ইসমাইল মাহমুদ, মৌলভীবাজার
প্রকাশ : ১৫ জুন ২০২৫ ১০:১২ এএম
আপডেট : ১৫ জুন ২০২৫ ১০:৪৫ এএম
মৌলভীবাজারের জুড়ী উপজেলায় ব্রিটিশ আমলে নির্মিত আয়রন ব্রিজ বাংলাদেশ ও ভারতকে বিভক্ত করেছে।
মৌলভীবাজারের জুড়ী উপজেলায় লাঠিটিলা বনাঞ্চলের পাশ দিয়ে প্রবাহিত হয়েছে ‘কাটা নালা’ নামক ছোট্ট একটি নদী। এই নদীর পশ্চিম পাড়ে বাংলাদেশ আর পূর্ব পাড়ে ভারতের আসাম রাজ্যের করিমগঞ্জ। ব্রিটিশ শাসনামলে এই নদীর ওপর নির্মিত একটি ব্রিজ দুই দেশের মাঝে সংযোগ স্থাপন করেছিল। একসময় নাম ছিল ‘কাটা নালা ব্রিজ’। তবে বর্তমানে এটি ‘ব্রিটিশ আয়রন ব্রিজ’ নামে পরিচিতি পেয়েছে। একপাশে নিচু, অন্যপাশে উঁচু এই ব্রিজটিই বাংলাদেশ ও ভারতকে বিভক্ত করেছে।
জঙ্গলে আবৃত ব্রিজটি দিয়ে একসময় দুই দেশের মানুষ অবাধে যাতায়াত করত। ব্রিজটিকে কেন্দ্র করে দুই দেশের মানুষের মধ্যে সৃষ্টি হয়েছিল বিবাহ সূত্রে আত্মীয়তার সম্পর্কও। কিন্তু বর্তমান প্রেক্ষাপটে দুই দেশের মধ্যে অবাধ যাতায়াত বন্ধ রয়েছে। ফলে ব্রিটিশ আমলের ঐতিহ্যের স্মারক আয়রন ব্রিজটি এখন পরিত্যক্ত। তবে সৌন্দর্যময় ওই ব্রিজটি দেখতে এখনও প্রতিদিন দুই দেশের বহু দর্শনার্থী আসেন এখানে। ব্রিজের পাশে দাঁড়িয়ে এখনও মানুষ স্ব-স্ব দেশ থেকে মুগ্ধ নয়নে উপভোগ করে দুই দেশের প্রাকৃতিক সৌন্দর্য।
সম্প্রতি সরেজমিন ব্রিজ এলাকায় গিয়ে স্থানীদের সাথে কথা বলে জানা যায়, ব্রিজটি ব্রিটিশ শাসনামলে তৈরি। পুরো লোহার ওই ব্রিজের আদতে কোনো নাম নেই। প্রবীণরা জানিয়েছেন, একসময় এর নাম ছিল কাটা নালা ব্রিজ। তবে স্থানীয়রা এটির নাম দিয়েছেন ‘ব্রিটিশ আয়রন ব্রিজ’। লাঠিটিলা এলাকার অনেক নারী-পুরুষের শ্বশুরবাড়ি রয়েছে ওপারে অর্থাৎ ভারতে। বর্তমানে দুই দেশের যাতায়াত পুরোপুরি বন্ধ। ব্রিজটির পাশেই রয়েছে কাঁটাতারের বেড়া। তৎকালীন ব্রিটিশ সরকার মৌলভীবাজারের সাথে ভারতের আসাম রাজ্যের করিমগঞ্জ জেলার সংযোগ স্থাপনে ডুমাবাড়ি এলাকায় ব্রিজটি নির্মাণ করেছিল। দেশ স্বাধীনের সময় পর্যন্ত এ ব্রিজটি ভারতের আসাম রাজ্যের সঙ্গে বাংলাদেশের একমাত্র যোগাযোগের মাধ্যম ছিল।
তথ্যানুসন্ধানে জানা যায়, ১৯৬৫ সালে পাক-ভারত যুদ্ধের সময় ভারতের সৈন্যবাহিনী ঐতিহাসিক এ ব্রিজটি ধ্বংস করার চেষ্টা করে। তবে পাক বাহিনীর দৃঢ়তায় তারা ব্যর্থ হয়। পরবর্তীতে ব্রিজটি আর পুনর্নির্মাণ করা হয়নি। ২০১৫ সালে কাটা নালা নদীর তীব্র স্রোতে ব্রিজটির একপাশ কাত হয়ে ভেঙে পড়েছে।
লাঠিটিলা এলাকার সোহরাব উদ্দিন বলেন, ‘আমার বাবার এক ফুপুর অর্থাৎ আমার দাদির বিয়ে হয়েছিল ভারতের আসাম রাজ্যে। যখন বিয়ে হয় তখন দুই দেশের মধ্যে যাতায়াত ছিল এই ব্রিজ দিয়ে। এক বছর আগেও দুই দেশের সীমান্তরক্ষী বাহিনীর বদান্যতায় ওই ব্রিজের পাশে কাঁটাতারের বেড়ার দুদিকে দাঁড়িয়ে দাদির পরিবারের সাথে আমাদের পরিবারের দেখা-সাক্ষাৎ হতো। এখন আর এটিও সম্ভব হয় না।’
শফিক উদ্দিন বলেন, ‘বাংলাদেশের শেষ সীমানা লাঠিটিলা এলাকার ডুমাবাড়িতে অবস্থিত ব্রিটিশ আমলের ব্রিজটি দেখতে কয়েক বছর ধরে অসংখ্য পর্যটক আসেন। জুড়ী উপজেলা সদর থেকে এ স্থান পর্যন্ত রাস্তাঘাটও অনেক ভালো। মনোমুগ্ধকর গ্রাম আর বনাঞ্চলের ভেতর দিয়ে পিচঢালা পথ ধরে সহজে ব্রিজটির পাশ পর্যন্ত যাতায়াত করা যায়। এটি হয়ে উঠেছে জেলার অন্যতম দর্শনীয় স্থান।’
‘জুড়ীর সময়ের’ সম্পাদক আশরাফ আলী গণমাধ্যমকে বলেন, ‘সিলেট অঞ্চলের মধ্যে কমলার রাজধানী বলা হয় লাঠিটিলাকে। ওই লাঠিটিলা সীমান্তের আয়রন ব্রিজ এলাকা জেলার অন্যতম সৌন্দর্যময় স্থান। এখানে এলে বাংলাদেশ ও ভারত এই দুই দেশের প্রাকৃতিক সৌন্দর্য একসাথে উপভোগ করা যায়। ব্রিজ এলাকাটিকে যদি পর্যটন কেন্দ্র হিসেবে গড়ে তোলা যায়, তবে এটি হবে জেলার অন্যতম একটি দর্শনীয় স্থান।’