আবদুল্লাহ আল-মামুন, ফেনী
প্রকাশ : ১২ মে ২০২৫ ১৭:৩৯ পিএম
নদী ভাঙনে বাড়িঘর হারিয়ে দিশাহারা সোনাগাজী উপজেলার ২ নম্বর বগাদানা ইউনিয়নের কাজীর হাট জেলে পাড়ার বাসিন্দারা। প্রবা ফটো
ছোট ফেনী নদীর দুই তীরে দেখা দিয়েছে ভাঙন। এতে আশঙ্কা রয়েছে ফেনীর সোনাগাজী ও দাগনভূঞা উপজেলার মানচিত্র বদলে যাওয়ার। গত বছরের বন্যার পানির তোড়ে ভেঙে যায় মুছাপুর রেগুলেটর। এরপর থেকে ছোট ফেনী নদীর দুই তীরে দেখা দিয়েছে তীব্র ভাঙন। প্রতিদিন জোয়ারের পানিতে বিলিন হয়ে যাচ্ছে মানুষের ঘরবাড়ি, কৃষিজমি, মসজিদ, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, সড়ক। বর্তমানে স্থানীয়দের ভাঙন আতঙ্কে দিন কাটছে। ভাঙনরোধে দ্রুত ব্যবস্থা নেওয়ার আশ্বাস দিয়েছে পানি উন্নয়ন বোর্ড।
পানি উন্নয়ন বোর্ড সূত্র জানায়, ১৯৬১ সালে ছোট ফেনী নদীর ভাঙনরোধে সোনাগাজীর কাজির হাটে নদীর ওপর একটি রেগুলেটর নির্মাণ করা হয়। পানি উন্নয়ন বোর্ডের রক্ষণাবেক্ষণের অভাবে ২০০২ সালে এটি নদীতে বিলীন হয়ে যায়। ২০০৬ সালেন ৮ মার্চ সাবেক প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়া কাজির হাট রেগুলেটরের ২০ কিলোমিটার ভাটিতে নতুন ডাকাতিয়া ও পুরাতন ডাকাতিয়া ছোট ফেনী নদী নিষ্কাশন প্রকল্পের অধীন মুসাপুর রেগুলেটর নির্মাণ কাজের ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন করেন।
পানি উন্নয়ন বোর্ডের ব্যবস্থাপনায় ২৩ ভেন্টের মুছাপুর রেগুলেটরের কাজ ২০০৯ সালে শেষ করা হয়। ১.৩০ লাখ হেক্টর জমি রক্ষার্থে এ প্রকল্প নির্মাণে ব্যয় ধরা হয়েছিল ৩২.৩৫ কোটি টাকা। তবে ২০২৩ সালের এক তথ্য অনুযায়ী সরকারের (রেগুলেটরে বিভিন্নভাবে ও বিভিন্ন সময়ে বাজেট বরাদ্দ অনুযায়ী) প্রায় ৫০০ কোটি টাকা ব্যয় হয়েছে। এই রেগুলেটরে পানি নিষ্কাশন ক্ষমতা ছিল প্রতি সেকেন্ডে ৭৫৩.১৫ ঘনমিটার। রেগুলেটর নির্মাণের সময় নোয়াখালী পানি উন্নয়ন বোর্ডের অসাধু কর্মকর্তা ও ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের নামে ব্যাপক দুর্নীতির অভিযোগ ছিল। গত বছরের ২৬ আগস্ট বন্যার পানির তোড়ে মুছাপুর রেগুলেটরটি নদীতে ভেসে যায়।
