রাসেল মাহমুদ, বরগুনা
প্রকাশ : ২৫ জুন ২০২৫ ১০:১৪ এএম
বরগুনায় সুপেয় পানির সংকটে বৃষ্টির পানি ট্যাংকে ভরে রাখেন স্থানীয়রা। এজন্য এলাকার বাসিন্দাদের বাড়িতে বাড়িতে রয়েছে খোলা ট্যাংক
উপকূলীয় জেলা বরগুনায় সুপেয় পানির সংকট চলছে। সেই সঙ্গে ডেঙ্গু ছোবল হেনেছে। এই পর্যন্ত জেলায় ডেঙ্গু আক্রান্তের সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ২ হাজার ৪০২ জন। এতে মারা গেছে প্রায় ১৮ জন। সুপেয় পানির জন্য যেসব সরকারি প্রকল্প রয়েছে, তাতে দুর্নীতি বাসা বাঁধায় এলাকার মানুষ পানি সংকটে ভুগছেন।
নলকূপের পানি লালচে। মাটির ১৩০০ ফুট পর্যন্ত নিচে গিয়েও নেই মিলছে না পানি। ফলে চাতক পাখির মতো উপকূলবাসীর শেষ আশ্রয় আকাশ থেকে ঝরে পড়া বৃষ্টির পানি।
বৃষ্টি হলে স্থানীয়রা বৃষ্টির পানি ট্যাংকে ভরে রাখে। খাবার, রান্না, গৃহস্থালি সবকিছুই চলে এই পানিতে।
রোগতত্ত্ব, রোগ নিয়ন্ত্রণ ও গবেষণা ইনস্টিটিউট (আইইডিসিআর) বলেছে, এটাই এখানকার এডিস মশা চাষের প্রধান কারণ।
জেলায় ডেঙ্গুর হঠাৎ বিস্ফোরণের বিশেষ কারণ এলাকার বাসিন্দাদের বাড়িতে বাড়িতে খোলা ট্যাংক। এই খোলা ট্যাংক রাখা হয়েছে বৃষ্টি পানি ধরার জন্য।
এদিকে জনস্বাস্থ্য প্রকৌশল দপ্তরের তথ্যমতে, ২৭ হাজারের বেশি পানির উৎস থাকলেও কার্যকর মাত্র ২০ হাজার। বাকিগুলো অকেজো। আইইডিসিআরের ৩ দিনের গবেষণায় জানা গেছে, জেলায় প্রতিটি বাড়িতে চাষ করা হয় এডিস মশা। তারা সারা বছর রান্নার জন্য যে বৃষ্টির পানির ট্যাংক পেতে রাখে তা থেকে এডিস মশার প্রজনন বাড়ছে।……………
এলাকায় সুপেয় পানির ব্যবস্থা থাকলে কমে যেত বৃষ্টির পানি ধরার প্রবণতা। ফলে এডিস মশার প্রজনন আটকে যেত। তাই জেলায় সুপেয়ে পানির নিশ্চিত করা গেলে ডেঙ্গুরের বাড়বাড়ন্ত হবে না।
জেলা পৌরসভায় পানি শোধনাগার নির্মাণের পর নাগরিকরা সুপেয় পানি পেতে শুরু করে। কিন্তু পরে এটি বন্ধ হয়ে যায়।
ডিকেপি সড়কে রয়েছে পৌরসভার ২টি রিজার্ভ পুকুর। যে পুকুরের পানি শোধনাগার থেকে চলে যেতে বাসিন্দাদের কাছে আজ তা মাছ চাষের উৎস হিসেবে ব্যবহার হচ্ছে। ২০২১ সালে পৌর মেয়র রির্জাভ পুকুর ২টি লিজ দেন
ডিকেপি এলাকার বাসিন্দা নয়ন বলেন, আমাদের এই এলাকার প্রধান সমস্যাই হচ্ছে পানির সমস্যা। আজ পানি অভাবে ধরে রাখা বৃষ্টির পানি থেকে জন্ম নিচ্ছে এডিস মশা। অথচ আমার বাসার সামনে অযত্নে পড়ে আছে পানি শোধনাগারটি। ঠিক মতো সুপেয় পানি পেলে বৃষ্টির পানি ধরে রাখার প্রয়োজন হবে না। তীব্র গরমে পানির চাহিদা বেশি থাকলেও পৌরসভার পানি পাওয়া যায় না। তাই বাধ্য হয়ে টাকা দিয়ে কিনে পানি আনতে হয়।
এরপর বরগুনা শহরের পানি সংকট নিরসনে ২০১২ সালে প্রায় ছয় কোটি টাকা ব্যয়ে নির্মিত হয় জেলা পৌরসভার দুটি উচ্চ জলাধার। নির্মাণের তিন বছর পরও চালু হয়নি সেগুলো।
স্থানীয়দের দাবি, ২০১০ সালে বন্ধ করে দেওয়া পরিত্যক্ত এক পানি শোধনাগারকে সরবরাহের উৎস ধরে এই জলাধার নির্মাণ করে অর্থ অপচয় ঘটানো হয়েছে। তবে উচ্চ জলাধার দুটি চালুর আশ্বাস দিয়েছে পৌর কর্তৃপক্ষ।
এদিকে উপকূলীয় এলাকায় বৃষ্টির পানি সংরক্ষণের জন্য সরকার কোটি কোটি টাকা বরাদ্দ দিয়েছে। জনস্বাস্থ্য প্রকৌশল অধিদপ্তর থেকে গভীর ও অগভীর নলকূপ এবং রেইন ওয়াটার হার্ভেস্টিং ইউনিট স্থাপন করা হয়েছে। কিন্তু বাস্তবে সেই সুবিধা পেয়েছে খুব কম মানুষ। কারণ, এসব প্রকল্পের প্রতিটি স্তরে রয়েছে অনিয়ম আর দুর্নীতি।
এদিকে, এই পানির সংকট মেটাতে গত দুই অর্থবছরে বরগুনায় প্রায় ৩৪ কোটি টাকার প্রকল্প নেওয়া হয়েছিল। প্লাটফর্মসহ ট্যাংক বিতরণ করা ছিল লক্ষ্য। কিন্তু অভিযোগ উঠেছে, এই প্রকল্পেও বড়সড় দুর্নীতি বাসা বেঁধেছে।
জেলা পৌরসভার নির্বাহী প্রকৌশলী মোহাম্মদ মাসুম বিল্লাহ বলেন, ‘পানি শোধনাগারটি অনেকদিন ধরে বন্ধ। পানি এটি চালু করার মতো অর্থ পৌরসভার নেই।’ বরগুনা পৌর প্রশাসক অনিমেষ বিশ্বাস বলেন, পানির শোধনাগারটি বন্ধ। এটি চালু করতে নতুন বরাদ্দের দরকার।’