মহেশখালী
ফুয়াদ মোহাম্মদ সবুজ, মহেশখালী (কক্সবাজার)
প্রকাশ : ১৭ মে ২০২৫ ১৬:৩৮ পিএম
সরকার পতনের দশ মাস পার হলেও কক্সবাজারের মহেশখালীতে প্যারাবন ধ্বংস ও জমি দখলের বিরুদ্ধে কার্যকর কোনো ব্যবস্থা নেয়নি অন্তর্বর্তীকালীন সরকার। স্থানীয়দের অভিযোগ, প্রশাসন ও বিচার বিভাগের নীরবতা দখলদারদের আরও বেপরোয়া করে তুলেছে।
চট্টগ্রাম উপকূলীয় বন বিভাগের দায়ের করা মামলাগুলোর তোয়াক্কা না করে ইতোমধ্যে মহেশখালীতে প্রায় ৩০০ একরের বেশি ম্যানগ্রোভ বন দখল করেছে প্রভাবশালী চক্র। সোনাদিয়া এলাকায় বেজার নিয়ন্ত্রিত প্রায় সাড়ে ৫ হাজার একর জমির বড় অংশই এখন দখলদারদের কবলে। এর মধ্যে অন্তত ৪৭টি চিংড়িঘের গড়ে তোলা হয়েছে শুধু সোনাদিয়াতেই।
স্থানীয়দের ভাষ্যমতে, প্যারাবনের ওপর নির্মিত হয়েছে একাধিক ঘের, লবণের মাঠ এবং খননযন্ত্র দিয়ে গাছ কেটে বন উজাড় চলছে। বন বিভাগের অভিযান শুধু নাটকীয়তায় সীমাবদ্ধ। মামলার আসামিরা প্রকাশ্যে ঘুরলেও প্রশাসন গ্রেপ্তারে কোনো আগ্রহ দেখাচ্ছে না। আগাম জামিন নিয়ে দখলদাররা আরও বেপরোয়া হয়ে উঠছে। আইনের শাসন এখন যেন দখলদারদের বাগানে পরিণত হয়েছে।
গত বছরের ২৭ ডিসেম্বর সোনাদিয়ার উপকূলীয় বন পরিদর্শন করেন প্রধান বন সংরক্ষক আমির হোসাইন চৌধুরী। তিনি জানান, দখল হওয়া প্যারাবন উদ্ধার করে আবারও বনাঞ্চল গড়ে তোলা হবে। এ কাজে স্থানীয়দের সমন্বিত সহযোগিতা কামনা করেন। পাশাপাশি দখলদারদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা গ্রহণের আশ্বাসও দেন। তবে সেই ঘোষণা দেওয়ার ছয় মাস পেরিয়ে গেলেও চট্টগ্রাম উপকূলীয় বন বিভাগ কার্যত কোনো দৃশ্যমান পদক্ষেপ নেয়নি। এতে স্থানীয়রা হতাশ এবং দখলদারদের মনোবল আরও বেড়ে গেছে।
মহেশখালীর ইতিহাসে সর্বোচ্চ পরিমাণ প্যারাবন নিধন, দখল এবং গাছ কাটার ঘটনা ঘটেছে গোরকঘাটা রেঞ্জ কর্মকর্তা আনিসুর রহমানের দায়িত্বকালে। মাত্র দুই বছরের চাকরি জীবনে বিতর্কের বোঝা মাথায় নিয়ে ২০২৩ সালে বিদায় নেন। স্থানীয় পুলিশ এবং বন বিভাগের সংশ্লিষ্টদের ‘ম্যানেজ’ করে প্যারাবনের বিশাল অংশ দখল করে নেয়। স্থানীয় জনপ্রতিনিধি, রাজনীতিবিদ এবং প্রভাবশালীদের ছায়া ও সহযোগিতা পেয়েই এমন দুর্বার আগ্রাসন চালানো সম্ভব হয়েছে বলে জানান পরিবেশকর্মীরা।
হোয়ানক ইউনিয়নের পানিরছড়ার পশ্চিমে সরকারি খাল ও প্যারাবন দখলে (জাপাপন্থি) অ্যাডভোকেট সাহাব উদ্দিনকে ৪ আনা শেয়ার দিয়ে চিংড়িঘের নির্মাণ করা হয়েছে বলে অভিযোগ। প্রভাবশালী রাজনৈতিক নেতারা এতে প্রত্যক্ষভাবে জড়িত এবং প্রশাসনের একাংশ ঘুস খেয়ে বিষয়টি আড়াল করেছে বলেও অভিযোগ রয়েছে। এ বিষয়ে আদালত ও থানায় একাধিক মামলা হলেও এখনও কাউকে গ্রেপ্তার করা হয়নি।
আদালতে করা মামলায় আসামি করা হয়েছে হোয়ানকের অ্যাডভোকেট সাহাব উদ্দিন, মো. ইসহাক, ছদর আমিন, বড় মহেশখালীর মারুফুল হকসহ আরও ৩০-৪০ জনকে। অন্য এক মামলায় প্রধান আসামি কুতুবদিয়ার সাবেক চেয়ারম্যানের ছেলে এরশাদ।
উপকূলীয় বন বিভাগের মহেশখালী রেঞ্জ কর্মকর্তা আইয়ুব আলী বলেন, দখলদারদের বিরুদ্ধে দায়ের করা মামলাগুলো প্রক্রিয়াধীন। আমরা আইনি লড়াই চালিয়ে যাচ্ছি। সোনাদিয়া ছাড়া নতুন করে ৩০০ একরের বাইরে কোনো দখলের তথ্য আমার কাছে নেই। তিনি দাবি করেন, দখলদারদের বিরুদ্ধে বন বিভাগ ‘জিরো টলারেন্স’ নীতি অনুসরণ করছে। যদিও বাস্তবে তেমন কোনো দৃশ্যমান অগ্রগতি নেই, বরং স্থানীয়দের মধ্যে প্রশাসনের কার্যকারিতা নিয়ে প্রশ্ন তৈরি হয়েছে।