সাইফুল ইসলাম, সালথা-নগরকান্দা (ফরিদপুর)
প্রকাশ : ২০ এপ্রিল ২০২৫ ১৭:০৮ পিএম
আপডেট : ২০ এপ্রিল ২০২৫ ১৭:১৬ পিএম
যে চিকিৎসকরা আছেন, তারাও বেসরকারি ক্লিনিকে ব্যক্তিগত চেম্বারে রোগী দেখেন
ফরিদপুরের নগরকান্দা উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স অনিয়ম ও চিকিৎসক সংকটে দৈন্যদশায় পড়েছে। ঠিকমতো স্বাস্থ্যসেবা পাচ্ছেন না বলে রোগীদের বিস্তর অভিযোগ। তবে হাসপাতাল কর্তৃপক্ষের দাবি, হাসপাতালে পাঁচ-ছয়জন চিকিৎসক দিয়ে স্বাস্থ্যসেবা দিতে হচ্ছে। এ ছাড়া বেশিরভাগ চিকিৎসক প্রেষণে রয়েছেন। এতে স্বাস্থ্যসেবায় ঘটছে বিঘ্ন।
হাসপাতালটিতে যে কজন চিকিৎসক রয়েছেন, তারাও দিনের বেশিরভাগ সময়ে বিভিন্ন ক্লিনিক ও হাসপাতালে ব্যক্তিগত চেম্বারে রোগী দেখেন। তাদের সরকারি হাসপাতালটিতে আসা রোগীর প্রতি কোনো মনোযোগ নেই। এতে স্বাস্থ্যসেবা বঞ্চিত হচ্ছেন সাধারণ রোগীরা। হাসপাতালটিতে জরুরি চিকিৎসার জন্য গাইনি, শিশুরোগ ও ইএনটি বিশেষজ্ঞও নেই বলে জানা গেছে।
স্থানীয়দের অভিযোগ, নগরকান্দা উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে প্রয়োজন মতো জনবল না থাকার পরও চিকিৎসকদের অবহেলায় রোগীরা সঠিক স্বাস্থ্যসেবা বঞ্চিত হচ্ছেন। দৈনিক ওষুধ সরবরাহের তালিকায় রোগীদের ওষুধ দেওয়ার বিধান থাকলেও তেমন কোনো ওষুধই দেওয়া হয় না। তবে হাসপাতালটির চিকিৎসকদের দাবি হাসপাতালে চিকিৎসক সংকট প্রকট রূপ নিয়েছে। ওষুধেরও তীব্র সংকট রয়েছে।
স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে চিকিৎসা নিতে আসা রোগীদের অভিযোগ, বিভিন্ন ওষুধ কোম্পানির বিক্রয় প্রতিনিধিদের সঙ্গে হাসপাতালের চিকিৎসকদের সখ্য থাকায় কমিশনের বিনিময়ে তাদের ওষুধ পেসক্রিপশনে লেখা হয়। এ ছাড়া হাসপাতালে শিডিউল অনুসারে রোগীদের খাবার দেওয়া হয় না। সরকারি ওষুধও মাঝেমধ্যে চুরি করে বাইরে বিক্রি করা হয়। এ ছাড়া রোগী ও তার স্বজনদের সঙ্গে হাসপাতালের স্টাফরা খারাপ আচরণ করেন।
সম্প্রতি সরেজমিন স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে গিয়ে দেখা যায়, হাসপাতালে রোগী সিটে থাকলেও অধিকাংশ চিকিৎসক, নার্স ও স্টাফরা ছিলেন অনুপস্থিত। সময় বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে আসতে থাকেন চিকিৎসক, নার্স ও স্টাফরা। হাসপাতালে স্বাস্থ্যসেবা পাওয়ার আশায় দীর্ঘ সময় ধরে মায়েরা ৪-৫ মাসের শিশুদের কোলে নিয়ে অপেক্ষমাণ। হাসপাতালে অপেক্ষমাণ রোগীর চেয়ে বিভিন্ন ওষুধ কোম্পানির বিক্রয় প্রতিনিধিদের উপস্থিতি বেশি লক্ষ করা গেছে।