এম এ ইউসুফ আলী, রাঙ্গাবালী
প্রকাশ : ২৩ এপ্রিল ২০২৫ ১০:৩৫ এএম
আপডেট : ২৩ এপ্রিল ২০২৫ ১১:৪৭ এএম
আগুনমুখা নদীর ভাঙনে বিলিন হচ্ছে ভিটেমাটি ও কৃষিজমি। মঙ্গলবার পটুয়াখালীর রাঙ্গাবালীর চালিতাবুনিয়া ইউনিয়ন
আগুনমুখা নদীর ভাঙনে বিলিন হওয়ার পথে চালিতাবুনিয়া নামক ইউনিয়নটি। ভিটেমাটি বিলিন হয়ে যাওয়ায় অনেকে অন্যত্র চলে গেছেন। অনেকে শেষ সম্বলটুকু আঁকড়ে ধরে নদীর তীরে রয়ে গেছেন। কেউ কেউ বেড়িবাঁধের ঢালুতে কোনো রকমে ঠাঁই নিয়েছেন।
আগুনমুখা নদীর ভাঙনরোধে নেই কার্যকর উদ্যোগ। দিনের পর দিন ভাঙনে মানুষ সর্বস্ব হারিয়ে নিঃস্ব। এদিকটি দেখার যেন কেউ নেই। জনপ্রতিনিধিরা ভাঙনরোধে কাজ করবেন, এমন প্রতিশ্রুতি দিলেও বারবার তাদের অক্ষমতাই সর্বস্ব হারানো নিঃস্ব মানুষের কাছে ধরা পড়েছে। আসলে এ ব্যাপারে যে সরকারকে এগিয়ে আসতে হবে। সরকারের সেই কর্তাব্যক্তিদের ধারের কাছে যাওয়া এবং নদী ভাঙনরোধের বিষয়টি তাদের কাছে তুলে ধরায় জনপ্রতিনিধিরা কতটা আন্তরিক তা নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে।
লিতাবুনিয়ার বাসিন্দা নেছার হাওলাদার বলেন, ‘আমার প্রায় দুই কানি জমি ছিল। সব-ই আগুনমুখার পেটে গেছে। এখন যে একটা ঘর উঠাব, সেই জায়গাটুকুও নেই। একে একে তিনবার বাড়ি পাল্টিয়েছি। পুকুর-ঘের করে মাছ চাষ করলে তাও লবণাক্ত পানি ঢুকে তছনছ করে ফেলে।’
কথা হয় রেনু বেগমের সঙ্গে। তিনি নদীপাড়ে অপলক দৃষ্টিতে তাকিয়ে আছেন। দীর্ঘশ্বাস ফেলে তিনি বলেন, ‘কোথায় যাব? কী করব? এখন আল্লাহ-ই ভালো জানেন। জায়গা-জমি সবই তো নদী নিয়ে গেছে। আমাদের আর কিছুই নেই।’ হারানো স্মৃতি প্রায়ই তাকে নদীপাড়ে নিয়ে আসে। ১০ বছরে তিনবার আগুনমুখা নদী বৃদ্ধা রেনু বেগমের ভিটেবাড়ি সব কেড়ে নিয়েছে। নতুন করে ঘুরে দাঁড়াতে না দাঁড়াতেই ফের ভাঙনের মুখে তাকে পড়তে হয়েছে। রক্ষা করতে পারেননি তার সহায়-সম্পদ। এখন বাঁধঘেঁষে যেখানে বসবাস করছেন, তাও ভাঙনের মুখে।
এই ভাঙনের গল্প শুধু রেনু বেগমের একার নয়। এটি উপকূলীয় পটুয়াখালীর রাঙ্গাবালীর বিচ্ছিন্ন দ্বীপ ইউনিয়ন চালিতাবুনিয়ার শত শত পরিবারের কষ্টের গল্প। শত শত পরিবার তাদের বসতভিটে, বাড়ি, জমি, সম্পদ হারিয়েছেন। সব হারিয়ে কেউ হয়েছেন নিঃস্ব। এমনকি অনেকের প্রিয়জনের কবরও আজ নদীতে চলে গেছে।
স্থানীয় বাসিন্দাদের দাবি ভাঙনকবলিত চালিতাবুনিয়াকে বাঁচাতে হবে। দেখা যাবে পুরো ইউনিয়টিই নদীতে চলে গেছে। তাই সরকারকে ভাবতে হবে টেকসই বেড়িবাঁধ ও ব্লক দিয়ে নদীর তীর রক্ষার কথা। একদিকে নদীর স্রোত। অন্যদিকে দুর্বল বাঁধ। পরিস্থিতি এভাবে চলতে থাকলে চালিতাবুনিয়া ইউনিয়নের মানুষ আরও নিরাপত্তাহীন হয়ে পড়বে। তাই স্থায়ী টেকসই বাঁধ। নদীর তীর রক্ষায় কার্যকর উদ্যোগ নিতে আর সময়ক্ষেপণ ঠিক হবে না।
চালিতাবুনিয়া ইউনিয়নে প্রায় ১৫ হাজার মানুষ বাস করেন। এ পর্যন্ত ইউনিয়নটির মূল ভূখণ্ডের প্রায় তিন একাংশ বিলীন হয়ে গেছে। এখানে ২০১৪ সাল থেকে নদী ভাঙনের শুরু।
প্রশাসন ব্যবস্থা নেওয়ার আগে অনেক বসতভিটা নদীতে তলিয়ে গেছে। চালিতাবুনিয়া মানুষ অনিশ্চিত ভবিষ্যৎ নিয়ে এগুচ্ছেন। আগুনমুখা নদী রয়েছে তাদের তাদের সর্বনাশের মূলে।
চালিতাবুনিয়া ইউনিয়নের প্যানেল চেয়ারম্যান বিপ্লব হাওলাদার বলেন, ‘এ ইউনিয়নের ১, ২, ৭, ৮, ৯ এ পাঁচটি ওয়ার্ড ভাঙনকবলিত। বিষয়টি লিখিতভাবে পানি উন্নয়ন বোর্ডকে জানানো হয়েছে। সরকার যদি দ্রুত পদক্ষেপ না নেয় তাহলে ভাঙনকবলিত জনপদটির অস্থিত্ব-ই আর থাকবে না।’
রাঙ্গাবালী উপজেলা ইউএনও ইকবাল হাসান বলেন, ‘ভাঙনকবলিত চালিতাবুনিয়া রক্ষার জন্য পানি উন্নয়ন বোর্ডের মাধ্যমে স্থায়ী ব্লক বাঁধ নির্মাণের জন্য সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে জানানো হবে।’