রিপন আখন্দ, গাইবান্ধা
প্রকাশ : ২১ জুন ২০২৫ ১৮:৫০ পিএম
ব্রহ্মপুত্রের পাড়ে ভোরের আলো ফুটতেই একের পর এক নৌকা এসে ভিড়ছে গাইবান্ধার ফুলছড়ির মরিচ হাটে। সাদা বস্তা ভর্তি টকটকে লাল শুকনা মরিচ। দেখলে মনে হয় আগুনঝরা কোনো উৎসব চলছে।
গাইবান্ধার চরাঞ্চলের কৃষকদের রক্ত মিশ্রিত এই মরিচ শুধু একটি ফসল নয়, বরং তা হয়ে উঠেছে তাদের স্বপ্ন, জীবিকা আর আত্মমর্যাদার প্রতীক। সপ্তাহের নির্দিষ্ট দিনগুলোতে জমে ওঠা ফুলছড়ির মরিচ হাট কেবল বেচাকেনার স্থান নয়, এটি উত্তরাঞ্চলের হাজারো মানুষের জীবনসংগ্রামের এক দৃশ্যমান মঞ্চ। তবে এই রঙিন দৃশ্যের আড়ালে আছে কৃষকের কষ্ট, দামের হতাশা, আর অব্যবস্থাপনার দীর্ঘশ্বাস।
গাইবান্ধার ফুলছড়ি, সুন্দরগঞ্জ, সাঘাটা ও সদর উপজেলার শতাধিক চরজুড়ে প্রতি বছর চাষ হয় এই মরিচ। স্থানীয় কৃষকরা জানান, চরের উর্বর মাটি ও নদীর পানি মরিচ চাষে বাড়তি সুবিধা দেয়। সেই মরিচই আসে ফুলছড়ির পুরাতন হেডকোয়ার্টার এলাকার হাটে; যা এখন দেশের অন্যতম বৃহৎ শুকনা মরিচের পাইকারি বাজারে পরিণত হয়েছে।
সপ্তাহে দুই দিন শনিবার ও মঙ্গলবার সকালে শুরু হয় হাটের ব্যস্ততা। নদী ও সড়কপথে কৃষক ও ব্যবসায়ীরা মরিচ নিয়ে হাজির হন। কেউ মাথায় বস্তা বহন করেন, কেউ আসেন ঘোড়ার গাড়িবোঝাই করে। নারী-পুরুষ-শিশুরা একসঙ্গে মরিচ নামানোর কাজে হাত লাগান। এটি যেন শুধুই বাণিজ্যের স্থান নয়, চরবাসীর জীবনের অংশ।
একটি ঘোড়ার গাড়ির পেছনে হাঁটছিলেন খোলাবাড়ি গ্রামের কৃষক সাদেকুল। মুখে ক্লান্তি, কিন্তু তাতে গর্বও মেশানো। বললেন, চার বিঘা জমিতে মরিচ চাষ করেছিলাম। ফলন ভালো, কিন্তু দাম ঠিকমতো পাচ্ছি না। গত বছর বিক্রি করেছিলাম ১২ হাজার টাকায়, এবার পাইকাররা বলছে ৫ হাজার। দামটা আরেকটু ভালো হলে চরের লোকজন হাঁফ ছেড়ে বাঁচত।
এই হাটে মরিচ মান অনুযায়ী তিন ভাগে ভাগ করা হয়Ñ উত্তম, মধ্যম ও নিম্ন। স্থানীয় ব্যবসায়ীরা জানান, ফুলছড়ির মরিচের কদর এতটাই বেশি যে দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে প্যাকেটজাত খাবার প্রস্তুতকারক প্রতিষ্ঠানও এখানে এসে মরিচ কিনে নেয়।
নওগাঁ থেকে আসা ব্যবসায়ী শাহা পরাণ সুলতান বলেন, আমি গত ১০ বছর ধরে এখানে মরিচ কিনি। দেশের কোথাও এত ভালো মানের শুকনা মরিচ পাই না। তবে মানের মরিচ পেলেও, হাটের অব্যবস্থা নিয়ে ক্ষোভ ঝাড়লেন তিনি। লাখ লাখ টাকার লেনদেন হয় এখানে, কিন্তু রাতে থাকার মতো কোনো জায়গা নেই।
পাইকাররাও বলছেন একই কথা। বগুড়া থেকে আসা ব্যবসায়ী রফিকুল ইসলাম বলেন, রাতে থাকি কোথায়? হাটে ঘুমানোর জায়গা নেই। অথচ লাখ লাখ টাকার লেনদেন করি আমরা।
শুধু রফিকুল অথবা আজগর নন, হাটজুড়ে কৃষকের মুখে একই সুরÑ ফলন ভালো, দাম খারাপ। বছরের পর বছর ধরে কোটি টাকার লেনদেন হলেও হাটের নেই স্থায়ী কোনো ঠিকানা। বসে ভাড়া করা জায়গায়। নেই বিশ্রামাগার, নাই নিরাপত্তা ব্যবস্থা।
হাটের ইজারাদার অহিদুল ইসলাম জানান, এখানে সরকারি খাস জমি রয়েছে। চাইলে ভরাট করে হাটসেড, গোডাউন, শৌচাগার বানানো সম্ভব। এতে সরকার রাজস্ব পাবে, ব্যবসায়ীরা পাবে সেবা।
কৃষকের এই মরিচ শুধু রান্নার স্বাদ নয়, এটি গড়ে তোলে জীবিকার ভিত্তি। সরকারি সহায়তা পেলে ফুলছড়ির মরিচ হাট হতে পারে জাতীয় অর্থনীতির একটি উজ্জ্বল সম্ভাবনা। অথচ সরকারি পৃষ্ঠপোষকতা পেলে এই হাটই হতে পারে জাতীয় মর্যাদার একটি কৃষিভিত্তিক ব্র্যান্ডিংয়ের সফল উদাহরণ।
এ বিষয়ে ফুলছড়ি উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) জগৎবন্ধু মণ্ডল বলেন, ফুলছড়ির মরিচের হাট গাইবান্ধার ঐতিহ্যবাহী একটি হাট, ফুলছড়ির মরিচ গাইবান্ধার একটি ব্র্যান্ড পণ্য। কৃষকের ঘামের এই ফসলের সঠিক মূল্য নিশ্চিতে আমরা বদ্ধপরিকর। খুব দ্রুতই একটি উপযুক্ত স্থান নির্ধারণ করে হাটের পরিবেশ উন্নত করতে পদক্ষেপ নেওয়া হবে।