ফরিদপুর সংবাদদাতা
প্রকাশ : ০৬ ডিসেম্বর ২০২২ ১২:৪০ পিএম
আপডেট : ০৬ ডিসেম্বর ২০২২ ১৩:২৭ পিএম
চলচ্চিত্রকার তারেক মাসুদের বাড়ি দেখতে এসেছেন দর্শনার্থীরা। ছবি : প্রবা
ফরিদপুরের ভাঙ্গা উপজেলার নুরপুরে ১৯৫৬ সালের ৬ ডিসেম্বর জন্মগ্রহণ করেন খ্যাতিমান চলচ্চিত্রকার তারেক মাসুদ। তার পুরো নাম আবু তারেক মাসুদ। ২০১১ সালের ১৩ আগস্ট মানিকগঞ্জের ঘিওর উপজেলার জোকায় এক মর্মান্তিক সড়ক দুর্ঘটনায় প্রাণ হারান তিনি।
বাংলাদেশের চলচ্চিত্রজগতের উজ্জ্বলতম নক্ষত্রের একটি তারেক মাসুদ। তিনি ছিলেন একাধারে চলচ্চিত্র পরিচালক, প্রযোজক, চিত্রনাট্যকার, লেখক ও গীতিকার। ২০০২ সালে মাটির ময়না তার প্রথম ফিচার চলচ্চিত্র। ওই বছর কান চলচ্চিত্র উৎসবে ডিরেক্টরস ফোর্টনাইটসহ বিভিন্ন আন্তর্জাতিক খ্যাতি অর্জন করেন তিনি।
২০১১ সালে সাংস্কৃতিক ব্যক্তিদের দাবির মুখে ও সরকারের আশ্বাসে তারেক মাসুদের ফরিদপুরের ভাঙ্গার নুরপুরের গ্রামের বাড়িসহ প্রায় দেড় একর জমি সরকারের ট্রাস্টে দেওয়া হয়। তবে এতদিনেও স্থানটিতে হয়নি কোনো স্থাপনা। অনেকটা অযত্ন-অবহেলা ও অনাদরে পড়ে আছে তারেক মাসুদের বাড়িটি। যার কারণে হতাশ তারেক মাসুদের পরিবার, দর্শনার্থী ও বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষ।
সরেজমিন দেখা যায়, বাড়িটির আঙিনাজুড়ে বুনো ঘাসপাতা জন্মেছে। দর্শনার্থীদের বসার বেঞ্চ কিংবা রেস্ট হাউস কিছুই নেই। দর্শনার্থীরা বাড়িটি দেখতে এসে রীতিমতো হতাশ হন। একটি পাবলিক টয়লেট পর্যন্ত নেই। তারেক মাসুদের ব্যবহৃত জিনিসপত্র ও বিভিন্ন সময়ে তার তোলা ছবিগুলোও দিনে দিনে নষ্ট হয়ে যাচ্ছে।
তারেক মাসুদের ছবি
তারেক মাসুদের ভাইয়ের স্ত্রী সম্পা মাসুদ প্রতিদিনের বাংলাদেশকে বলেন, ‘তারেক মাসুদের মৃত্যুর পর সরকারের আশ্বাসে ট্রাস্টে দেওয়া হয় পুরো বাড়িটি। কিন্তু প্রায় এক যুগ পেরিয়ে গেলেও দৃশ্যমান কোনো উন্নয়ন বা অগ্রগতি নেই।’
আক্ষেপ করে তিনি বলেন, ‘ভাঙ্গা গোলচত্বরের পাশে বাড়িটির অবস্থান। পদ্মা সেতু চালুর পর দর্শনার্থীর ভিড় বেড়েছে। কিন্তু দুঃখজনক ব্যাপার হচ্ছে, উন্নয়ন দূরে থাক, দর্শনার্থীদের জন্য একটি শৌচাগার, বসার বেঞ্চ পর্যন্ত নেই এখানে।’
