রাজু আহমেদ, রাজশাহী
প্রকাশ : ২৬ জুন ২০২৫ ০৯:৫৩ এএম
আপডেট : ২৬ জুন ২০২৫ ২১:১৭ পিএম
রাজশাহী নগরীর কোর্ট স্টেশন সংলগ্ন রেলের বিপুল আয়তনের জমি দখল করে সেখানে একাধিক বাড়িঘরসহ ব্যবসা প্রতিষ্ঠান গড়ে তোলা হয়েছে
পশ্চিমাঞ্চল রেলের হাজার হাজার বিঘা জমি বছরের পর বছর ধরে রাজনৈতিক নেতা, প্রভাবশালী ব্যক্তি ও দখলদারদের কবলে পড়ে আছে। এসব জমিতে গড়ে উঠেছে বসতবাড়ি, দোকানপাট, ওয়ার্কশপ, এমনকি রাজনৈতিক কার্যালয় পর্যন্ত। দখলদারদের বিরুদ্ধে একাধিকবার উচ্ছেদ অভিযান চালানো হলেও দীর্ঘস্থায়ী কোনো পদক্ষেপ না থাকায় জমিগুলো আবারও বেদখলে চলে যাচ্ছে। এতে যেমন রেল রাজস্ব হারাচ্ছে, তেমনি ভবিষ্যতে জমি উদ্ধার নিয়ে জটিলতা বাড়ছে।
রেল কর্তৃপক্ষের দাবি, জনবল ও অর্থের ঘাটতির কারণে নিয়মিত উচ্ছেদ অভিযান পরিচালনা সম্ভব হচ্ছে না। রাজশাহীর দরিখরবোনা থেকে কোর্ট স্টেশন এলাকা পর্যন্ত প্রায় শতকোটি টাকা মূল্যের রেলভূমি ২০০৭, ২০১৪ ও ২০১৯ সালে তিনবার উচ্ছেদ করা হলেও এখন আবার তা দখল হয়ে গেছে।
গতকাল বুধবার সরেজমিনে দেখা গেছে, রেললাইনের দুই ধারে এসব জমিতে বাড়ি, দোকান ও রাজনৈতিক কার্যালয় গড়ে তোলা হয়েছে। স্থানীয়দের অভিযোগ, কার্যত উচ্ছেদ অভিযান পরিচালনা করা হলেও উদ্ধার হওয়া সেই জমিগুলো ধরে রাখতে কোনো পদক্ষেপ না নেওয়ায় পুনরায় রেলের এই জমিগুলো বেদখল হয়ে যায়।
রাজশাহীর আমনুরা-গোদাগাড়ী সেকশনের দিগরাম-ঘুণ্টিঘর এলাকায় রেলের ৩ দশমিক ৫ একরের একটি পুকুর দখল করে তা ভরাট করে প্লট আকারে তিন লাখ টাকা করে বিক্রি করেছেন স্থানীয় প্রভাবশালী ইসরাইল মোড়ল ও তার সহযোগীরা। রেলের জমি প্লট করে বিক্রি করলেও বিষয়টি সম্পর্কে পশ্চিমাঞ্চল রেলের ভূ-সম্পত্তি বিভাগ কিছুই জানে না।
চারঘাট উপজেলার পরিত্যক্ত নন্দনগাছী স্টেশনজুড়ে ৩৭৬টি দোকান নির্মাণ করে তা ভাড়া দেওয়া হচ্ছে। একইভাবে সরদহ রোড স্টেশন এলাকায় ৩২টি দোকান নির্মাণ করে ভাড়া আদায় করছে একটি দখলদার চক্র। দোকানপ্রতি মাসে ১৫০০ থেকে ২৫০০ টাকা পর্যন্ত ভাড়া আদায় করে বছরে প্রায় কোটি টাকা আয় করছে তারা। এভাবে প্রতি মাসে প্রায় ৮-১০ লাখ টাকা এবং বছরে কোটি টাকার ওপরে ভাড়া তুলছে দখলদার চক্র। অভিযোগ রয়েছে, রেলওয়ের পশ্চিম অঞ্চলের পাকশী ভূসম্পত্তি দপ্তরের কিছু অসাধু কর্মকর্তা নামকাওয়াস্তে লিজ ও ভুয়া কাগজপত্র তৈরি করে এসব কাজে সহায়তা করছেন।
