরা মাছ উৎপাদন কর্মসংস্থান বাড়াবে, আমিষের চাহিদা মেটাবে এবং একে লাভজনক খাতে রূপান্তরিত করা সম্ভব। উদ্যোক্তা মনির হোসেনের উদ্যোগ ইতোমধ্যেই জাতীয় অর্থনীতিতে অবদান রাখছে।