এম আর ইসলাম রতন, নওগাঁ
প্রকাশ : ২৫ মে ২০২৫ ০৯:০১ এএম
আপডেট : ২৫ মে ২০২৫ ০৯:০৭ এএম
নওগাঁ জেলা সদরের কামারপল্লীতে নতিুন দা-ছুরি তৈরিতে ব্যস্ত কারিগর
কোরবানি মুসলিমদের আত্মত্যাগের অনন্য এক ইবাদত পবিত্র ঈদুল আজহা। এ সময় পশুর পাশাপাশি চাহিদা থাকে দা, ছুরি, বঁটি, চাকু, চাপাতি, কুড়ালসহ কোরবানির পশুর মাংস কাটার লোহার তৈরি বিভিন্ন সরঞ্জামের। এ বছরও পশুর মাংস কাটার সে চাহিদা পূরণে ব্যস্ততা বেড়েছে নওগাঁর কামারপল্লীতে। গরম লোহাকে হাতুড়ি দিয়ে পেটানোয় দম ফেলার যেন সময় নেই এ শিল্পের সঙ্গে জড়িত কারিগরদের।
নওগাঁ জেলা সদরের কামারপল্লীগুলোতে গিয়ে দেখা যায়, হাঁপরের টানে কয়লার চুলায় দাউ দাউ করে আগুন জ্বলছে। জ্বলে ওঠা আগুনের ফুলকিতে লোহাও যেন ধারণ করেছে সূর্যবর্ণ। দগদগে গরম লোহায় দিন-রাত হাতুড়ি পেটানোর টুং-টাং শব্দে মুখর কামারপল্লীর এলাকাগুলো। শহর থেকে শুরু করে গ্রামে পর্যায়ে কামারপল্লীতে এখন এ শব্দে মুখর। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে যেন ব্যস্ততা বাড়ছে। কামাররা পুরোনো দা, ছুরি এবং বঁটিতে শান দিতে, কেউবা নতুন নতুন দা-ছুরি তৈরিতে ব্যস্ত।
কয়েকজন কামারের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, স্প্রিং লোহা (পাকা লোহা) ও কাঁচা লোহা দিয়ে উপকরণ তৈরি করা হয়। স্প্রিং লোহা দিয়ে তৈরি উপকরণের মান ভালো, তবে দাম বেশি। আর কাঁচা লোহার তৈরি উপকরণগুলোর দাম তুলনামূলকভাবে কম। এ ছাড়া ব্যবহার করা হয় অ্যাঙ্গেল, ব্লাকবার, রড, স্টিং, রেললাইনের লোহা, গাড়ির পাত ইত্যাদি, যা দিয়ে ছুরি, কাটারি, বঁটি, দা ও কুঠার ইত্যাদি তৈরি করে থাকি। মানভেদে পশুর চামড়া ছাড়ানো ছুরি ১০০ থেকে ২০০, দা ২০০ থেকে ৩৫০ টাকা, বঁটি ২৫০ থেকে ৫০০, পশু জবাইয়ের ছুরি ৩০০ থেকে ১ হাজার টাকা, চাপাতি ৫০০ থেকে ৮০০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে।
মহাদেবপুর উপজেলা সদরের রঘুনাথ কর্মকার বলেন, ঈদকে সামনে রেখে আমার দোকানে কর্মব্যস্ততা অনেক গুণে বেড়েছে। পাইকারি ব্যবসার সঙ্গে স্থানীয় ক্রেতাদের অর্ডার রয়েছে। বছরের এই সময়টাতে রোজগার বেশি হলেও অন্য সময়ে তুলনামূলকভাবে রোজগার কম হয়। আমাদের পূর্বপুরুষের পেশা এটি। একসময় আমার বাবা-দাদু কামারের কাজ করত। তাদেরকে সহযোগিতা করতে করতেই এ পেশায় জড়িয়ে যাওয়া।
নওগাঁ সদরের হাঁপানিয়া বাজারের কারিগর মনোরঞ্জন পাল বলেন, ২৫ বছর এ পেশায় আছি। প্রতি বছরই কোরবানির ঈদ মৌসুমে ভালো উপার্জন করা যায়। পশু জবাই ও মাংস প্রক্রিয়াজাত করতে লোহার তৈরি ধারালো অস্ত্রের প্রয়োজন হয়।
সদর উপজেলার শিবপুর বাজারের রবীন্দ্রনাথ শাহা বলেন, ৩০ বছর ধরে আমার আয়ের প্রধান উৎস এই পেশা। সারা বছর কম বেচাকেনা থাকলেও ঈদুল আজহাকে সামনে রেখে বেশি বেচাকেনা হয়।
নওগাঁ সরকারি কলেজের সাবেক অধ্যক্ষ ও শিক্ষাবিদ প্রফেসর শরিফুল ইসলাম খান বলেন, কোরবানির পশু জবাই ও মাংস প্রক্রিয়াজাত করতে লোহার তৈরি ধারালো অস্ত্রের প্রয়োজন হয়। আর এজন্যই ঈদকে ঘিরে কামারদের তৈরি দা, বঁটি, ছুরি, চাপাতি ইত্যাদি সামগ্রী বেশি হয়ে থাকে।
মহামারি করোনাভাইরাসের প্রকোপ, আধুনিক যন্ত্র বাজার দখলে নেওয়ায় এ প্রাচীন শিল্পের অনেক কারিগররা তাদের আদি পেশা পরিবর্তন করেছেন। অনেকে কষ্ট হলেও বাপ-দাদার এই পেশাকে ধরে রেখেছেন। কামার শিল্পের সঙ্গে জড়িতদের নানামুখী সুযোগ-সুবিধা দিয়ে এ পেশাকে টিকিয়ে রাখতে সরকারের উদ্যোগ নেওয়া প্রয়োজন।
বিসিক জেলা কার্যালয় নওগাঁর উপ-ব্যবস্থাপক শামীম আক্তার মামুন বলেন, জেলায় বর্তমানে পাঁচ শতাধিক কারিগর কামার শিল্পের সঙ্গে জড়িত। বিসিক কার্যালয় থেকে আমরা প্রশিক্ষণ ও ঋণসহয়াতা প্রদান করে থাকি। যদি কোনো কারিগর চায় তবে অবশ্যই তাকে সহজ শর্তে ঋণ প্রদান করার উদ্যোগ গ্রহণ করা হবে।