শফিক সরকার, ময়মনসিংহ
প্রকাশ : ২৫ জুন ২০২৫ ১১:৩৮ এএম
ময়মনসিংহের মুক্তাগাছায় কারখানায় চলছে সুস্বাদু মিষ্টান্ন মণ্ডা তৈরির কাজ
মিষ্টির নাম বলতেই দুশ বছরের ইতিহাস-ঐতিহ্যের সেই মুক্তাগাছার গোপাল পালের মণ্ডার নাম চলে আসে। মণ্ডার খ্যাতি ছড়িয়ে আছে আজ সারা দেশে। এমনকি দেশের বাইরেও রয়েছে এর খ্যাতি। দুধের ছানা আর চিনি দিয়ে তৈরি এই মণ্ডা খেতে প্রতিদিন অসংখ্য মানুষ ছুটে আসেন মুক্তাগাছায়। গত বছর এই মণ্ডা জিআই পণ্য হিসেবে স্বীকৃতি পেয়েছে।
ময়মনসিংহ নগরী থেকে ১৬ কিলোমিটার দূরে জমিদারদের রেখে যাওয়া স্মৃতিবিজড়িত শহর মুক্তাগাছা। দেড়শ বছরের প্রাচীনতম হিন্দু অধ্যুষিত পৌর শহরের চৌরঙ্গি মোড় এলাকায় এই মণ্ডার দোকান। প্রতিকেজি মণ্ডার দাম ৭০০ টাকা। আর কেজিতে রয়েছে ২০টি মণ্ডা। দেশের কোথাও কোনো শাখা না থাকায় প্রসিদ্ধ এই মণ্ডা খেতে দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে ছুটে আসেন একমাত্র এই দোকানে। দুশ বছর আগে ১২৩১ বাংলা, ১৮২৪ ইংরেজি সালে গোপাল পাল সর্বপ্রথম মণ্ডা তৈরি করেন। গোপাল পালের তৈরিকৃত মণ্ডা তৎকালীন মুক্তাগাছার জমিদার সূর্যকান্ত আচার্য চৌধুরী প্রথম স্বাদ গ্রহণ করেন এবং এর প্রশংসা করেন। এর পর জমিদাররা মণ্ডা দিয়ে তাদের মেহমানদের আপ্যায়িত করতেন।
ইতিহাস-ঐতিহ্যের এই মণ্ডার জনকের পুরো নাম হচ্ছে রাম গোপাল পাল। তার জন্ম বাংলা ১২০৬ ও ইংরেজি ১৭৯৯ সালে। গোপাল পালের আদি নিবাস ছিল মুর্শিদাবাদ। পরবর্তীতে তিনি মুক্তাগাছায় আশ্রয় নেন। মণ্ডা সৃষ্টির পেছনে কিছু ইতিহাস রয়েছে। মণ্ডার সর্বশেষ বংশ অর্থাৎ ষষ্ঠ বংশের সূত্রে জানা যায়, গোপাল পাল স্বপ্নে প্রায়ই এক সাধুর দেখা পেতেন। স্বপ্নে সাধু তাকে মণ্ডা তৈরির নিয়মাবলি শেখাতেন।
সর্বশেষ এক রাতে মণ্ডা পাকের শেষ নিয়মটি শেখিয়ে গোপালকে সাধু বলেছিলেন ‘তুই এই মণ্ডার জন্য অনেক খ্যাতি অর্জন করবি। ওই সময় থেকে এখনও এর খ্যাতি ছড়িয়ে রয়েছে দেশ ও দেশের বাইরে। গোপাল পালের এই প্রসিদ্ধ মণ্ডা খেতে দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে প্রতিদিন অসংখ্য মানুষ ছুটে আসেন মুক্তাগাছায়। বিশেষ করে বন্ধের দিনগুলোতে মণ্ডার দোকানে প্রচুর ভিড় জমে।’
একসময় ভারত থেকে ময়মনসিংহের মুক্তাগাছার জমিদার বাড়িতে এসেছিলেন উপমহাদেশের প্রখ্যাত সেতারবাদক ও সুরসম্রাট ওস্তাদ আলাউদ্দিন খাঁ, পশ্চিম বঙ্গের মুখ্য মন্ত্রী ডা. বিধান চন্দ্র রায়, নেতাজী সুভাষ চন্দ্র বসু। তাদেরকে গোপাল পালের মণ্ডা দিয়ে আপ্যায়ন করা হতো। এমনকি বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান ও মওলানা ভাসানীও মণ্ডা খেতে ছুটে এসেছিলেন মুক্তাগাছার এই দোকানে।
