আরেফিন লিমন, গলাচিপা (পটুয়াখালী)
প্রকাশ : ২৪ মার্চ ২০২৫ ১৫:৪৪ পিএম
গলাচিপা পৌর শহরের মাছ বাজারে প্রকাশ্যে বিক্রি হচ্ছে জাটকা। সম্প্রতি তোলা। প্রবা ফটো
দক্ষিণের জেলা পটুয়াখালীর উপকূলীয় উপজেলা গলাচিপা। এখানকার নদনদী একসময় ইলিশসহ নানা প্রজাতির মাছের প্রাচুর্যের জন্য বিখ্যাত ছিল। দিন দিন সেই নদীগুলোতে কমছে মাছ। বিশেষ করে নিষিদ্ধ জালে ইলিশের পোনা নিধনের কারণে ইলিশ উৎপাদন হুমকির মুখে। প্রশাসনের নিষেধাজ্ঞা, নামমাত্র অভিযান থাকলেও, অবৈধ জাল আর অসাধু চক্রের দৌরাত্ম্য যেন কোনোভাবেই বন্ধ করা যাচ্ছে না।
সরেজমিন দেখা গেছে, উপজলার আগুনমুখা, ডিগ্রি, দারচিড়া, রামনাবাদ, বুড়াগৌরাঙ্গ, তেঁতুলিয়া ও দাড়ভাঙ্গা নদীজুড়ে নিষিদ্ধ বাদাজাল, বেহুন্দি ও বেড়জাল ফেলে নির্বিচারে শিকার করা হচ্ছে ইলিশ, পোয়া, চিংড়িসহ বিভিন্ন প্রজাতির মাছের পোনা। দেশে মাছ ধরার জালের ফাঁসের অনুমোদিত পরিমাপ রয়েছে; সাড়ে ৫ সেন্টিমিটার (সংশোধিত আইন)। জালের ‘ফাঁস’-এর চেয়ে কম হলে তা আইন অনুযায়ী নিষিদ্ধ। বাদা, বেহুন্দি ও বেড়জাল সাড়ে ৫ সেন্টিমিটারের কম।
বাজারে গেলে দেখা যায়, এই ইলিশের পোনাগুলো ‘চাপিলা’ নামে বিক্রি হচ্ছে। কেউ কেউ আবার এগুলো শুঁটকি বানিয়ে বাজারজাত করছে। নিষেধাজ্ঞার তোয়াক্কা না করেই চলছে এসব কার্যক্রম। অথচ প্রতি বছর ইলিশের উৎপাদন বাড়াতে সরকার ১ মার্চ থেকে ৩০ এপ্রিল পর্যন্ত পাঁচটি অভয়াশ্রমে মাছ ধরা নিষিদ্ধ ঘোষণা করেÑ যা এ বছরও চলছে। কিন্তু গলাচিপার বিভ্ন্নি নদীতে চিত্র ভিন্ন। বরং অনেকটা অবাধেই চলছে মাছ শিকার। তা-ও আবার নিষেধাজ্ঞার মধ্যে, নিষিদ্ধ জালে।
গলাচিপা মৎস্য বিভাগ জানায়, চলতি বছর ১৫ মার্চ পর্যন্ত দুটি মোবাইল কোর্ট পরিচালিত হয়েছে। থানা পুলিশের সহায়তায় নৌবাহিনীর ১৭টি অভিযান চালানো হয়েছে। এতে ১.৫ লাখ মিটার কারেন্ট জাল, ৬০০ কেজি জাটকা এবং ২৪টি নিষিদ্ধ জাল জব্দ করা হয়েছে। কিন্তু স্থানীয়রা বলছেন ভিন্ন কথা। তাদের অভিযোগ, এই অভিযানগুলো প্রয়োজনের তুলনায় খুবই কম। অভিযানের পরও দিনের পর দিন নদীতে চলছে পোনা নিধনের মহোৎসব। গলাচিপা মৎস্য বিভাগের কিছু অসাধু কর্মকর্তা প্রতি মাসে জেলেদের কাছ থেকে অর্থ নিয়ে নিষিদ্ধ জাল ব্যবহারের সুযোগ করে দিচ্ছেন।
