মহসিন রেজা, দেওয়ানগঞ্জ (জামালপুর)
প্রকাশ : ০৩ মে ২০২৫ ১২:৫৫ পিএম
জামালপুরের দেওয়ানগঞ্জ উপজেলার বাহাদুরাবাদ ও পাশের বকশীগঞ্জ উপজেলার মেরুরচর ইউনিয়নের মধ্য দিয়ে বয়ে যাওয়া দশানী নদীতে ডুবন্ত ধান কাটতে ব্যস্ত কৃষকরা।
জামালপুরের দেওয়ানগঞ্জ উপজেলার বাহাদুরাবাদ ও পাশের বকশীগঞ্জ উপজেলার মেরুরচর ইউনিয়নের মধ্য দিয়ে বয়ে যাওয়া দশানী নদীতে পাল্টাপাল্টি নির্মাণ করা বাঁধ ভেঙে ফেলা হয়েছে।
গতকাল শুক্রবার বিকালে হাজার হাজার গ্রামবাসীর উপস্থিতিতে বাহাদুরাবাদ ইউনিয়নের খরপাপাড়া ও পাশের মেরুরচর ইউনিয়নের আইরমারী গ্রামে বাঁধ দুটি ভেঙে ফেলা হয়। এতে সাময়িক সমস্যার সমাধান মিলিছে বলে দাবি স্থানীয়দের।
জানা গেছে, দশানী নদীর দুই স্থানে দুপক্ষ পাল্টাপাল্টি বাঁধ দেওয়ায় নদীর স্বাভাবিক প্রবাহ বন্ধ হয়ে কৃত্রিম বন্যার সৃষ্টি হয়। এতে ডুবে যায় শত শত একর জমির কাঁচা-পাকা ধান। স্থানীয়দের দুর্ভোগ লাঘবে দুপক্ষের সঙ্গে আলোচনা করে দশানী নদীতে বাঁধ দুটি ভেঙে ফেলতে নির্দেশ দেয় প্রশাসন। তবে বাঁধ দুটি ভেঙে ফেলতে প্রশাসনের নির্দেশনা ইতোপূর্বে অমান্য করে আইরমারী গ্রামবাসী। এ নিয়ে বাঁধ অপসারণের পক্ষে-বিপক্ষে দুটি দলের মধ্যে উত্তেজনা দেখা দেয়।
গত বৃহস্পতিবার বিকালে বকশীগঞ্জের ইউএনও মাসুদ রানার নেতৃত্বে চর আইরমারী এলাকায় নির্মিত বাঁধটি ভাঙতে গেলে ওই গ্রামের লোকজন বাঁধ ভাঙতে বাধা দেয়। এতে বাহাদুরাবাদ ইউনিয়নের শেখপাড়া ও মেরুরচর ইউনিয়নের চর আইরমারী গ্রামের লোকজনের মধ্যে ধাওয়া-পাল্টা ধাওয়ার ঘটনা ঘটে। পরে পুলিশ ও সেনাবাহিনী পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনে।
এ ঘটনায় বকশীগঞ্জ সহকারী কমিশনার (ভূমি) ও নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট আসমা উল হুসনা দুই ব্যক্তিকে ছয় মাসের বিনাশ্রম কারাদণ্ডাদেশ দেন। সাজাপ্রাপ্তরা হলেনÑ চর আইরমারী গ্রামের সোনার উদ্দিনের ছেলে রহমত আলী ও মৃত হাসেন আলীর ছেলে ইউসুফ আলী।
জানা গেছে, দেওয়ানগঞ্জের বাহাদুরাবাদ ইউনিয়নের খাপড়াপাড়ায় দশানী নদীতে প্রতি বছর ভাঙন দেখা দেয়। ভাঙনরোধে দীর্ঘদিন ধরে স্থানীয়রা দাবি জানিয়ে এলেও পানি উন্নয়ন বোর্ড (পাউবো) কার্যকর কোনো ব্যবস্থা নেয়নি। তাই এবার এলাকাবাসী নিজ উদ্যোগে খাপড়াপাড়া এলাকায় সম্প্রতি নদীতে আড়াআড়িভাবে একটি বাঁধ নির্মাণ করে।