সরেজমিন দেখা যায়, সোনাগাজীর চর মজলিশপুর ইউনিয়নের চর বদরপুর, কুঠির হাট, কাটাখিলা, কালীমন্দির, বগাদানা ইউনিয়নের আলমপুর, আউরারখিল, চর দরবেশ ইউনিয়নের দক্ষিণ চর দরবেশ, আদর্শ গ্রাম, পশ্চিম চর দরবেশ, তেল্লার ঘাট, ইতালি মার্কেট, ধনী পাড়াসহ বেশ কয়েকটি গ্রামের ঘরবাড়ি নদীতে চলে যাচ্ছে। এর মধ্যে বেশ কয়েকটি সড়ক, পুল, কালভার্ট, কয়েকশ ঘরবাড়ি নদীতে বিলীন হয়ে গেছে।
প্রতিদিন লোকালয়ে এবং ফসলি জমিতে ঢুকে পড়ছে জোয়ারের পানি। এলাকাবাসির দাবি ক্ষতিগ্রস্ত মানুষের খবর রাখে না কেউ। স্থায়ী সমাধান না করে, বার বার প্রকল্প করে সরকারি বরাদ্দ লোপাট করার অভিযোগ পানি উন্নয়ন বোর্ডের অসাধু কর্মকর্তা ও ঠিকাদারের বিরুদ্ধে। স্থায়ীভাবে ভাঙনরোধে স্থানীয়দের দাবি দ্রুত মুছাপুর রেগুলেটর পুনর্নির্মাণ করা হোক।
কাটাখিল গ্রামের কবির হোসেন বলেন, ‘বেড়িবাঁধ থেকে আর দশ ফিট বাকি আছে নদী ভাঙন। বেড়িবাঁধ ভেঙে গেলে ২টি ইউনিয়ন, কেরামতিয়া বাজার, কাজির হাটের যাতায়াত বন্ধ হয়ে যাবে।’
লমপুর গ্রামের ফাতেমা আক্তার জানান, ‘আমার তিন ভাইয়ের ঘর ছিল নদীর কিনারে। তাদের তিনটা ঘর নদী নিয়ে গেছে। আমার একটি ঘর সরিয়ে নিয়ে করেছি সেটিও ভেঙে যাচ্ছে।’
কাজিরহাট জেলে পাড়ার রেখা রানী দাস বলেন, ‘জোয়ারের পানি রান্না ঘর, থাকার ঘর নিয়ে গেছে। অনেক কষ্টে ছেলেমেয়ে নিয়ে দিন পার করছি।’ সরকারসহ বিত্তবানদের সহযোগিতা কামনা করেন তিনি।
ফেনীর অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক ফাতিমা সুলতানা বলেন, ‘নদী ভাঙনের বিষয়ে জেলা প্রশাসন জানে। উপজেলা প্রশাসন ভাঙন তীরবর্তী এলাকার ক্ষতিগ্রস্তের তালিকা করছে। সে তালিকা অনুযায়ী তাদের পুনর্বাসনের ও আর্থিক সহায়তা দেওয়া হবে।’ ফেনী পানি উন্নয়ন বোর্ডের নির্বাহী প্রকৌশলী আকতার হোসেন মজুমদার বলেন, ‘মুছাপুর রেগুলেটর ভেঙে যাওয়ায় ছোট ফেনী নদীতে জোয়ার ভাটার কারণে ভাঙন দেখা দিয়েছে। এই ভাঙন দিন দিন বাড়ছে। পানি উন্নয়ন বোর্ড ভাঙনরোধে পানি উন্নয়ন বোর্ড প্রস্তাবনার পরিপ্রেক্ষিতে বিশ্ব ব্যাংকের প্রজেক্ট, সাস্টিনেবল ইমারজেন্সি রিকভারি প্রিফাইয়ার্ডনেস বি-স্ট্রং প্রজেক্টের আওতায় ১৩ কিলোমিটার নদী সংরক্ষণের জন্য ১৫৫ কোটি টাকা সহায়তা প্রস্তাবনা রয়েছে। শিগগিরই তা বাস্তবায়ন করা হবে। এটি বাস্তবায়ন করা হলে নদী ভাঙন রোধ হবে।