ফুয়াদ মোহাম্মদ সবুজ, মহেশখালী (কক্সবাজার)
প্রকাশ : ০২ জুন ২০২৫ ০৯:৫৫ এএম
কক্সবাজারের মহেশখালী পল্লীবিদ্যুৎ সমিতির জোনাল অফিস ভবন
মাত্র এক দিনের হালকা বৃষ্টিতেই বিদ্যুৎ বিভ্রাটে বিপর্যস্ত হয়ে পড়েছে কক্সবাজারের দ্বীপ উপজেলা মহেশখালী। টানা পাঁচ দিন ধরে বিদ্যুৎ না থাকায় পুরো উপজেলায় জনজীবনে নেমে এসেছে চরম দুর্ভোগ। ইলেকট্রনিক ডিভাইস অচল, ব্যবসা-বাণিজ্য বন্ধ, জরুরি সেবা থেকে বঞ্চিত হাজারো মানুষ। নেটওয়ার্ক বিচ্ছিন্নতার কারণে যোগাযোগেও সৃষ্টি হয়েছে অচলাবস্থা। স্থানীয়রা বলছেন, প্রাকৃতিক দুর্যোগ না থাকলেও পল্লী বিদ্যুৎ যেন কৃত্রিম দুর্যোগ তৈরি করছে ইচ্ছাকৃতভাবে।
জানা গেছে, গত বৃহস্পতিবার সকালে হালকা বৃষ্টি শুরু হয়। দুপুর নাগাদ বৃষ্টিপাত কিছুটা বাড়লেও বাতাসের গতি ছিল স্বাভাবিক। এরই মধ্যে কুতুবজোম, সাইরার ডেইল, ধলঘাটাসহ উপকূলীয় কিছু নিচু এলাকা সামান্য প্লাবিত হলেও অধিকাংশ ইউনিয়ন ছিল ঝুঁকিমুক্ত। অথচ সেই দিন সকাল থেকেই হোয়ানক, কালারমারছড়া ও ধলঘাটা ইউনিয়নসহ বিভিন্ন এলাকায় পুরোপুরি বিদ্যুৎ বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ে।
বিদ্যুৎ বিভ্রাটের কারণে পুরো উপজেলা কার্যত অচল হয়ে পড়ে। পল্লী বিদ্যুৎ সমিতির পক্ষ থেকে শুক্রবার বিদ্যুৎ সরবরাহ সচল করার প্রতিশ্রুতি এলেও তা বাস্তবায়ন হয়নি, বরং দিন গড়িয়েছে দুর্ভোগ আরও বেড়েছে। গত শুক্র, শনি ও রবিবার তিন দিনেও বিদ্যুৎ আসেনি হোয়ানক, কালারমারছড়া ও ধলঘাটাসহ বহু গ্রামে। এতে জনমনে ব্যাপক ক্ষোভের সৃষ্টি হয়েছে। স্থানীয়রা বলছেন, এই অকারণে দিন গোনা দুর্ভোগ প্রমাণ করে, প্রাকৃতিক দুর্যোগ এলে পরিস্থিতি কতটা ভয়াবহ হতে পারে। তাদের মতে, এটি কোনো প্রাকৃতিক দুর্যোগ নয়, এটি প্রশাসনিক ব্যর্থতা।
কালারমারছড়ার ফকিরাঘোনা এলাকার আনোয়ারা বেগম বলেন, আমার ছেলে শহরে থাকে, ফোন বন্ধ থাকায় তার কোনো খবর পাচ্ছি না। ফ্রিজে রাখা সব খাবার নষ্ট হয়ে গেছে। এটা কোনো প্রাকৃতিক দুর্যোগ নয়, বিদ্যুৎ অফিসের গাফিলতির দুর্যোগ। একই গ্রামের মাদ্রাসা শিক্ষক জাহাঙ্গীর আলম বলেন, ৬০০ ওয়াট উৎপাদনকারী দ্বীপে বিদ্যুৎ না থাকা কল্পনাও করা যায় না। বিদ্যুৎ অফিসে ফোন করলেও কেউ রিসিভ করেন না।
এ ছাড়া বিদ্যুৎ বিভ্রাটের পাশাপাশি গত বৃহস্পতি ও শুক্রবার পুরো উপজেলায় মোবাইল নেটওয়ার্ক ছিল প্রায় সম্পূর্ণ অচল। এতে ইন্টারনেট ব্যবহার, মোবাইল ব্যাংকিং ও জরুরি যোগাযোগ একেবারে বন্ধ হয়ে পড়ে। প্রবাসীনির্ভর বহু পরিবার পড়ে চরম সংকটে।
ব্যবসায়ীরা জানান, বিকাশ ও অনলাইন লেনদেন বন্ধ থাকায় লাখ লাখ টাকার ক্ষতি হয়েছে। অপরদিকে, অনেক পরিবারে ওষুধ সংরক্ষণ ব্যাহত হওয়ায় স্বাস্থ্যঝুঁকি দেখা দিয়েছে। মসজিদ-মাদ্রাসায় মাইকের ব্যাটারি চার্জ না থাকায় আজান ও ঘোষণা বন্ধ ছিল বহু জায়গায়।
এ প্রসঙ্গে পল্লী বিদ্যুৎ সমিতির মহেশখালী কার্যালয়ের এক কর্মকর্তা বলেন, বৃষ্টি ও জোয়ারে কিছু এলাকায় বৈদ্যুতিক খুঁটি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। আমরা নিরবচ্ছিন্নভাবে কাজ করছি। দ্রুত বিদ্যুৎ সংযোগ পুনঃস্থাপনের চেষ্টা চলছে। তবে স্থানীয়দের দাবি, কোথাও খুঁটি ভাঙার চিহ্ন দেখা যায়নি। বরং রুটিন রক্ষণাবেক্ষণের অভাবেই সামান্য বৃষ্টিতে এমন বিপর্যয় ঘটেছে।
মহেশখালী উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা হেদায়েত উল্যাহ বলেন, বড় দুর্যোগ না থাকা সত্ত্বেও এ ধরনের বিদ্যুৎ বিভ্রাট দুঃখজনক। বিষয়টি খতিয়ে দেখা হচ্ছে। পল্লী বিদ্যুৎকে নিরবচ্ছিন্ন সরবরাহ নিশ্চিত করার নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। পাশাপাশি মোবাইল নেটওয়ার্ক সচল রাখতেও সংশ্লিষ্টদের বলা হয়েছে। দুর্যোগ প্রস্তুতির নামে জনদুর্ভোগ তৈরি করা কোনোভাবেই মেনে নেওয়া হবে না।