গোফরান পলাশ, কলাপাড়া (পটুয়াখালী)
প্রকাশ : ১৬ জুন ২০২৫ ১০:০৭ এএম
পটুয়াখালীর কলাপাড়া উপকূলীয় এলাকার সিডরে ক্ষতিগ্রস্ত বেড়িবাঁধ এখনও টেকসইভাবে নির্মাণ করা হয়নি। স্থানীয়দের স্বেচ্ছাশ্রমে বাঁধ নির্মাণ করা হলেও তা বেশিদিন টিকছে না।
পটুয়াখালীর কলাপাড়া উপকূলীয় এলাকার সিডরে ক্ষতিগ্রস্ত বেড়িবাঁধ এখনও টেকসইভাবে নির্মাণ না হওয়ায় ঘূর্ণিঝড়, জলোচ্ছ্বাস, বন্যা শুধু নয়, বর্ষার সময় নদীতে জোয়ারের পানি বাড়লেও বাঁধে ভাঙন দেখা দেয়। প্লাবিত হয় বিস্তীর্ণ এলাকা। নষ্ট হয় ঘরবাড়ি, ফসল। ভিটেবাড়ি হারিয়ে নিঃস্ব হয় প্রচুর মানুষ। প্লাবণে ভেসে যায় বসতবাড়ি, জীবন-জীবিকা বিপণ্ন হয়ে পড়ে।
জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবসহ বিভিন্ন প্রাকৃতিক দুর্যোগের কারণে এখন কলাপাড়া উপকূলীয় এলাকা বসবাসের জন্য দিন দিন কঠিন হয়ে উঠছে। টেকসই বাঁধের অভাব এ পরিস্থিতিকে আরও নাজুক করে তুলেছে। জীবন-জীবিকা বাঁচিয়ে রাখতে উপকূলীয় বিভিন্ন অঞ্চলে বাঁধের জন্য মানুষের আকুতির শেষ নেই। স্বেচ্ছাশ্রমে বাঁধ নির্মাণ করা হলেও তা বেশি দিন টিকছে না।
কলাপাড়া উপকূলীয় অঞ্চলের অধিকাংশ বেড়িবাঁধই ভয়ানক নাজুক। প্রলয়নকারী ঘূর্ণিঝড় সিডরে ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার পর এসব বেড়িবাঁধ নির্মাণে কোটি কোটি টাকা খরচ হলেও দুর্নীতি-অনিয়মে টেকসইভাবে নির্মাণ করা যায়নি। এখনও বেড়িবাঁধের কোথাও কোথাও মাত্র দুই থেকে তিন ফুট চওড়া মাটির বাঁধ আছে। এমন দুর্বল বেড়িবাঁধ ভেঙে যেতে পারেÑ এই আতঙ্কে নির্ঘুম রাত কাটাচ্ছে উপকূলবাসী। বর্ষার আগেই বাঁধ নির্মাণের দাবি করেছে ভুক্তভোগী মানুষ। এতে যদি নিজেদের শ্রম দিতে হয় তাতেও তারা রাজি।
পানি উন্নয়ন বোর্ড (পাউবো) কলাপাড়ার তথ্য অনুযায়ী, উপজেলার ৫৪/এ পোল্ডারের ১৩ কিলোমিটার থেকে ১৪.১২০ কিলোমিটার পর্যন্ত মোট ১,১২০ মিটার বেড়িবাঁধ রক্ষায় জরুরি ভিত্তিতে জিও ব্যাগ ও জিও টিউব বসানো হয়। এ প্রকল্পে ব্যয় হয় প্রায় দেড় কোটি টাকা।