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক হাসপাতালের একাধিক স্টাফ অভিযোগ করে বলেন হাসপাতালে কর্মরত আরিফা আক্তার নামের এক আয়া নিয়মিত হাসপাতালে অনুপস্থিত থেকেও ঠিকই বেতন তুলে নিচ্ছেন। আনুমানিক পাঁচ বছর ধরে তিনি এ কাজ করে যাচ্ছেন। মাঝেমধ্যে উপস্থিত হয়ে হাজিরা খাতায় সারা মাসের উপস্থিতির সই দিয়ে চলে যান। সারাদিন আর তার খোঁজ মেলে না। এ ছাড়া ওই আয়া মাসিক দুই হাজার টাকার বিনিময়ে হাসিনা নামের এক মহিলাকে দিয়ে ডিউটি করান। সেও দায়সারা কাজ করেন। আয়া আরিফা আক্তারের পরিবারের দাবি অভিযোগটি সঠিক নয়। তিনি (আরিফা) হাসপাতালে নিয়মিত ডিউটি করেন।
হাসপাতালে চিকিৎসা নিতে আসা রোগী ও রোগীর স্বজনদের অভিযোগ, উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা চিকিৎসক জয়দেব কুমার সরকার অধিকাংশ সময়ে অফিসে থাকেন না। অফিস চলাকালীন বেশির ভাগ সময় মিটিং করার অজুহাতে বাহিরে থাকেন। দিনের কিছুটা সময় তিনি আরোগ্য সদন দি ল্যাব নামের একটি ডায়াগনস্টিক সেন্টারে রোগী দেখেন। ওয়ার্ডবয় ও অন্য স্টাফদের দিয়ে রোগীদের চিকিৎসাসহ বিভিন্ন অফিসিয়াল কার্যক্রম চলছে এ স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে। অভিযোগ রয়েছে এসবই নাকি হচ্ছে ডা. জয়দেব সরকারের ছত্রছায়ায়। এ সময় ভুক্তভোগি রোগী ও সাধারণ মানুষের সঙ্গে আলাপকালে বিভিন্ন অনিয়ম, দুর্নীতি ও ভোগান্তির চিত্র তুলে ধরেন তারা।
হাসপাতালে চিকিৎসা নিতে আসা নগরকান্দা পৌরসভার সাইফুল ইসলাম নামের এক ব্যক্তি বলেন, ‘আমার সন্তান শিশুকে নিয়ে দুদিন ধরে বসে আছি। কোনো ওষুধ পাচ্ছি না। হাসপাতালে খাবার-দাবারের মানও ভালো না। চিকিৎসকরা ঠিকমতো রোগী দেখতে আসেন না। নার্স ও আয়ারাও ভালো ব্যবহার করেন না।
উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা ডা. জয়দেব সরকারের কাছ বিষয়টি জানতে চাইলে অনিয়ম, দুর্নীতি ও অবহেলার বিষয়টি তিনি এড়িয়ে যান। এ ছাড়া আয়া আরিফা আক্তারের বিষয়ে জানতে চাইলেও কিছু বলতে রাজি হননি।
এ ব্যাপারে নগরকান্দা উপজেলা ইউএনও কাফী বিন কবির বলেন, ‘হাসপাতালের একজন আয়া অনুপস্থিত থেকে বেতন তুলছেন বলে যে অভিযোগ করা হচ্ছে, সেটা খতিয়ে দেখা হবে। যদি বিষয়টি সত্য হয় কঠোর ব্যবস্থাও নেওয়া হবে।’
ইউএনও বলেন, ‘হাসপাতালের অনিয়মের বিষয়টিও খতিয়ে দেখা হবে। হাসপাতালে চিকিৎসক সংকট তীব্র। এ ছাড়া অফিস টাইমে বাইরে চিকিৎসকরা রোগী দেখে থাকেন তা আমার জানা মতে সঠিক নয়। কারণ চিকিৎসকই হাতে গোনা কয়েকজন। তারা আবার চেম্বার করেন কখন? এছাড়া বাইরে ওষুধ বিক্রির বিষয়টি খতিয়ে দেখা হবে।’
এসব অভিযোগের বিষয়ে ফরিদপুরের সিভিল সার্জন ডা. মাহমুদুল হাসান বলেন, ‘এসব বিষয়ে খোঁজখবর নিয়ে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে।’