ইসমাইল মাহমুদ, মৌলভীবাজার
প্রকাশ : ১৬ জুন ২০২৫ ১০:১৮ এএম
বাবা-মায়ের সাথে শারীরিক প্রতিবন্ধী শিশু গোপাল সাঁওতাল
বাংলাদেশের চা বাগানাঞ্চলে অসংখ্য চা শ্রমিক পরিবার প্রতিদিন সংগ্রামের মধ্য দিয়ে জীবন কাটায়। মৌলভীবাজার জেলার কুলাউড়া উপজেলার সীমান্তবর্তী মুরইছড়া চা বাগানের এক ছোট্ট শিশু গোপাল সাঁওতাল সেই বাস্তবতারই এক করুণ প্রতিচ্ছবি। তিন বছরের ছোট্ট গোপাল সাঁওতাল, চোখে তার হাজারো প্রশ্ন। কিন্তু শরীর বলি দেয় নিষ্ঠুর বাস্তবতার কাছে। হাঁটতে পারে না, বসতেও না— শুধু দাঁড়িয়ে থাকতে পারে, তাও মাটির গভীরে খোঁড়া এক গর্তে। মা সনচড়ি সাঁওতাল ছেলেকে একা ফেলে কাজে যেতে পারেন না, তাই বুক ভরা মমতায় নিজের ঘরের মাটিতে তৈরি করেন সেই গর্ত; যেখানে গোপালকে দাঁড় করিয়ে রেখে সামলান সংসারের সব কাজ। এই দৃশ্য শুধু এক অসহায় শিশুর নয়, এক মায়ের সীমাহীন ভালোবাসা, ত্যাগ আর বেঁচে থাকার, যুদ্ধের গল্প। এই অদ্ভুত অথচ হৃদয়বিদারক দৃশ্য সামাজিক মাধ্যমে ভাইরাল হলে নড়েচড়ে বসে প্রশাসন। শুরু হয় সরকারি সহায়তার উদ্যোগ, আর উঁকি দেয় এক নতুন আশার আলো; যেখানে দারিদ্র্য ও প্রতিবন্ধকতা পেরিয়ে হাঁটতে শেখে একটি শিশু।
গত শনিবার গোপালের এই মানবিক এবং বেদনাদায়ক চিত্র সামাজিক মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ে এবং মুহূর্তেই ভাইরাল হয়ে যায়। বিষয়টি মৌলভীবাজার জেলা প্রশাসক মো. ইসরাইল হোসেনের নজরে এলে, তার নির্দেশে কুলাউড়া উপজেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে তাৎক্ষণিক ব্যবস্থা নেওয়া হয়।
গতকাল রবিবার সকালে উপজেলা সমাজসেবা অফিসার প্রাণেশ চন্দ্র বর্মা গোপাল ও তার পরিবারের সঙ্গে সাক্ষাৎ করেন। তিনি জানান, গোপালের জন্য প্রতিবন্ধী ভাতার ব্যবস্থা করা হচ্ছে এবং চলতি মাস থেকেই সে ভাতা পাবে। এ ছাড়া মৌলভীবাজার প্রতিবন্ধী সেবা ও সাহায্য কেন্দ্র থেকে তার প্রয়োজনীয় চিকিৎসা উপকরণ ও পরামর্শও প্রদান করা হবে। রোগী কল্যাণ সমিতির পক্ষ থেকেও চিকিৎসা সহায়তার আশ্বাস দেওয়া হয়।
শিশুটির বাবা অনিল সাঁওতাল জানান, ‘আমরা দিনমজুর মানুষ। আমাদের একমাত্র ছেলেটি জন্ম থেকেই শারীরিক প্রতিবন্ধী। স্থানীয়ভাবে অনেক চিকিৎসা করিয়েও সুফল পাইনি। পরে ছেলেকে সিলেটের খাদিমনগরের একটি প্রতিবন্ধী পুনর্বাসন কেন্দ্রে নিয়ে গিয়েছিলাম। সেখানকার চিকিৎসকরা নিয়মিত ফিজিওথেরাপির পরামর্শ দিলেও অর্থাভাবে তা চালিয়ে যেতে পারিনি। তাই তার মা বুদ্ধি করে এই গর্তটা করেছে। গর্তটিতে ঢুকালে আমাদের সন্তান দাঁড়িয়ে থাকতে পারে। এখন সরকারি চিকিৎসা ও ভাতা প্রদান করার কথা সমাজসেবা কর্মকর্তা আমাদের বলেছেন। আমরা খুশি, আমাদের ছেলে হয়তো আবার হাঁটবে, দৌড়াবে— এই স্বপ্ন দেখছি।’
কুলাউড়া উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মো. মহিউদ্দিন বলেন, জেলা প্রশাসক, মৌলভীবাজার স্যারের নির্দেশনায় শিশুটির ভাতা ও চিকিৎসার জন্য প্রয়োজনীয় সরকারি ব্যবস্থা নিশ্চিত করা হবে। গোপাল যেন একটি সম্মানজনক এবং সুন্দর জীবন পায়, সেই লক্ষ্যে আমরা কাজ করে যাচ্ছি।