ফুয়াদ মোহাম্মদ সবুজ, মহেশখালী (কক্সবাজার)
প্রকাশ : ১৫ মে ২০২৫ ১৬:৪২ পিএম
মহেশখালীতে অটোরিকশায় বসে জনসেবায় নিয়োজিত ইউপি সদস্য সুজন কান্তি দে। প্রবা ফটো
বৃষ্টিভেজা সড়ক হোক কিংবা রোদ ঝলমলে দুপুরÑ চাকায় ঘুরছে শুধু যান নয়, ঘুরছে মানুষের প্রতি দায়বদ্ধতা, মমতা আর মানবতার গল্প। কক্সবাজারের মহেশখালীর ছোট মহেশখালীতে এমনই এক ব্যতিক্রমী দৃশ্যের নাম সুজন কান্তি দে। তিনি একজন ইউনিয়ন পরিষদের (ইউপি) সদস্য, আবার পেশায় একজন অটোরিকশাচালক।
জনপ্রতিনিধির মর্যাদা তার আচরণে ভারী হয়নি, বরং চালকের আসনে থেকেই তিনি হয়ে উঠেছেন মানুষের ভরসার ঠিকানা। যেখানেই বিপদ, সেখানেই ছুটে যান সুজনÑ সেবার ছায়ায় ছুঁয়ে দেন অসহায়ের প্রাণ। তার অটোরিকশাটি যেন শুধু যাত্রী নয়, বহন করে সহানুভূতি, দায়িত্ব আর নিষ্ঠার এক চলমান প্রতীক। মানুষের সেবায় নিবেদিত এই মানুষটি শুধু একটি ওয়ার্ডের নেতা নন, তিনি হয়ে উঠেছেন একটি ভালোবাসার নাম, একটি আস্থার ঠিকানা।
তরুণ বয়সেই জীবিকার তাগিদে অটোরিকশা চালানো শুরু করেছিলেন সুজন। জনসেবায় আসার পরও ছাড়েননি পুরোনো সেই পেশা। এখনো প্রতিদিন অটোরিকশা চালান। বৃষ্টি, রোদ কিংবা গভীর রাতÑ সব সময়ই হাজির হন অসুস্থ রোগী কিংবা বিপদগ্রস্ত কারও পাশে। চালকের আসনে থেকেও যেন মানুষের অন্তরে বসে আছেন নীরবে।
স্থানীয়রা বলেন, ‘সুজন শুধু চালক নন, তিনি একজন মানুষের মতো মানুষ। কেউ হাসপাতালে যেতে না পারলে নিজেই পৌঁছে দেন। কেউ বিপদে পড়লে ছুটে যান আগে। গলায় না থাকলেও হৃদয়ে যেন সব সময় ঝুলে থাকে সেবার পরিচয়পত্র। তার সততা আর সহজ জীবন দেখে অনেকেই ফিরে পান সাহস ও অনুপ্রেরণা। তবে এত সেবা ও জনপ্রিয়তার মাঝেও নিন্দুকদের অভাব হয়নি। কেউ কেউ প্রশ্ন তোলে, ইউপি সদস্য হয়ে কেন অটোরিকশা চালান? সুজন এসব কথায় পাত্তা দেন না। বলেন, সৎ পথে থাকাটাই মুখ্য। অটোরিকশা চালিয়ে হলেও পরিবার চালাই, মাথা নিচু করতে হয় না। তার কণ্ঠে দৃঢ়তা আর চোখে আত্মবিশ্বাস।
সুজনের স্ত্রী শিল্পী মল্লিক জানান, আমি তার জন্য গর্ব করি। মানুষের পাশে দাঁড়ান, সৎভাবে জীবনযাপন করেন, এটাই আমার কাছে বড় কথা। মাঝে মাঝে কটূক্তি শুনলেও সেগুলোকে পাত্তা দেন না। বরং স্বামীর প্রতিটি ভালো কাজেই তার মুখে হাসির রেখা ঝরে পড়ে গর্বের মতো।
মানুষের জন্য কাজ করার ইচ্ছা সুজনের হৃদয়ে জন্ম নেয় এক অভিজ্ঞতা থেকে। একদিন অটোরিকশা সংক্রান্ত বিষয়ে ইউপি সদস্যের স্বাক্ষর দরকার হয়। বারবার ধরনা দিয়েও মেলে না স্বাক্ষর, উল্টো হয়রানির শিকার হন। সেদিনই মনে দৃঢ় সংকল্প করেন, মানুষের এমন দুর্ভোগ আর হতে দেবেন না।
এরপর ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচনে ৯ নম্বর ওয়ার্ড থেকে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করেন। ‘ভোট চাই’ নয়, বলেন ‘ভরসা চাই’। ফলাফল অপর প্রার্থীর মধ্যে ৬০ শতাংশ ভোট পেয়ে জয়ী হন। জনগণ বেছে নেয় তাদের নিজেদের একজনকে, যে চালকের আসন থেকে উঠে আসা এক সহমর্মিতার প্রতিচ্ছবি।
সেই স্বাক্ষর না পাওয়ার যন্ত্রণাই আজ সুজনের মনোযোগের কেন্দ্রে। যেই কষ্টে প্রতিজ্ঞা জন্মেছিল, আজ প্রতিদিন তার প্রতিফলন ঘটে। যে কেউ চলতি পথেই চাইতে পারেন প্রয়োজনীয় কাগজে স্বাক্ষর। সুজন যেন হয়ে উঠেছেন চলমান মানবসেবার এক মোবাইল ইউনিট, যেখানে সদা প্রস্তুত এক নিঃস্বার্থ মন।
অটোরিকশাচালক এই ইউপি সদস্যের নিষ্ঠা, সততা ও নিঃস্বার্থতা আজ মহেশখালীর সীমা পেরিয়ে অনুপ্রেরণা ছড়াচ্ছে সর্বত্র। তার সহজ-সরল জীবনাচার ও জনসেবা নিয়ে স্থানীয়রা বলেন, ‘দেশে যদি এমন মানুষ রাজনীতি করত, তবে রাজনীতি হতো মানবতার জন্য।’