রাজু আহমেদ, রাজশাহী
প্রকাশ : ১৯ মে ২০২৫ ০৯:৫২ এএম
আপডেট : ১৯ মে ২০২৫ ১৪:০০ পিএম
বরেন্দ্র অঞ্চলের কৃষি ভূগর্ভস্থ পানির স্তর নেমে যাওয়ায় ব্যক্তি উদ্যোগে বসানো হচ্ছে নলকূপ
বরেন্দ্র অঞ্চলের কৃষি ভূগর্ভস্থ পানির ওপর নির্ভরশীল। আর এই পানি পেতে লক্ষাধিক কৃষক ডিপ পরিচালনায় নিয়োজিত অপারেটরদের দ্বারা নির্যাতন ও হয়রানির শিকার হচ্ছেন। টাকা নিয়ে পানি না দেওয়া, জমি লিজ দিতে বাধ্য করাসহ নানা অভিযোগ উঠেছে অপারেটরদের বিরুদ্ধে। তবে ডিপ অপারেটরদের দাবি, পানির লেয়ার নেমে যাওয়াসহ এক ডিপের আওতায় ২০০ থেকে ৩০০ বিঘা জমি থাকায় সেচের পানি সরবরাহে বিপত্তি দেখা দিয়েছে। তবে এসব বিষয়ে কোনো কথা বলতে রাজি হয়নি বরেন্দ্র বহুমুখী উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ (বিএমডিএ)।
ধানের জমিতে সেচের পানি না পেয়ে ডিপ অপারেটর খোকন মণ্ডলের বিরুদ্ধে থানাসহ সংশ্লিষ্ট দপ্তরে লিখিত অভিযোগ করেছেন তানোর উপজেলার কামারগাঁ গ্রামের নিরুপায় খগেন পরামানিক।
অভিযোগ থেকে জানা যায়, ডিপ অপারেটর সেচ দিতে অতিরিক্ত টাকা আদায় করেন। অন্যদিকে অভিযোগ দায়েরের পরেই রাতের আঁধারে খগেনের জমিতে পানি দেওয়া হয়েছে।
গত শনিবার দুপুরে খগেন পরামানিকের বাড়িতে গিয়ে দেখা যায়, তাদের উঠোনে ধানের আঁটি বেঁধে রাখা হয়েছে। খগেন ডাক্তারের কাছে চিকিৎসার জন্য গেছেন। বাড়ির উঠোনে কথা হয় খগেনের ভাই জোগেন পরামানিকের সঙ্গে। তিনি উঠোনে ধানের আঁটি দেখিয়ে বলেন, ‘এই স্কিপে আমার দুই বিঘা জমি আছে। ডিপ অপারেটর খোকন জমিতে পানি না দিয়ে আগের ধানও পুড়িয়ে মেরেছে। এবারেও ধান পুড়ে গেছে। আমার ভাইয়েরও জমির ধানও পুড়ে গেছে।’ তিনি বলেন, ‘পানি না দেওয়ায় আমার ভাই থানায় লিখিত অভিযোগ দিয়েছে। পরে ওই রাতেই জমিতে পানি দিয়েছে।’
বিএমডিএর ডিপের সংখ্যা ১৬ হাজারে মতো। তবে এর বাইরেও আছে ব্যক্তিমালিকানাধীন সহস্রাধিক ডিপ। খগেন পারলেও, অন্য সব কৃষক লিখিত অভিযোগ তো দূরের কথা, অপারেটরদের বিরুদ্ধে কথা বলতেই ভয় পান। তবে কৃষক এরশাদ বলেন, ‘গভীর নলকূপের যেসব অপারেটর আছে, এদের মাধ্যমে কৃষকরা বিভিন্নভাবে লাঞ্ছিত হচ্ছেন। বিঘাপ্রতি নির্ধারিত টাকার চাইতে বেশি টাকা আদায় করা হচ্ছে। এমনকি টাকা নিয়েও জমিতে পানি দিচ্ছেন না। ডিপ অপারেটরদের নিয়োগে রাজনৈতিক পরিচয় দেখে নিয়োগ দেওয়া হয়। পরবর্তী সময়ে তারা স্কিমভুক্ত জমির কৃষকদের নিজেদের রাজনৈতিক দলের কর্মসূচিতে অংশ নিতে বাধ্য করছেন।’
বাঘা উপজেলার কৃষক একমত আলী বলেন, ‘জমিতে পানি না দিলে ধান পুড়ে মারা যায়। পনি নিয়ে নানা কারসাজি হচ্ছে। নিয়মমতো বা সময়মতো জমিতে পানি পাওয়া যায় না।’
অভিযোগ প্রসঙ্গে ডিপ অপারেটর খোকন মণ্ডল বলেন, ‘ভূগর্ভস্থ পানির স্বল্পতায় সব জমিতে সমানভাবে সেচ দেওয়া সম্ভব হয় না। তা ছাড়া একটা ডিপের অধীনে ২০০ থেকে ৩০০ বিঘা জমি থাকে। এক জমিতে সেচ দিয়ে আবার ওই জমিতে ফিরে আসতে ১০ থেকে ১২ দিন সময় লাগে। এসব কারণে অনেক কৃষক ক্ষিপ্ত হন। আবার অনেকে সেচের টাকা না দিয়েও অভিযোগ করেন। খগেনের জমিতে ঠিকমতো পানি দেওয়া হয়েছে। জমিতে সার ও কীটনাশক ঠিকমতো না দিয়ে তিনি মিথ্যাই আমার বিরুদ্ধে অভিযোগ করেছেন।’ তানোর উপজেলার ইউএনও লিয়াকত সালমান বলেন, ‘স্থানীয় প্রশাসনের দাবি বিষয়টি বিএমডিএর নিয়ন্ত্রণাধীন। তবে অভিযোগ পেলে কৃষকদের সহযোগিতা করা হচ্ছে।’
তবে বিএমডিএর তানোর জোনের সহকারী প্রকৌশলী জামিনুর রহমান কৃষকদের অভিযোগ নিয়ে সাংবাদিকের সঙ্গে কোনো কথা বলতে রাজি হননি, বিএমডিএর সহকারী প্রকৌশলী।
এদিকে বিএমডিএর নির্বাহী প্রকৌশলী মোস্তাফিজুর রহমান বলেন, ‘যেসব ডিপে পানি কম ওঠে ওই সব স্কিমের কৃষকদের আমরা আগে থেকেই বলে দেই যে ৯৮০ ঘণ্টা সর্বোচ্চ চালাব। তাদেরকে ধানের বিকল্প ফসল চাষ করতে বলা হয়। এখন ১৮০- ১৯০ ফিট পর্যন্ত গভীরে গিয়ে পানি মিলছে। পানির লেয়ার কমে এসেছে। বরেন্দ্রর আওতায় রাজশাহী ও রংপুর বিভাগের ১৬ জেলায় প্রায় ১৬ হাজার ডিপ রয়েছে। আর রাজশাহী জেলায় আছে তিন হাজারের মতো। পানি না পেয়ে বেশ কিছু ডিপ অচল হয়ে পড়েছে। তানোর বাধাইড়সহ গোদাগাড়ীর কিছু কিছু এলাকার ডিপে পানি মিলছেই না। তারপরেও কৃষকদের অভিযোগ পেলে আমরা দ্রুত ব্যবস্থা নিচ্ছি। অপারেটরদের বলা হয়েছে কোনো অবস্থাতেই ফসল নষ্ট হতে দেওয়া যাবে না।’