রুবেল আহমেদ, আখাউড়া (ব্রাহ্মণবাড়িয়া)
প্রকাশ : ২৩ মে ২০২৫ ১৭:৩৫ পিএম
আপডেট : ২৩ মে ২০২৫ ১৭:৪০ পিএম
পুষ্টিগুণে ভরপুর, সুস্বাদু ও ঔষধি গুণসম্পন্ন একটি খাদ্য হিসেবে মাশরুমের জনপ্রিয়তা দিন দিন বেড়েই চলেছে। এই সম্ভাবনাময় খাতে সফলতা এনে দিচ্ছেন দেশের তরুণ উদ্যোক্তারা। এমনই এক অনুপ্রেরণামূলক গল্প গড়ে তুলেছেন ব্রাহ্মণবাড়িয়ার আখাউড়া উপজেলার করুয়াতলী গ্রামের তরুণ মোহাম্মদ ফয়জুল গনী।
এলএলবি পড়ুয়া এই যুবক নিজের আগ্রহ, অধ্যবসায় ও সরকারি সহযোগিতায় গড়ে তুলেছেন একটি সফল মাশরুম খামার ‘বারী মাশরুম কর্নার’। শুধু নিজেরই নয়, আশপাশের আরও কয়েকজনের কর্মসংস্থানেরও সুযোগ সৃষ্টি করেছেন তিনি। প্রতিদিন এই খামার থেকে উৎপাদিত হচ্ছে পুষ্টিকর মাশরুম, যা পৌঁছে যাচ্ছে স্থানীয় বাজারে এবং মানুষের খাদ্য তালিকায়।
মাশরুম চাষে বেকার সমস্যার সমাধান ও বাড়তি আয়ের উৎস হিসেবে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে। এটি চাষে কোনো আবাদি জমির প্রয়োজন হয় না। চাষের জমি না থাকলেও বসতঘরের পাশে অব্যবহৃত জায়গা ও ঘরের বারান্দা ব্যবহার করে অধিক পরিমাণ মাশরুম উৎপাদন করা সম্ভব। মাশরুম বীজ উৎপাদনের জন্য যেসব কাঁচামালের প্রয়োজন হয়। তা হলোÑ খড়, কাঠের গুঁড়া, কাগজ, গমের ভুসি ইত্যাদি এসব জিনিস আমাদের দেশে সহজলভ্য ও সস্তা।
গত বৃহস্পতিবার সরেজমিন মোহাম্মদ ফয়জুল গনীর খামারে গিয়ে দেখা যায়, চারদিকে শান্ত, নিরিবিলি প্রাকৃতিক পরিবেশ। খামার বাড়ির আঙিনায় বিভিন্ন ফলের গাছ, রয়েছে ছোট একটা ঝিল, সেখানে পানিতে হাঁস ভেসে বেড়াচ্ছে। তার পাশে সুন্দর পেঁপে বাগান। আর এক কোনায় মাশরুমের ঘর। ঘরে সাজিয়েছেন মাশরুমের র্যাক। তাকে তাকে সাজানো মাশরুমের প্যাকেট। প্যাকেট ভেদ করে বের হওয়া মাশরুমগুলো দেখতে বেশ চমৎকার।
আখাউড়া উপজেলা কৃষি অফিসের সহযোগিতায় মাশরুম চাষের ওপর প্রশিক্ষণ নিয়ে ফয়জুলের এই পথচলা। মূলত নিজের ইচ্ছেশক্তি আর কৃষি অফিসের উৎসাহে মাশরুম চাষে উদ্বুদ্ধ হয়ে মাশরুম চাষ শুরু করেন তিনি। গত বছরের ডিসেম্বর থেকে তিনি মাশরুম চাষ শুরু করছেন।
জাতীয় মাশরুম উন্নয়ন ইনস্টিটিউটের এক গবেষণায় জানা যায়, প্রতি একশ গ্রাম মাশরুমে প্রোটিন ২৫-৩৫ গ্রাম, ভিটামিন ৫৭-৬০ গ্রাম, ৫-৬ গ্রাম মিনারেল ও শর্করা, উপকারী চর্বি ৪-৬ গ্রাম। এতে আঁশের পরিমাণ শতকরা ১০-২৮ ভাগ, যা অন্য খাবারের তুলনায় বেশি। মাশরুম পেশির সক্রিয়তা ও স্মৃতিশক্তি বজায় রাখতে উপকারী এবং বার্ধক্যের লক্ষণ ও ওজন কমাতে সহায়ক। উচ্চ রক্তচাপ নিয়ন্ত্রণেও মাশরুম সহায়তা করে।
স্থানীয় যুবক মো. সাদমান বলেন, ফয়জুল গনী ভাইয়ের মাশরুম চাষ করা দেখে আমরা ভাবতাম ব্যাঙের ছাতার মতো কী চাষ করে। পরে বুঝলাম অনেক পুষ্টিকর খাবার মাশরুম। আমিও মাশরুম চাষ করব। এ নিয়ে তার সঙ্গে পরামর্শ করে প্রশিক্ষণ নেব।
ফয়জুল গনী বলেন, আমার বাবা, মা, ভাই, বোন আমেরিকায় বসবাস করেন। তাদের কাছ থেকে মাশরুমের পুষ্টিগুণের কথা শুনে মাশরুম চাষের পরিকল্পনা করি। ২০২৪ সালের শেষের দিকে উপজেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর থেকে ঢাকা মাশরুম উন্নয়ন ইনস্টিটিউটে প্রশিক্ষণে যাই। প্রশিক্ষণ শেষে মাশরুম চাষ শুরু করার যাবতীয় উপকরণ উপজেলা কৃষি অফিস থেকে সরবরাহ করে। বর্তমানে আমার প্রায় ১ হাজার স্পন আছে, যা থেকে প্রতিদিন ৩-৪ কেজি করে মাশরুম তুলে বাজারজাত করি। প্রতি কেজি পাইকারি দরে বিক্রি হয় তিনশ টাকা। আশা করছি আগামী শীতে প্রতিদিন ১০-১২ কেজি মাশরুম বাজারজাত করতে পারব।
আখাউড়া উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা তানিয়া তাবাসসুম জানান, ফয়জুল গনী একজন তরুণ উদ্যোক্তা। মাশরুমের চাষ পদ্ধতি তিনি হাতে-কলমে শিখেছেন। প্রশিক্ষণের মাধ্যমে তিনি পিডিএ মিডিয়া প্রস্তুত, পিওর কালচার তৈরি, মাদার কালচার ও বাণিজ্যিক স্পন তৈরি সম্পর্কে প্রশিক্ষণ নেন। মাশরুম প্রকল্প থেকে প্রাপ্ত প্রদর্শনীর উপকরণ হিসেবে তাকে উপজেলা কৃষি অফিস কর্তৃক একটি চাষ ঘর, একটি বীজ ঘর স্থাপন, ইনকুলেশন চেম্বার, ১২টি র্যাক এবং ভ্যান গাড়িসহ বিভিন্ন উপকরণ সরবরাহ করা হয়েছে।