আন্দরকিল্লা জেনারেল হাসপাতাল
আবু রায়হান তানিন, চট্টগ্রাম
প্রকাশ : ১৮ এপ্রিল ২০২৫ ০৯:৪৭ এএম
আপডেট : ১৮ এপ্রিল ২০২৫ ১০:৫৮ এএম
‘আমি এসেছি রাউজান থেকে। বাবার শ্বাসকষ্ট বাড়ায় উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে গিয়েছিলাম। তারা জেনারেল হাসপাতাল পাঠিয়েছেন। এখানে এলাম বেলা ১১টায়। স্লিপ নিয়েছি, এখনও ডাকেনি, রোগী বেশি দেখা যাচ্ছে। ওনাদের জিজ্ঞেস করলাম, ওনারা আমাকে জানালেন, এখানে চিকিৎসক কম, কিছুটা সময় বেশি লাগতে পারে।’ গতকাল বৃহস্পতিবার দুপুর সাড়ে ১২টার দিকে চট্টগ্রামের আন্দরকিল্লা জেনারেল হাসপাতালের বহির্বিভাগে এসব কথা বলছিলেন আতাহার আলী। এদিন অন্য সময়ের তুলনায় রোগীদের ভিড় একটু বেশিই দেখা গেছে হাসপাতালটির বহির্বিভাগে।
তখন কথা হয় চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের (চবি) শিক্ষার্থী তাশরিফা আক্তারের সঙ্গে। তিনিও শ্বাসকষ্টে ভোগা মাকে নিয়ে এসেছেন। তার মাকে নিবিড় পরিচর্যা কেন্দ্রে (আইসিইউ) ভর্তি করাতে হবে। তিনি বলেন, আইসিইউর বিষয়ে চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ (চমেক) হাসপাতালে খোঁজ নিয়েছি, কিন্তু সেখানে আইসিইউ খালি পাওয়া কঠিন। তাই সেদিকে আর যাইনি। এখানে চিকিৎসকের সঙ্গে কথা বলেছি, ওনারা এলে আগে দেখবেন, এরপর সিদ্ধান্ত জানাবেন। চিকিৎসক মনে হয় আজ কিছুটা কম। এ কারণে অপেক্ষা করতে হচ্ছে।
অবশ্য জানা গেল, করোনা মহামারির সময় প্রাণ ফিরে পাওয়া চট্টগ্রামের এ হাসপাতালটিতে ডাক্তার সংকটের এই চিত্র আজকের না। লোকবলের ঘাটতি থাকা এ হাসপাতালের ২২ চিকিৎসকের সংযুক্তি বাতিল করায় এই সংকট তীব্র হয়েছে। গত ১৯ ফেব্রুয়ারি বদলি আদেশের পর ইতোমধ্যে তারা নতুন কর্মস্থলে চলে গেছেন।
চট্টগ্রামের এ জেনারেল হাসপাতাল দীর্ঘদিন অনেকটাই নিষ্প্রাণ ছিল। করোনা মহামারির শুরুর দিকে এটিকে করোনা চিকিৎসার জন্য ডেডিকেটেড করা হয়। ওই সময় আইসিইউর অভাবে যখন চারদিকে মৃত্যু বাড়ছিল, তখন এ হাসপাতালে জরুরি ভিত্তিতে ১০টি আইসিইউ শয্যা চালু করা হয়। পরে ১০ মাসের মাথায় শয্যা বাড়িয়ে ১৮টি করা হয়েছিল। চিকিৎসা চালু রাখতে নতুন লোকবল নিয়োগ দেওয়া হয় তখন। সংযুক্ত করা হয় ২২ জন ডাক্তারকে। ওই সময় চট্টগ্রামের মানুষের কাছে আশার বাতিঘরে পরিণত হয় এ হাসপাতাল। পরে করোনার প্রকোপ কমে গেলে আইসিইউর প্রয়োজনে অন্য রোগীরাও এ হাসপাতালকে বিকল্প হিসেবে বেছে নেয়। কিন্তু জনবলের অভাবে বহির্বিভাগ তো বটেই, এই হাসপাতালে আইসিইউ সেবাও এখন প্রায় বন্ধের পথে।
