মোহন আখন্দ, বগুড়া
প্রকাশ : ২৭ মার্চ ২০২৫ ১২:৫০ পিএম
বগুড়ার শেরপুরের বেনারসি পল্লীর একটি তাঁতে ব্যস্ত কারিগর। সম্প্রতি তোলা। প্রবা ফটো
আঁকাবাঁকা মেঠোপথ ছেড়ে গ্রামে ঢুকতেই ভেসে আসে তাঁতের খট খট আওয়াজ। অবাঙালিদের (বিহারি) বসবাস বেশি বলে ঘোলাগাড়ি নামে ওই গ্রামটির সঙ্গে ‘কলোনি’ শব্দটি যুক্ত হয়ে নামকরণ হয়েছে ‘ঘোলাগাড়ি কলোনি’। তবে বেনারসি শাড়ি তৈরির কারণে গ্রামটি ‘বেনারসি পল্লী’ হিসেবে নতুন পরিচিত পেয়েছে।
বগুড়ার শেরপুর উপজেলা সদর থেকে ১০ কিলোমিটার দক্ষিণ-পশ্চিম ওই গ্রামটিতে ৫৫ পরিবারের বসবাস। এক ঘর পর পর বসেছে তাঁত। বাহারি রঙ আর নকশার বেনারসি শাড়ির বুননে ব্যস্ত সবাই। ঈদ মৌসুমে চাহিদা একটু বেশি। নির্দিষ্ট ডিজাইনে সোনালি, গোলাপি, নীল, হলুদ ও লাল রঙের সুতার সমন্বয়ে উৎপাদিত শাড়িগুলোর মধ্যে ‘টাইটানিক’, ‘জানেবাহার’ ও ‘বুটি’ নামের শাড়ির কদরই সবচেয়ে বেশি। এর মধ্যে বুটি শাড়ির দাম সবেচেয়ে বেশি। প্রতিটি শাড়ি বিক্রি হয় ৫ হাজার টাকা। এ ছাড়া অন্যগুলো ২ হাজার থেকে ৪ হাজার টাকায় কেনা-বেচা হয়।
তাঁত মালিকরা জানান, বছরের অন্য সময়ের তুলনায় ঈদকে কেন্দ্র করে উৎপাদন কিছুটা বাড়ে। চাহিদা থাকায় অন্য সময় বন্ধ থাকা তাঁতগুলোও চালু করা হয়। বতর্মানে ওই পল্লীর ৬০টি তাঁত চালু রয়েছে। যেখানে গড়ে দেড়শ কারিগর কাজ করছেন।
আহম্মদ আলী নামে এক কারিগর জানান, একটি শাড়ি তৈরি করতে গড়ে ৩ দিন লাগে। প্রতি মাসে সর্বোচ্চ ১০টি শাড়ি তৈরি করা সম্ভব হয়। সেই হিসেবে ওই পল্লীর ৬০টি তাঁতে প্রতি মাসে গড়ে ৬০০টি শাড়ি তৈরি হয়। স্থানীয় বাজারে তেমন চাহিদা না থাকায় ঢাকার মার্কেটগুলোতে বিক্রি করা হয়।
কারিগরদের বর্ণনা অনুযায়ী, ১৯৪৭ সালে ভারত ভাগাভাগির সময় বিহার প্রদেশ থেকে অবাঙালি ত্রিশ পরিবার এসে বসতি গড়ে শেরপুরের ঘোলাগাড়ি গ্রামে। প্রথম দিকে সবাই কৃষিকেই পেশা হিসেবে বেছে নেয়। তবে কেউ কেউ জীবিকার তাগিদে ঢাকায় পাড়ি জমান। কাজ নেন তাঁত পল্লীতে। তাদের একজন আব্দুল ওয়াহেদ। দীর্ঘদিন ঢাকার বেনারসি পল্লীতে কাজ করার পর ১৯৯৫ সালে ফিরে আসেন নিজ গ্রামে। সঙ্গে আনা দুটি তাঁত বাড়িতে বসিয়ে শুরু করেন শাড়ির উৎপাদন। পরের বছর আরও কয়েকটি পুরোনো তাঁত এনে বসানোর পর গ্রামের কয়েকজন যুবককে হাতে-কলমে প্রশিক্ষণ দেন।
সেই যে শুরু তারপর এ বাড়ি ও বাড়ি তাঁত বসতে শুরু করে। মাত্র ৫ বছরের মধ্যে ছোট্ট ওই গ্রামে প্রায় অর্ধশত তাঁত বসে। তবে ২০০২ সালে কাঁচামাল অর্থাৎ সূতার দাম অস্বাভাবিক বৃদ্ধি পাওয়ায় প্রতিযোগিতায় টিকতে না পেরে অধিকাংশ তাঁতি উৎপাদন বন্ধ রাখতে বাধ্য হন। অবশ্য তার চার বছরের মথায় স্থানীয় একটি ব্যাংকের দেওয়া ঋণকে পুঁজি করে বন্ধ হয়ে যাওয়া তাঁতগুলো আবার চালু হতে শুরু করে।
বেনারসি পল্লীর উদ্যোক্তা ও শাহবন্দেগী ইউনিয়ন প্রাথমিক তাঁতী সমিতির সভাপতি আব্দুল ওয়াহেদ জানান, বেনারসি শাড়ি সাধারণ কোনো শাড়ি নয়। মূলত বিয়ের অনুষ্ঠানে এসব শাড়ি পরা হয়। আর সে কারণেই নানা ডিজাইনে শাড়ি তৈরিতে সময়ও বেশি লাগে। ডিজাইন এবং মানভেদে প্রতিটি শাড়ির জন্য কারিগরদের ৬০০ থেকে সর্বোচ্চ ১ হাজার ২০০ টাকা মজুরি দেওয়া হয়। তিনি বলেন, ‘বগুড়ায় বেনারসি শাড়ির তেমন কোনো চাহিদা নেই। যে কারণে আমরা উৎপাদিত সব শাড়িই ঢাকায় বিক্রি করি।’