রতনদী তালতলী ইউনিয়নের বদনাতলী লঞ্চঘাট দীর্ঘদিন ধরে জাটকা পাচারের নিরাপদ রুট হিসেবে ব্যবহৃত হয়ে আসছে। স্থানীয়দের ভাষ্য, রাত যত গভীর হয়, এই ঘাটে তত বেশি বেড়ে যায় অবৈধ কার্যক্রমের মাত্রা। শক্তিশালী সিন্ডিকেটের মাধ্যমে এসব কার্যক্রম পরিচালিত হয়, যাদের রয়েছে রাজনৈতিক নেতাদের সঙ্গে সুসম্পর্ক। সম্প্রতি রতনদী তালতলী ইউনিয়নের কাটাখালী বাজার সংলগ্ন রুটে জাটকা ও কাচকি বোঝাই দুটি ট্রাক স্থানীয়রা আটক করে প্রশাসনকে খবর দেয়। সিনিয়র মৎস্য কর্মকর্তা মো. জহিরুন্নবী ও পুলিশ ঘটনাস্থলে এসে ট্রাক দুটি থানায় নিয়ে যায়। কিন্তু পরদিন সকালে মাছসহ ট্রাক ছেড়ে দেওয়া হয়। ততক্ষণে মাছগুলো পচে যায়। আর সেই সঙ্গে দোষীরাও পার পেয়ে যায়।
চরকাজল ও পানপট্টি ইউনিয়নের একাধিক জেলে নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, ‘নিষেধাজ্ঞা থাকা সত্ত্বেও মৎস্য বিভাগের পর্যাপ্ত নজরদারি নেই। প্রশাসনের চোখ ফাঁকি দিয়ে বিভিন্ন গ্রাম-গঞ্জের হাটবাজারে জাটকা ও ইলিশের পোনা বিক্রি হচ্ছে। কেউ কেউ শুঁটকি বানিয়ে সরবরাহ করছে, যা প্রশাসন দেখেও না দেখার ভান করছে।
তারা আরও বলেন, চরবিশ্বাস এলাকার চর বাংলার তেঁতুলিয়া নদীর উত্তর ও দক্ষিণ প্রান্তে আফজাল, রাজ্জাক মৃধা, জহিরুল, ইসমাইল, শাহা তালুকদার ও তাদের লোকজন উপকূলীয় অঞ্চলে প্রায় ৫০টি বেহুন্দি জাল পাতে। গলাচিপা মৎস্য বিভাগ প্রতি বেহুন্দি জাল থেকে প্রতি মাসে এক হাজার টাকা করে জেলেদের কাছ থেকে আদায় করে বলে অভিযোগ। এ ছাড়া চরবিশ্বাস এলাকার তেঁতুলিয়া নদীর উত্তর ও দক্ষিণ প্রান্তে প্রায় ৫০টি বেহুন্দি জাল ফেলা হয়। স্থানীয় কিছু প্রভাবশালী ব্যক্তি এর সঙ্গে জড়িত, যাদের ছত্রছায়ায় চলে মাছ শিকার ও পাচারের এই অবৈধ কর্মকাণ্ড।
বাংলাদেশ ক্ষুদ্র মৎস্যজীবী জেলে সমিতির গলাচিপা শাখার সভাপতি জাকির হোসেন বলেন, মৎস্য অফিসারের বিরুদ্ধে অনেক অভিযোগ আছে। আমরা নিষিদ্ধ জাল ধরলেও তিনি অভিযানে আসেন না।
প্রাণী কল্যাণ ও পরিবেশবাদী সংগঠন এনিম্যাল লাভার্স অব পটুয়াখালীর টিম লিডার সোহেল হোসেন রাসেল বলেন, এভাবে পোনা মাছ নিধন চলতে থাকলে আগামী কয়েক বছর ইলিশের উৎপাদন ভয়াবহভাবে কমে যাবে। নিষিদ্ধ জালের ব্যবহার বন্ধ না হলে এবং মৎস্য বিভাগ কার্যকর পদক্ষেপ না নিলে ভবিষ্যতে ইলিশ সংকট আরও প্রকট হবে। কেবল অভিযান নয়, প্রশাসনকে কঠোরভাবে নজরদারি বাড়াতে হবে। পাশাপাশি জেলেদের খাদ্যসহায়তার পরিমাণ বাড়াতে হবে। তাদের জন্য বিকল্প কর্মসংস্থানেরও ব্যবস্থা করতে হবে।
অভিযোগ অস্বীকার করে উপজেলা সিনিয়র মৎস্য কর্মকর্তা মো. জহিরুন্নবী বলেন, গলাচিপায় জাটকা নিধন হচ্ছে না। যদি কোনো অবৈধ মাছ ধরা হয়, তবে তা পার্শ্ববর্তী রাঙ্গাবালী উপজেলার নদী থেকে আসতে পারে। তবে একই সঙ্গে তিনি স্বীকার করেন, বিভিন্ন নদীতে কিছু পরিমাণে জাটকা নিধনের ঘটনা ঘটছে। আমারা অভিযান পারিচালনা করছি। কিন্তু কিছু এলাকা দুর্গম হওয়ায় অভিযান পারিচালনা করা সম্ভব হয়নি।