শুধু আইসিইউ নয়, হাসপাতালটিতে মেডিসিন ওয়ার্ড, অর্থোপেডিক্স সার্জারি, গাইনি ও শিশু বিভাগসহ বিভিন্ন বিভাগে চিকিৎসা নেন রোগীরা। চিকিৎসকরা জানান, কোভিডের আগে এই হাসপাতালে গড়ে রোগী থাকতেন ৭০-৮০ জন। কিন্তু কোভিডের সময় থেকে রোগী বেড়ে যায়। এখন দিনে গড়ে ১৫০ পর্যন্ত রোগী ভর্তি থাকে। বহির্বিভাগে সেবা নেয় প্রতিদিন হাজারেরও বেশি রোগী।
আইসিইউ ওয়ার্ডেও প্রতিদিন গড়ে রোগী ভর্তি থাকে ৫-৭ জন। হাসপাতালের ১৮ আইসিইউ শয্যার মধ্যে ৮টিতে বর্তমানে রোগী ভর্তি করানো হয়। কিন্তু এর মধ্যে ভেন্টিলেটর ঠিক রয়েছে মাত্র একটি শয্যার। বাকিগুলোতে শুধু অক্সিজেন ও অন্য প্যারামিটার সংযুক্ত রয়েছে। তাই এখানে জীবন রক্ষাকারী ব্যবস্থা দেওয়া অসম্ভব। চিকিৎসকরা জানান, এর মধ্যেও তারা সেবা দিয়ে যাচ্ছেন। অকেজো শয্যা ও ভেন্টিলেটর মেরামতের জন্য অধিদপ্তরকে জানানো হয়েছে।
আইসিইউ ও অ্যানেসথেসিওলজি বিভাগের সিনিয়র কনসালট্যান্ট রাজদ্বীপ বিশ্বাস বলেন, শয্যা ও ভেন্টিলেটর মেরামতের জন্য চিঠি দেওয়া হয়েছে। কিন্তু এখন মূল সংকট হয়ে গেছে চিকিৎসা কর্মকর্তা। হঠাৎ এত চিকিৎসক চলে যাওয়ায় ২৪ ঘণ্টা সেবা দেওয়া কঠিন হয়ে পড়েছে। কনসালট্যান্টরা পালা করে তা আপাতত সামাল দিচ্ছেন।
হাসপাতালটির তত্ত্বাবধায়ক মো. আবদুল মান্নান বলেন, ২২ জন চিকিৎসক একসঙ্গে চলে যাওয়ায় আমার এখানে স্বাভাবিকভাবেই সেবার ব্যাঘাত ঘটছে। আমরা ডাক্তার চেয়ে কর্তৃপক্ষের কাছে লিখেছি। যে পরিমাণ ডাক্তার বর্তমানে রয়েছেন, তা দিয়ে ২৪ ঘণ্টার আইসিইউ সেবাদান অসম্ভব হয়ে পড়েছে।
১০ বছর আগে জেনারেল হাসপাতালকে ১৫০ থেকে ২৫০ শয্যায় উন্নীত করা হয়, কিন্তু তখন এর জনবল বাড়ানো হয়নি। ২০২৪ সালের নির্ধারিত বিন্যাস অনুযায়ী, ২৫০ শয্যায় বর্তমানে ১৭৭ জন চিকিৎসক দরকার হয়। কিন্তু চিকিৎসক রয়েছেন ৪২ জন। এর মধ্যে কর্মকর্তার পদ ২০টি। এদের মধ্যে ৭ জন সহকারী রেজিস্ট্রার পদে আছেন। ৬ জনকে ২৪ ঘণ্টা জরুরি বিভাগ সামাল দিতে হয়। ৫ জন রয়েছেন বিভিন্ন বহির্বিভাগের সেবাদানে। এ ছাড়া একজন করে চিকিৎসা কর্মকর্তা প্যাথলজি, ইউনানি, ডেন্টাল ও কারা বিভাগের দায়িত্ব পালন করছেন।