তারেক মাসুদের ভাই মাসুদ বাবু প্রতিদিনের বাংলাদেশকে বলেন, ‘সরকার এখানে তারেক মাসুদের সংগ্রহশালা, মিউজিয়াম, গবেষণাগার, লাইব্রেরি, রেস্ট হাউস, পিকনিক কর্নারসহ নানা উদ্যোগের পরিকল্পনা গ্রহণ করে। সরকারের আশ্বাসেই পুরো বাড়িটি সরকারের ট্রাস্টে লিখে দেওয়া হয়। এগুলো বাস্তবায়নের জন্য সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয় থেকে জেলা-উপজেলায় চিঠিও দেওয়া হয়। কিন্তু তা এখন পর্যন্ত আলোর মুখ দেখেনি।’ এ বিষয়ে প্রধানমন্ত্রীর কাছে তিনি জোর দাবি জানান।
তারেক মাসুদের মা নুরুন নাহার মাসুদ বলেন, ‘আমার ছেলে মাটির ময়না, মুক্তির গানসহ অসংখ্য জনপ্রিয় চলচ্চিত্র নির্মাণ করেছে। সরকার ও দেশের কল্যাণে কাজ করলেও সরকারের কোনো সুযোগ-সুবিধা কখনও নেয়নি। কিন্তু আজ তার (তারেক মাসুদ) অনুপস্থিতিতে স্মৃতিগুলো নষ্ট হয়ে যাচ্ছে, হারিয়ে যাচ্ছে। আমার বয়স ৮০ বছর। আর কতদিনই বা বাঁচব। বেঁচে থাকতে যেন এ ট্রাস্টের বাস্তবায়ন দেখে যেতে পারি এটাই আমার শেষ চাওয়া।’
ভাঙ্গা জজ আদালতের আইনজীবী সমিতির সাবেক সভাপতি ইকরাম আলী শিকদার বলেন, ‘আসলে আমরা সবাই বিষয়টি অনুভব করি। কিন্তু সচিবালয় ও মন্ত্রণালয়ে তদবিরের অভাবে হয়তো কাজের উদ্যোগ ও গতি নেই।’
এ বিষয়ে তারেক মাসুদ ফাউন্ডেশনের আহ্বায়ক ও ভাঙ্গা কেএম কলেজের সাবেক অধ্যক্ষ মোসায়েদ হোসেন ঢালী বলেন, ‘অবহেলা ও গাফিলতির কারণে এখনও তারেক মাসুদের বাড়িটি আলোর মুখ দেখেনি। স্থানীয় রাজনৈতিক নেতাদের কাছে বারবার ধরনা দিলেও কাজের কাজ হয়নি কিছুই; যা সত্যিই বড় কষ্ট ও বেদনাদায়ক।’
ভাঙ্গা নাগরিক সমাজের আহ্বায়ক কমিটির সদস্য সুবাস চন্দ্র মণ্ডল বলেন, ‘তারেক মাসুদ ভাঙ্গার সন্তান হলেও তিনি বাংলাদেশের গর্ব। ভাঙ্গায় তারেক মাসুদের বাড়িটি অযত্নে পড়ে আছে। স্থানীয় প্রশাসনকে বারবার বলার পরও কোনো ফল হয়নি।’
ফরিদপুর তারেক মাসুদ ফিল্ম সোসাইটির সাধারণ সম্পাদক এইচএম মেহেদী হাসান প্রতিদিনের বাংলাদেশকে বলেন, ‘এটা বড় দুঃখজনক যে, আমরা এমন একজন আন্তর্জাতিক খ্যাতিসম্পন্ন চলচ্চিত্রকারের স্মৃতিটুকু হারাতে বসেছি। সংরক্ষণের অভাবে তারেক মাসুদের স্মৃতিগুলো নষ্ট হয়ে যাচ্ছে।’
ভাঙ্গা উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) মো. আজিম উদ্দিন বলেন, ‘এ-সংক্রান্ত বিষয়ে দ্রুত উদ্যোগ গ্রহণ করা হবে। চিঠির মাধ্যমে সংস্কৃতি মন্ত্রণালয়ে দ্রুত সময়ের মধ্যে উন্নয়ন বাস্তবায়নের বিষয়ে জোর সুপারিশ ও অনুরোধ জানানো হবে।‘
এ বিষয়ে জানতে ফরিদপুর-২ আসনের সংসদ সদস্য মো. মুজিবুর রহমান চৌধুরী নিক্সনের ফোন নম্বরে কল করা হলেও তিনি রিসিভ করেননি।