সঞ্জয় চৌধুরী
প্রকাশ : ১২ মে ২০২৫ ১৬:২৭ পিএম
আপডেট : ১২ মে ২০২৫ ১৬:৩২ পিএম
কিছুটা পানি বাড়ার কথা শুনে সপ্তাহ দুয়েক আগে গিয়েছিলাম তিস্তাপাড়ে। পানি বাড়লে মৃতপ্রায় নদীটি কিছুটা ‘জেগে’ ওঠে। গাইবান্ধা জেলার সুন্দরগঞ্জ উপজেলার নবনির্মিত হরিপুর-চিলমারী তিস্তা সেতু ঘেঁষে নৌকায় উঠে ৫ থেকে ৬ কিলোমিটার উজানের দিকে গিয়েছি। দেখার চেষ্টা করেছি নদীপাড় ঘেঁষা জীবন, প্রাণ-প্রকৃতি ও জীববৈচিত্র্য।
শ্যালোমেশিন চালিত নৌকা অতি সতর্কতার সঙ্গে মৃদু গতিতে চালাচ্ছেন চালক। কারণ কোথাও কোথাও নৌকার তলার সঙ্গে নদীর তলদেশ লেগে যাচ্ছে। ফলে নদীতে পানি বিশেষ বেড়েছে বলে মনে হলো না।
চোখে পড়ল একটি ছোট বগা (বকের একটি প্রজাতি) ঝিম ধরে দাঁড়িয়ে আছে নদীর ভেতর ছোট চরের কিনারে। দেখতে দেখতেই এক ঝটকায় পাখিটি তিস্তার পানি থেকে তুলে নিলো বৈরালী মাছ। বকের ঠোঁটে বৈরালী মাছ, বিরল মুহূর্ত ধারণ করলাম ক্যামেরায়। উত্তরের ব্রহ্মপুত্র, ধরলা এবং তিস্তা ছাড়া এই রুপালি বৈরালী মাছ অন্য নদীতে তেমন দেখা যায় না। ইদানীং তিস্তার বেহাল দশা, কৃষি ক্ষেত্রে মাত্রাতিরিক্ত সার ও রাসায়নিকের ব্যবহার এবং কারেন্ট জালের আধিক্যে উত্তরের এই রুপালি মাছ অনেক কমে গেছে।
নদীর খাড়া পাড়ে ছোট ছোট গর্তের পাশে দুই চার জোড়া গাঙ শালিক বসে আছে। গাঙ শালিক সাধারণত নদীর খাড়া পাড়ের ছোট ছোট গর্তে বাসা বানায়।
তিস্তার চরে সারাদিন ঘাস কাটার পর বোঝা বানিয়ে নৌকার আশায় চরের কিনারে দাঁড়িয়ে আছেন ষাটোর্ধ্ব দুজন কৃষক। গবাদিপশু, বিশেষ করে গরুর জন্য সংগ্রহ করা হয়েছে এই ঘাস। তিস্তাপাড়ের অধিকাংশ বাড়িতেই কমবেশি গরু পালন করা হয়।
এখন বোরো মৌসুমের ধান কাটা ও মাড়াইয়ের কাজ শুরু হয়েছে। তিস্তাপাড়ের জনগোষ্ঠীর মধ্যেও সেই ব্যস্ততা চোখে পড়ল। নদীপাড় ঘেঁষে ধান মাড়াইয়ের কাজে ব্যস্ত নারীরা। একটু এগিয়েই দেখি ঘোড়ার গাড়িতে ধানের আঁটি বেঁধে নিয়ে যাচ্ছে পিতা-পুত্র। চরগুলোতে চোখে পড়লে ভুট্টার ক্ষেতও।
নদীর পাড়ে দুই-চার জনকে দেখলাম জাল পেতে বসে আছেন। চলতি নৌকা থেকে জোরে হাঁক ছেড়ে জিজ্ঞেস করলামÑ ‘চাচা, কী মাছ ধরা পড়ে?’ চাচাও হাঁক ছেড়ে বললেনÑ ‘মাছ তেমন নাই বাহে, দুই-চারটা পুঁটি, বৈরাল পাওয়া যায়।’ তিস্তায় সে অর্থে মাছ ধরা পড়ে না এখন।
নৌকা ছুটে চলছে উজানে। মধ্য তিস্তায় নৌকার তলা নদীর চরানে দুয়েকবার আটকানোর ফলে নৌকা থেকে একজন নেমে হাতে ঠেলে নৌকা পার করলেন।
গাইবান্ধার সুন্দরগঞ্জ উপজেলার কাশিমবাজার ইউনিয়ন তিস্তা নদীর পাড়েই। নৌকা যাচ্ছে বাজারের পাশ দিয়ে। বিকাল হয়ে এসেছে। চোখে পড়ল নদীপাড়ে ফেলা হচ্ছে হাজার হাজার বালিভর্তি জিও ব্যাগ। ভাঙন রোধে এই ব্যবস্থা। নৌকা ভেড়াতে বললাম। হাজীপাড়া বলে একটি স্থানে নামলাম। নদীর পাড়েই একটি মসজিদ। পাশেই কবরস্থান। এ বছর যদি ভাঙন রোধ করা না যায়, তাহলে অচিরেই নদীতে বিলীন হবে মসজিদ ও কবরস্থানসহ গ্রামটি। তবে এরই মধ্যে সংকটাপন্ন স্থানে বালিভর্তি জিও ব্যাগ ডাম্পিং শুরু হয়েছে এবং কাজ চলমান রয়েছে। মসজিদের পাশেই মেহগনি গাছে বড় পেরেক ঠুকে সাঁটিয়ে দেওয়া তিস্তার পাড় ভাঙন রোধে গৃহীত এই প্রকল্পের একটি পরিচিতি ফেস্টুন। প্রকল্প বাস্তবায়নে রয়েছেÑ গাইবান্ধা পানি উন্নয়ন বিভাগ, বাংলাদেশ পানি উন্নয়ন বোর্ড, গাইবান্ধা।
উল্লেখ্য, গাছে পেরেক ঠোকা রোধ ও গাছের সুরক্ষায় নতুন আইন তৈরির কথা বলেছিলেন পরিবেশ, বন ও জলবায়ু পরিবর্তন উপদেষ্টা সৈয়দা রিজওয়ানা হাসান।
মসজিদের পাশেই স্থানীয় কয়েকজনের সঙ্গে কথা হলো। তারা জানালেন তিস্তার এই পাড় ভাঙন রোধ কার্যক্রম দেখে তারা অত্যন্ত আনন্দিত। মধ্য বয়সি একজন পাশে বসা এক বৃদ্ধকে দেখিয়ে বললেনÑ ‘এই চাচার বাড়ি সাতবার তিস্তায় ভাঙছে, এইবার ফির বাড়ি বানাইছে। এইবার চাচার বাড়ি আর ভাঙবার নয়।’
তাকিয়ে দেখি জীবন সায়াহ্নেও এই তিস্তাপাড়ের বৃদ্ধের চোখে জ্বলজ্বল করছে নতুন স্বপ্ন। তিস্তাপাড়ের মানুষ তিস্তার ভাঙনে সব হারিয়েও তিস্তাকে জড়িয়েই বাঁচেন।
লেখক : শিক্ষক ও পরিচালক, গ্রিন ইকো