× ই-পেপার প্রচ্ছদ সর্বশেষ বাংলাদেশ রাজনীতি দেশজুড়ে বিশ্বজুড়ে বাণিজ্য খেলা বিনোদন মতামত চাকরি শিক্ষা আজকের কার্টুন ফিচার সকল বিভাগ ছবি ভিডিও লেখক আর্কাইভ কনভার্টার

বাঁশির সুরে ঘোরে জীবনের চাকা

মাহাবুবুর রহমান মিঠুন, ঈশ্বরদী (পাবনা)

প্রকাশ : ০৫ মে ২০২৫ ১৪:১২ পিএম

বাঁশির সুরেই বাঁচার আশায় পথ হাঁটেন রহমত আলী

বাঁশির সুরেই বাঁচার আশায় পথ হাঁটেন রহমত আলী

পাবনার ঈশ্বরদীর ৯৬ বছর বয়সি রহমত আলী ছয় দশকের বেশি সময় ধরে জীবিকা নির্বাহ করছেন বাঁশি বাজিয়ে। একসময় মাঠে মহিষ চরাতে গিয়ে বাঁশির প্রেমে পড়েন তিনি। সেই ভালোবাসা থেকেই শিখেছিলেন বাঁশি বাজানো, আর সেটিই হয়ে ওঠে জীবনের অবলম্বন। আজও শহরের গলি-মহল্লা, হাট-বাজার কিংবা ট্রেনে ঘুরে বাঁশির সুরে মানুষকে মোহিত করেন তিনি এবং সেই সুর বিক্রির মাধ্যমেই চালান জীবনের চাকা। তবে বয়সের ভার, দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতি আর সন্তানদের অবহেলায় জীবন আজ কষ্টকর। একসময়ের চায়ের দোকানটিও হারিয়ে গেছে করোনাকালে। তবুও শেষ বয়সে বাঁশির সুরেই বাঁচার আশায় পথ হাঁটছেন তিনি।

দারিদ্রের নানা ঘাত-প্রতিঘাতে পড়াশোনা করার সুযোগ হয়নি রহমত আলীর। তার বয়স যখন ১৬ থেকে ১৮ তখনই বাড়ির হালের মহিষ চরাতে মাঠে-প্রান্তরে ঘুরে মুখের শিস বাজিয়ে মনের খোরাক জোগাতেন। বাঁশির প্রতি ছিল অন্যরকম টান আর ভালোবাসা। ‘হ্যামিলনের বাঁশিওয়ালা’ হয়ে ওঠার ইচ্ছা থেকে গ্রামের ইউসুফ আলীর কাছে শেখেন বাঁশি বাজানো। আজও পথেপ্রান্তরে এই বাঁশি বাজিয়ে অনায়াসেই যেন জীবন চালিয়ে যাচ্ছেন তিনি। জীবনের ৬৫ বছর এই বাঁশি বাজিয়েই পার করে দিয়েছেন। এই বাঁশিই এখন বৃদ্ধ রহমত আলীর জীবন-জীবিকা অর্জনের একমাত্র উৎস।

রহমত আলী পাবনার ঈশ্বরদী উপজেলার দাশুড়িয়া ইউনিয়নের চাঁদপুর গ্রামের নছির খানের ছেলে। শহরের আনাচে-কানাচে, গ্রামের হাট-বাজারে মাইলের পর মাইল হেঁটে ও বাস-ট্রেনে বাঁশির সুরে দর্শক মাতিয়ে ব্যাগে থাকা বাঁশি বিক্রি করেই জীবন চলে তার। নানারকম গানের সুর বাঁশিতে তুলে দর্শকদের মুগ্ধ করেন তিনি। এই সুর শুনে কেউ তাকে উপহার হিসেবে কিছু টাকা দিলে তা স্বচ্ছন্দেই গ্রহণ করেন।

সরেজমিনে গিয়ে দেখি, ঈশ্বরদী বাজারের এক নম্বর গেটে আপনমনে বাঁশির সুর তুলছিলেন রহমত আলী। মুগ্ধ হয়ে কিছু মানুষ উপভোগ করছিলেন সেই সুর। তারপর সেখান থেকে মিনিট পাঁচেক পরই সুর থামিয়ে হাঁটা শুরু করেন সামনের দিকে। তবে বয়সের ভারে বাঁশির ব্যাগ কাঁধে নিয়ে হেঁটে চলা যেন তার জন্য বর্তমানে বড়ই দুঃসাধ্য ব্যাপার। পিছু নিয়ে তার সঙ্গে কথা হয় প্রতিবেদকের। তিনি বিষাদ ও বিষণ্ন কণ্ঠে বলেন, ‘আত্মার সঙ্গে এই সুর মিশে গেছে, তবে এই বাঁশির সুরে এখন আর জীবন যেন চলছে না।’