জমিদারি প্রথা বাতিল হলেও এখনও রয়ে গেছে তাদের স্মৃতিবিজড়িত ঘরবাড়ি। দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে ছুটে আসা মানুষ জমিদারবাড়ি দেখে নিজ গন্তব্যে ফেরার সময় মুক্তাগাছার মণ্ডা খেয়ে মুগ্ধ হন। খাওয়ার পর সঙ্গে করে নিয়েও যান। চিনির মণ্ডার পাশাপাশি এখানে গুড়ের মণ্ডাও বিক্রি হয়। তবে গুড়ের মণ্ডা বিক্রি হয় ৮০০ টাকায়। প্রতিকেজিতে ২০ পিস মণ্ডা থাকে।
মণ্ডার দোকানে কথা হয় গাজীপুর থেকে মণ্ডা খেতে আসা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী জোনায়েদ আহমদের সঙ্গে। তিনি বলেন, ‘অনেক দিন ধরে শুনে আসছেন বিখ্যাত মুক্তাগাছার মণ্ডার কথা। এর স্বাদ নিতেই তিনি পরিবার নিয়ে মুক্তাগাছায় ছুটে এসেছেন। সবকিছু ঠিক আছে, তবে দাম কিছুটা কম হলে ভালো হতো।
সম্প্রতি মণ্ডার দোকানে কথা হয় বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক ড, নাছির উদ্দিনের সঙ্গে। তিনি বলেন, প্রায়ই মণ্ডা খেতে তিনি এই দোকানে আসেন। সময় পেলেই বন্ধুদের নিয়ে মুক্তাগাছার জমিদারবাড়ি দেখে, যাওয়ার সময় মণ্ডা খেতে আসেন। ইতিহাস-ঐতিহ্যের সাক্ষী এই মণ্ডা আগের মতোই স্বাদ রয়েছেন বলে তিনি জানান।
স্থানীয় বাসিন্দা ও মুক্তাগাছা উপজেলা পূজা উদযাপন কমিটির নেতা দেবাশীষ ঘোষ বাপ্পী বলেন, মুক্তাগাছার মণ্ডা মানে আমাদের এলাকার অহংকার। এই মণ্ডা খেতে দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে প্রতিদিন শত শত মানুষ ছুটে আসেন মুক্তাগাছায়। এটা আমাদের মুক্তাগাছাবাসীর জন্য অনেক গর্বের বিষয়। আমরা আশা করি হাজার হাজার বছর এই মণ্ডা আমাদের মাঝে টিকে থাকবে নিজের অস্তিত্ব ধরে।
দুশ বছরের ঐতিহ্যের এই মণ্ডা এখনও তার সুনাম ধরে রাখার কথা জানালেন মণ্ডার জনকের সর্বশেষ বংশধর অর্থাৎ বর্তমান মালিক রাজেষ পাল। তিনি বলেন, প্রায় দুশ বছরের এই মণ্ডা এখনও তার সুনাম ধরে রাখার চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছেন। দেশের কোথাও তাদের কোনো শাখা নেই। একমাত্র এখানেই আসল মণ্ডা পাওয়া যায়।
মণ্ডার মূল্যবৃদ্ধির বিষয়ে তিনি আরও জানান, চিনি ও দুধের দাম বেড়ে যাওয়ায় মণ্ডার দাম বাড়াতে তারা বাধ্য হয়েছেন। ব্যবসা করার কোনো উদ্দেশ্য তাদের নেই, ঐতিহ্য ধরে রাখার জন্য তারা এখনও এই পেশায় রয়েছেন।