এদিকে গত বছর রাজশাহী স্টেশনের উত্তরে অবস্থিত হাজরাপুকুর এলাকায়ও রেলের একটি পুকুর ভরাট করে সেখানে কারখানা ও বাড়ি নির্মাণের অভিযোগ রয়েছে রাজশাহী সিটি করপোরেশনের ১৯ নম্বর ওয়ার্ড আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক কামরুল ইসলাম ও তার বেয়াই, রেলের সাবেক কর্মচারী খাদেমুল ইসলামের বিরুদ্ধে। শিরোইল কলোনি এলাকায় রেলওয়ের হাজরাপুকুর ভরাটসহ সেখানে রেলওয়ের জমি দখলে নিয়ে একটি ওয়ার্কশপ তৈরি করেছেন কামরুল ইসলাম। একই জমিতে তার বেয়াই ও রেলের সাবেক কর্মচারী খাদেমুল ইসলাম নির্মাণ করেছেন দোতলা পাকা বাড়ি। এলাকাবাসীর অভিযোগ পাওয়ার পর ২০২৪-এর জুন মাসে রেলের ভূসম্পত্তি বিভাগের জনবল ওই জমি পরিমাপ করে সীমানা প্রাচীর দেয়। তবে দুই দখলদারের দখল করা ১২ কাঠা জমি ছেড়ে রেল প্রাচীর তৈরি করেছে। ফলে দখল হওয়া রেলের জমি দুই দখলদারের কবলেই রয়ে গেছে। দখল হওয়া ওই জমির বর্তমান বাজারমূল্য প্রায় ৪ কোটি টাকা।
রেলের জমি দখল করে ওয়ার্কশপ ও বাড়ি নির্মাণের অভিযোগ প্রসঙ্গে জানতে চাইলে কামরুল ইসলাম ও খাদেমুল ইসলাম জানান, তাদের মধ্যে রেলের কিছু জমি ছিল। তবে তা ছেড়ে দেওয়া হয়েছে। জমি দখলের অভিযোগ ঠিক নয় বলে তারা দাবি করেন।
তবে পশ্চিমাঞ্চল রেলের ভূসম্পত্তি বিভাগের কানুনগো মনোয়ারুল ইসলাম জমি বেদখল হওয়ার কথা স্বীকার করে জানান, দুই ব্যক্তি রেলের কিছু জমি দখলে রেখেছেন। জমি উদ্ধারের বিষয়টি প্রক্রিয়াধীন আছে।
এদিকে রেলের একটি সূত্রের দেওয়া তথ্য মতে, পশ্চিমাঞ্চল রেলের অন্তর্ভুক্ত আটটি জেলার মধ্যে সৈয়দপুর, রাজশাহী, সিরাজগঞ্জ, রাজবাড়ী, লালমনিরহাট, চুয়াডাঙ্গা, ঈশ্বরদী ও পাকশীতে সবচেয়ে বেশি জমি বেদখল হয়ে আছে। এ ছাড়া সান্তাহার, বগুড়া, খুলনা, কুষ্টিয়া, যশোর, দিনাজপুরসহ বিভিন্ন এলাকায় বিপুল রেলভূমি দখল হয়ে রয়েছে।
রেলের ওই সূত্র আরও জানায়, পশ্চিমাঞ্চল রেলের মোট জমির পরিমাণ প্রায় ৪০ হাজার ৪১৯ একর, যার বর্তমান বাজারমূল্য আনুমানিক আড়াই লাখ কোটি টাকা। এর মধ্যে ১২ হাজার ৯ একর জমি স্বল্প ও দীর্ঘমেয়াদি ইজারায় রয়েছে, যেখান থেকে ২০২৩-২৪ অর্থবছরে ২৭ কোটি টাকার বেশি রাজস্ব আয় হয়েছে।
পশ্চিমাঞ্চল রেলের প্রধান ভূসম্পত্তি কর্মকর্তা নাদিম সরোয়ার বলেন, ‘আমরা যে জায়গাগুলো অপারেশনাল কাজের জন্য বেশি প্রয়োজন, সেগুলো অগ্রাধিকার দিয়ে উচ্ছেদ করছি। কেউ যদি রেলের জমি বিক্রি করে, সেটি অবৈধ। আমাদের ক্যাপাসিটির সীমাবদ্ধতা থাকলেও কেউই ছাড় পাবে না।’