এদিকে বাঁশিওয়ালা রহমত আলীর সঙ্গে কথা বলার সময় তার বাঁশির মধুর সুর শুনতে অনেকেই ভিড় করেছেন। এ সময় স্থানীয় কয়েকজন রহমত আলীর বাঁশি বাজানোর প্রশংসা করে জানান, এই বৃদ্ধ বয়সেও তার যে জীবনসংগ্রাম আর বাঁশি বাজানোর যে প্রতিভা, তা আসলেই আমাদের মুগ্ধ করে।

রহমত আলী জানান, বাবা ছিলেন দরিদ্র কৃষক। তাই কৈশোর থেকেই বাবার সঙ্গে সংসারের হাল ধরতে মাঠে কৃষিকাজ ও মহিষ চরাতে যেতে হতো। পরে তিনিও দুই সন্তানের বাবা হন। কিন্তু সন্তানেরা কাছে নেই। বিয়ে করে সবাই বাড়ি ছেড়েছেন। বয়সের ভারে চলাচল করতে কষ্ট হতো। তাই স্থানীয়দের সহযোগিতায় দাশুড়িয়া রেলস্টেশনের পাশেই দিয়েছিলেন একটি চায়ের দোকান। বাঁশি বাজাতেন আর চা বিক্রি করে যা আয় করতেন তা দিয়ে দুজনের ছোট্ট সংসার চলে যেত। তবে করোনার সময় দোকানটি বন্ধ রাখায় জায়গাটি বেদখল হয়ে গেছে। তাই এখন হাটবাজারে ঘুরে এবং ট্রেনে ফেরি করে বাঁশি বিক্রি করেন।

রহমত আলীর ভাষ্যমতে, যুবক বয়সে শখ করে বাঁশি বাজানো শিখেছিলেন। এখন এই শখের বাঁশিই তার জীবন-জীবিকা রক্ষা করছে। তবে বাঁশি কেনার তেমন মানুষ নেই। সারা দিন ঘুরে বাঁশি বাজিয়ে যে কয়টি বাঁশি বিক্রি করেন, তাতে দেড় থেকে দুইশ টাকা আয় হয়। তা দিয়ে সংসার চলে না। বাজারে সব জিনিসের দাম বেড়েছে। একটি কিনলে আরেকটি কেনার টাকা থাকে না। তাই প্রায়ই স্বামী-স্ত্রীকে একবেলা খেয়ে অন্যবেলা না খেয়ে কাটাতে হয়। এদিকে উপজেলায় একাধিকবার ঘুরেও একটি বয়স্ক ভাতার কার্ড পাননি বলেও তিনি আক্ষেপ প্রকাশ করেন। 

বয়স তো অনেক হলো, এভাবে আর কতদিন পথে পথে ঘুরে বাঁশি বাজাবেন? এমন প্রশ্নের জবাবে রহমত আলী বলেন, আত্মার সঙ্গে বাঁশির সুর মিশে গেছে। যে কয়দিন বাঁচি সে কয়দিন বাঁশি বাজিয়েই জীবন কাটিয়ে দেব। নিঃশ্বাস বন্ধ হয়ে গেলে বাঁশির সুরও একদিন বন্ধ হয়ে যাবে। 

ঈশ্বরদী উপজেলা সমাজসেবা কর্মকর্তা মো. আতিকুর রহমান বলেন, ‘সমাজমাধ্যমে আমি রহমত আলীর বাঁশি বাজানো দেখেছি। কিন্তু বয়স্ক ভাতার ব্যাপারে তাকে কখনও এই কার্যালয়ে আসতে দেখিনি। তিনি যদি এই সমাজসেবা কার্যালয়ে আসেন, ভাতার জন্য আমার সর্বাত্মক সহযোগিতা থাকবে।’

শেয়ার করুন-

মন্তব্য করুন

Protidiner Bangladesh

সম্পাদক : মারুফ কামাল খান

প্রকাশক : কাউসার আহমেদ অপু

রংধনু কর্পোরেট, ক- ২৭১ (১০ম তলা) ব্লক-সি, প্রগতি সরণি, কুড়িল (বিশ্বরোড) ঢাকা -১২২৯

যোগাযোগ

প্রধান কার্যালয়: +৮৮০৯৬১১৬৭৭৬৯৬ । ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন (প্রিন্ট): +৮৮০৯৬১১৬৭৭৮১০, +৮৮০১৮৮০৭৪৪৫৮০ | ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন (অনলাইন): +৮৮০১৮৮০৭৪৪৫৮০, +৮৮০১৭৯৯৪৪৯৫৫৯ । ই-মেইল: [email protected]

সার্কুলেশন: +৮৮০৯৬১১৬৭৭৮০৭, +৮৮০১৮৮০৭৪৪৩৩২ । ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন মূল্য তালিকা