ওই বাঁধের ফলে নদীর পূর্বদিক থেকে পশ্চিম দিকে পানিপ্রবাহ বন্ধ হয়ে যায়। এতে বকশীগঞ্জ উপজেলার সাধুরপাড়া ইউনিয়নের কামালের বার্ত্তী, শেখপাড়া, খানপাড়া, বাঙালপাড়া, মদনেরচর, নীলেরচর, কুতুবেরচর, চরগাজিরপাড়া গ্রামের নিম্নাঞ্চল প্লাবিত হতে শুরু করে। পরে ক্ষিপ্ত হয়ে বকশীগঞ্জের সাধুরপাড়া ইউনিয়নের চর আইরমারী গ্রামের বাসিন্দারাও নদীতে আরেকটি পাল্টা বাঁধ নির্মাণ করে। পাল্টাপাল্টি দুটি বাঁধ নির্মাণের ফলে নদীর স্বাভাবিক পানিপ্রবাহ বন্ধ হয়ে যায়। এতে উজানের পানি ভাটিতে আসার পরিবর্তে উল্টো ভাটির পানি উজানের দিকে আসে। এতে উজানে দেখা দেয় কৃত্রিম বন্যা। বন্যায় তলিয়ে যায় বিস্তীর্ণ এলাকার ফসলি জমি। অবস্থা বেগতিক দেখে স্থানীয় কৃষকরা পানির নিচ থেকে ধান কেটে নেন।
সরেজমিন দেখা গেছে, দেওয়ানগঞ্জের চর আমখাওয়া, হাতিভাঙা ও বাহাদুরাবাদ ইউনিয়নের জিঞ্জিরাম নদী সংলগ্ন ধানের ক্ষেতে বন্যার পানি ঢুকেছে। কোনো ক্ষেতের ধান প্রায় পেকেছে আবার কোনো ক্ষেতে কেবল ধানের শীষ বের হয়েছে। এমতাবস্থায় জমিতে বন্যার পানি দেখে ভুক্তভোগী কৃষকরা দিশাহারা হয়ে পরেন। ওই অঞ্চলের প্রধান ফসল হলো বোরো ধানের আবাদ। এ আবাদের মাধ্যমে নিজেদের খোরাক ও ধানের খড় গো-খাদ্য হিসেবে ব্যবহৃত হয় সারা বছর। নিরুপায় হয়ে কেউ গো-খাদ্যের জন্য কাঁচা ধানই কেটে বাড়িতে নিয়ে গেছেন।
লংকারচর গ্রামের বোরোধান চাষি আব্দুল খালেক বলেন, ‘আমি দুই বিঘা জমিতে ধান চাষ করেছি। এই জমির উৎপাদিত ধানের মাধ্যমে সারা বছরের খোরাক ও খড় দিয়ে গরুর খাদ্যের ব্যবস্থা হয়ে থাকে। এ বন্যার কারণে ধান নষ্ট হয়ে গেছে। এতে আমাদের অনেক ক্ষতির সম্মুখীন হতে হলো। বাঁধ দুটি ভাঙার ফলে কিছুটা হলেও স্বস্তি পাচ্ছি।’
জামালপুর পানি উন্নয়ন বোর্ডের নির্বাহী প্রকৌশলী নকিবুজ্জামান খান বলেন, ‘বাঁধ নির্মাণকারী দুপক্ষের সঙ্গে দফায় দফায় আলোচনার পর অবশেষে তারা বাঁধ দুটি ভেঙে ফেলেছেন। এতে উভয় গ্রামে স্বস্তি ফিরেছে।’
জামালপুরের জেলা প্রশাসক হাছিনা বেগম বলেন, ‘নদীতে পাল্টাপাল্টি বাঁধ নির্মাণের খবর পেয়ে আমি ঘটনাস্থল পরিদর্শন করেছি। পরে দুপক্ষকে নিয়ে সভা করেছি। দুপক্ষ বাঁধ অপসারণে সম্মত হয়েছে এবং নিজেদের ভুল স্বীকার করেছে।’