হুমায়ুন মাসুদ, চট্টগ্রাম
প্রকাশ : ২৬ মার্চ ২০২৫ ১২:০৬ পিএম
ছবি : সংগৃহীত
পানগাঁও রুটে এক বছরের ব্যবধানে কন্টেইনার পরিবহন ৯০ শতাংশ কমে যাওয়ায় ওই রুটে কন্টেইনার পরিবহন বাড়াতে নির্ধারিত ভাড়া বাতিল করে চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষ। গত মাসে নির্ধারিত ভাড়া বাতিল করা হলেও ওই রুটে কন্টেইনার পরিবহন এখনও বাড়েনি। আগের মতোই ওই রুটে কন্টেইনার পরিবহন মুখ থুবড়ে আছে বলে জানিয়েছেন সংশ্লিষ্টরা।
ঢাকার পানগাঁও-চট্টগ্রাম রুটে আগে একটি নির্ধারিত ভাড়া ছিল। ওই ভাড়া তুলনামূলক বেশি হওয়ায় এ পথে পণ্য পরিবহন কমিয়ে দেন ব্যবসায়ীরা। এতে কমতে থাকে কন্টেইনার পরিবহন। এক বছরের ব্যবধানে কন্টেইনার পরিবহন কমে যায় ২৪ হাজার ১৯১ টিইইউস। ২০২৩ সালে যেখানে ওই রুটে ২৬ হাজার ৮১৬ টিইইউস কন্টেইনার আনা-নেওয়া হয়। সেখানে ২০২৪ সালে ওই রুটে কন্টেইনার পরিবহন হয় মাত্র ২ হাজার ৬২৫ টিইইউস।
সি গ্লোরি শিপিং এজেন্সিজ লিমিটেডের ম্যানেজার মোহাম্মদ মঈনুল হোসাইন প্রতিদিনের বাংলাদেশকে বলেন, ‘পানগাঁও রুটে কন্টেইনার পরিবহন সচল করার জন্য চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষ অনেকগুলো উদ্যোগ নিচ্ছেন। এর মধ্যে একটি হলো তারা সম্প্রতি নির্ধারিত ভাড়া বাতিল করে ব্যবসায়ীদের দরকষাকষির মাধ্যমে ভাড়া নির্ধারণ করার সুযোগ তৈরি করে দিয়েছেন। এই সুযোগ অবারিত করার পরও আমরা তেমন সাড়া পাচ্ছি না।’
তিনি আরও বলেন, ‘মন্ত্রণালয় থেকে ভাড়া নির্ধারণ করে দেওয়ার পর আমরা ওই রুটে যেই পরিমাণ কন্টেইনার পরিবহন করেছিলাম; সেই পরিমাণ ব্যবসা আমরা এখন পাচ্ছি না। ভাড়া নির্ধারণ করা থাকা অবস্থায় ২০২১, ২০২২ সালে যেই পরিমাণ কন্টেইনার পরিবহন করেছিলাম; ২০২৩ সালের অক্টোবর থেকে আমরা সেই সাড়া পাচ্ছি না।’
আগে ২০ ফুট সাইজ কন্টেইনারের ভাড়া ১৪৮ মার্কিন ডলার এবং ৪০ ফুট সাইজের জন্য ৪৪৫ মার্কিন ডলার নির্ধারণ করে দিয়েছিল নৌপরিবহন মন্ত্রণালয়। ফেব্রুয়ারি মাসে এটি বাতিল করে দেওয়ায় এখন দুই পক্ষের দরকষাকষির মাধ্যমে নির্ধারিত হবে কন্টেইনার ভাড়া।
ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়কের ওপর পণ্য পরিবহনের চাপ কমাতে চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষ (চবক) ও বিআইডব্লিউটিএর যৌথ উদ্যোগে ২০১৩ সালে ১৫৪ কোটি টাকায় ঢাকার কেরানীগঞ্জে পানগাঁও অভ্যন্তরীণ কন্টেইনার টার্মিনালটি (আইসিটি) তৈরি করা হয়। ৩৫০০ কন্টেইনার ধারণক্ষমতার এই কন্টেইনার টার্মিনালে বার্ষিক কন্টেইনার হ্যান্ডলিং সক্ষমতা এক লাখ টিইইউসের বেশি। কিন্তু বাস্তবে অত্যধিক জাহাজ ভাড়া, কন্টেইনার পরিবহন ও পণ্য খালাসে দীর্ঘ সময়ের কারণে টার্মিনালটির সক্ষমতার বড় অংশ এখনও অব্যবহৃত। যে কারণে ওই রুটে বছর বছর কমছে কন্টেইনার পরিবহন।
চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষের তথ্য অনুযায়ী, তিন বছর আগে ২০২২ সালে পানগাঁও কন্টেইনার টার্মিনালে ১২৮টি জাহাজ হ্যান্ডলিং করা হয়। ওই জাহাজগুলোর বিপরীতে ওই বছর কন্টেইনার হ্যান্ডলিং হয় ২৬ হাজার ৫৭ টিইইউস কন্টেইনার। পরের বছর ২০২৩ সালে এটি অনেক বেড়ে যায়। ওই বছর ১৪৭টি জাহাজ হ্যান্ডলিং করার মাধ্যমে কন্টেইনার হ্যান্ডলিং করা হয় ২৯ হাজার ৯৩৫ টিইইউস। এরপর হঠাৎ করে পানগাঁও রুটে কন্টেইনার পরিবহন কমতে থাকে। ২০২৪ সালে ২১ জাহাজ হ্যান্ডলিং করার মধ্যদিয়ে ওই বছর পানগাঁও কন্টেইনার টার্মিনালে কন্টেইনার হ্যান্ডলিং হয় ২ হাজার ৯১১ টিইইউস। এর চলতি বছরের গত দুই মাসে মাত্র চারটি জাহাজ ওই রুটে চলাচল করে। এই চারটি জাহাজের বিপরীতে কন্টেইনার হ্যান্ডলিং হয় ৪৫৯ টিইইউস।
পানগাঁও রুটে কন্টেইনার পরিবহন কমে যাওয়ায় ওই রুটে চলাচলকারী জাহাজগুলোকে অলস বসে থাকতে হয়েছে। ওই রুটে জাহাজ পরিচালনাকারী প্রতিষ্ঠানগুলোর তথ্য অনুযায়ী, ওই রুটে কন্টেইনার পরিবহনের জন্য ২১টি জাহাজকে অনুমতি দেওয়া হলেও বর্তমানে ১৮টি জাহাজ কন্টেইনার পরিবহনে নিয়োজিত আছে। কিন্তু দিন দিন কন্টেইনার পরিবহন কমে যাওয়ায় এই জাহাজগুলোকে এখন অলস বসে থাকতে হচ্ছে। এতে কয়েক কোটি টাকা লোকসান গুনছেন জাহাজ মালিকরা।
বাংলাদেশ শিপিং এজেন্ট অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি সৈয়দ মোহাম্মদ আরিফ প্রতিদিনের বাংলাদেশকে বলেন, ‘নির্ধারিত ভাড়া বাতিল করার বিষয়টি আমাদের জানানো হয়েছে। আমরা মেইন লাইন অপারেটরকে সেটি জানিয়েছি। এখন তো ওয়ান ওয়ান ভিত্তিতে ভাড়া নির্ধারণ হবে। তাই আশা করছি, পানগাঁও রুটে কন্টেইনার পরিবহন বাড়বে।’
একই কথা জানিয়েছেন বন্দর কর্তৃপক্ষের সচিব ওমর ফারুক। প্রতিদিনের বাংলাদেশকে তিনি বলেন, ‘ভাড়া বেশি হওয়ায় এত দিন কন্টেইনার আমদানি-রপ্তানির ক্ষেত্রে বিদেশি কন্টেইনার পরিবহনকারী প্রতিষ্ঠান বা মেইন লাইন অপারেটররা তাদের রাউটিং নেটওয়ার্কে পণ্য সরবরাহের গন্তব্য পানগাঁও আইসিটিকে উল্লেখ করতে চাইতেন না। কিন্তু এখন নির্ধারিত ভাড়া বাতিল করা হয়েছে। তাই এখন এমএলও এবং পানগাঁওগামী জাহাজ মালিকদের মধ্যে দ্বিপাক্ষিক চুক্তি ও সমঝোতার মাধ্যমে ভাড়া নির্ধারিত হবে। এ কারণে এখন এই পথে আমদানি-রপ্তানি পণ্য পরিবহন উল্লেখযোগ্য হারে বাড়বে।’