খোঁজখবর নিয়ে জানা গেছে, চম্পাপুর ইউনিয়নে করমজাতলা গ্রামে রাবনাবাদ নদী পাড়ে বেড়িবাঁধ রক্ষায় দেওয়া হয়েছে জরুরি জিওব্যাগ ও টিউব। তাও আবার চার মাসের মাথায় বিভিন্ন পয়েন্টে দেখা দিয়েছে ধস। ঢেউয়ের আঘাতে ব্যাগ ছিঁড়ে বের হয়ে গেছে বালু। আর বাঁধের স্লোপ ধসে পড়েছে। এমন অবস্থা হয়েছে করমজাতলা গ্রামে রাবনাবাদ নদী পাড়ের ৫৪/এ পোল্ডারের।
এদিকে নদীতীরবর্তী এলাকার মানুষের মধ্যে আতঙ্ক বেড়ে গেছে। এখন আকাশে মেঘ দেখলেই আঁতকে ওঠেন তারা। কারণ এসব মানুষ স্বচক্ষে দেখেছে বিভিন্ন সময়ে বয়ে যাওয়া প্রলয়ংকারী ঘূর্ণিঝড়ের ভয়াবহতা। তাদের আশঙ্কা, যেকোনো সময় মূল বাঁধটি ধসে গিয়ে প্লাবণ হতে পারে।
স্থানীয়দের অভিযোগ, প্রটেকশনের কাজে ব্যবহার করা হয়েছে নিম্নমানের জিওব্যাগ ও পুরনো ছেঁড়া জিও টিউব। এতে নদীর ঢেউয়ের আঘাতে ব্যাগ ছিঁড়ে বালু বের হয়ে গেছে আর বাঁধের স্লোপ দ্রুত ধসে পড়েছে। তাদের আশঙ্কা, এভাবে চললে পুরো বাঁধ বর্ষা আসার আগেই বিলীন হয়ে যেতে পারে।
এদিকে আন্দারমানিক নদীর নিজামপুর এলাকায় বেড়িবাঁধ রক্ষায় দেওয়া জরুরি জিওব্যাগ ও টিউবে চার মাসের মাথায় ধস দেখা দিয়েছে। এতে বর্ষা শুরুর আগেই আতঙ্কে দিন কাটছে নদীতীরবর্তী মানুষের। তারা বলছেন, এই অবস্থায় যেকোনো সময় মূল বাঁধও ধসে যেতে পারে।
স্থানীয়রা জানান, প্রতি বছর বর্ষা এলেই রামনাবাদ নদীর ভাঙনে আতঙ্কে থাকেন তারা। এ ছাড়া পূর্ণিমা, অমাবস্যা কিংবা অতিবৃষ্টি হলেই নদী পাড়ের এসব মানুষের দুর্ভোগ বেড়ে যায়। অথচ দীর্ঘদিনেও এখানে স্থায়ী বাঁধ নির্মাণ হয়নি। তাদের দাবি, সরকারি উদ্যোগে দ্রুত টেকসই বাঁধ নির্মাণের। তা না হলে যেকোনো সময় বাঁধের আশপাশের গ্রামগুলো নদীগর্ভে চলে যেতে পারে। একই সঙ্গে তারা অভিযোগ করেন, রামনাবাদ নদীতে বছরের পর বছর ড্রেজিংয়ে এখানে ভাঙন আরও বেড়েছে।
পাউবোর কলাপাড়ার উপসহকারী প্রকৌশলী বিদ্যা রতন সরকার বলেন, ‘ওই স্পটটি ঝুঁকিপূর্ণ। উত্তাল ঢেউয়ের মধ্যে প্রটেকশন দেওয়া হয়েছিল। মাটি সংকট ছিল, অনেক দূর থেকে সংগ্রহ করতে হয়েছে। তবু আমরা কাজটি সুন্দরভাবে করেছি।’ তবে তিনি স্বীকার করেন, স্পটটি ঝুঁকিপূর্ণ হওয়ায় সেখানে স্থায়ী প্রটেকশনের জন্য ব্লক বসানো দরকার।
পাউবোর নির্বাহী প্রকৌশলী শাহ আলম ভূঁইয়া বলেন, ‘ওই জায়গাটা জটিল। ভেতরে জায়গা নেই, মাটিরও সংকট। স্থায়ী বাঁধ নির্মাণ ছাড়া এখানে ভাঙন রোধ করা সম্ভব নয়।’