মিলাদ হোসেন অপু, ভৈরব (কিশোরগঞ্জ)
প্রকাশ : ২০ মার্চ ২০২৫ ১১:৪৯ এএম
কিশোরগঞ্জের ভৈরবের একটি পাদুকা কারখানায় কাজ করছে শ্রমিকরা। প্রবা ফটো
ঈদের মৌসুমেও কিশোরগঞ্জের ভৈরবের পাদুকা শিল্পে দেখা দিয়েছে মন্দা ভাব। কয়েকটি কারখানায় কিছু শ্রমিক কাজে ব্যস্ত থাকলেও তাদের মনে নেই ঈদের আনন্দ। উপজেলার ও পৌর শহরের গ্রামের আনাচে-কানাচে গড়ে ওঠা ৫০-৬০টি পাদুকা পল্লির ৫ থেকে ৬ হাজার কারখানা রয়েছে। এসব কারখানায় লক্ষাধিক শ্রমিক দিনে-রাত কাজ করছে। আসন্ন ঈদে পাদুকার চাহিদা অনেক কম বলে জানিয়েছেন পাইকারি ও খুচরা ব্যবসায়ী।
খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, ভৈরবে ৪২টির ফুটওয়্যার কারখানাসহ ছোটবড় ৫-৬ হাজার প্রতিষ্ঠান রয়েছে। এসব কারখানায় নারী শ্রমিকের সংখ্যা প্রায় ৫০ হাজার ও পুরুষ শ্রমিক রয়েছে লক্ষাধিক। ছয়টির মতো বৃহত্তর পাইকারি মার্কেট এবং ৫০টিরও বেশি পাদুকা শিল্প পল্লি নিয়ে এখানে গড়ে উঠেছে একটি বড় কর্ম ও অর্থনৈতিক বলয়। যেখানে প্রতিটি কারখানায় প্রতিদিন দৃষ্টিনন্দন শত শত জোড়া পাদুকা তৈরি হচ্ছে।
সরেজমিন দেখা গেছে, ঈদকে কেন্দ্র করে কর্মমুখর এসব পাদুকা কারখানা। প্রতিটি কারখানায় বিরতিহীন চলছে নানা রঙ, সাইজ ও ডিজাইনের পাদুকা তৈরির কাজ। ডিজাইন, সেলাই, কাটিং, সোল তৈরি, পেস্টিং, রঙ করা, সলিউশন করা, আপার তৈরি, ফিতায় বেণি করা, বাক্স তৈরি ইত্যাদি বিভিন্ন রকম কাজের ভিন্ন ভিন্ন কারিগররা যার যার কাজ নিয়ে ভীষণ ব্যস্ত। কারিগরের দক্ষতায় এখানে তৈরি পাদুকার সুনাম কুড়িয়েছে দেশের বিভিন্ন জেলায়। সনাতন পদ্ধতির পাশাপাশি এ শিল্পে সংযোজন হয়েছে আধুনিক অটোমেশিন। যেখানে প্রতিদিন তৈরি হচ্ছে রপ্তানিযোগ্য শত শত জোড়া পাদুকা। এখানে সৃষ্টি হয়েছে দেশের অন্যতম বৃহৎ পাদুকা শিল্পের বাজার।
ব্যবসায়ীরা বলছেন, সারা দেশের অর্থনৈতিক মন্দার কারণেই বিক্রি অনেকটা কমে গেছে। ঈদ উপলক্ষে বিক্রির টার্গেট পূরণ করতে পারবেন এমনটা আশাবাদী তারা। ব্যবসায়ী সালাম মিয়া বলেন, অন্যান্য বছরের তুলনায় এ বছর পাদুকা এখনও তেমন বিক্রি হচ্ছে না। রোজার আগে কিছুটা বিক্রি বাড়লেও রোজার মধ্যে বাজারে থমকে রয়েছে। তবে ঈদের আগে বিক্রি বাড়বে বলে জানান তিনি।
আরেক ব্যবসায়ী আবুল কাসেম বলেন, পাদুকা টেকসই ও গুণগতমান ভালো হওয়ায় ভৈরবের পাদুকার চাহিদা সারা দেশেই রয়েছে। বাচ্চাদের পাদুকার চাহিদা অনেক বেশি। মেশিনে তৈরি পাদুকা থেকে হাতে তৈরি পাদুকার সুনাম রয়েছে।
শ্রমিকরা জানান, রমজানের সিজনে মালিকদের কাছ থেকে অতিরিক্ত টাকা নিতে পারতাম। কিন্তু এবার আমরা হতাশায় রয়েছি। জনবলও কম ও মালিকরা অধিক পুঁজি বিনিয়োগ করতে না পারায় উৎপাদন অনেক কমে গেছে।
এদিকে গত বছর কেমিক্যাল ও কাঁচামাল সংকটে ছিল কারখানার মালিকরা। যাদের মজুদকৃত কিছু কেমিক্যাল ও কাঁচামাল ছিল তারাই কিছুটা লাভবান হতে পেরেছিল। তবে এ বছর কারখানগুলোতে দক্ষ কারিগর সংকট রয়েছে।
ঈগল ফুটওয়্যার কারখানার মালিক রাশেদুজ্জামান বলেন, এ বছর শীতকাল ও ঈদ পাশাপাশি সময় হওয়ায় পাদুকার চাহিদা অনেক খানি কম। শীতের পাদুকা এখনও বিভিন্ন দোকানে অবিক্রীত রয়েছে। পাশাপাশি ঈদের সিজনও শুরু হয়ে গেছে। এখানে দক্ষ শ্রমিক তৈরি করার জন্য আধুনিক প্রশিক্ষণ কেন্দ্র দরকার। দেশের গণ্ডি পেরিয়ে বিদেশেও ভৈরবের ৫ থেকে ৭টি ফ্যাক্টরির পাদুকা রপ্তানি হচ্ছে।
মো. শরিফুল, হাসান মিয়া, আনার মিয়া নামে কয়েকজন ক্রেতা জানান, গত বছরের তুলনায় এবার দাম প্রতি জোড়াতে ৫০-১০০ টাকা বেড়েছে। আগে ১ লাখ টাকা দিয়ে যে পরিমাণ কিনতে পারতাম এবার অর্ধেক নিতে হচ্ছে।
ভৈরব পাদুকা ব্যবসায়ী সমবায় সমিতির সভাপতি মো. আল আমিন মিয়া বলেন, করোনার পর থেকে প্রতিবছর কোনো না কোনো কারণে ভৈরবে পাদুকা শিল্প বিপর্যয়ে সম্মুখীন হতে হচ্ছে। বিগত বছরগুলোর তুলনায় এ বছর ব্যবসা অনেকটা কমে গেছে। পাদুকা শিল্পেরও সব কেমিক্যালসহ কাঁচামাল দাম বৃদ্ধি পেয়েছে। বস্ত্র শিল্পের পাশাপাশি পাদুকা শিল্পেও সরকারের আন্তরিকতা প্রয়োজন।
শিল্পটিকে বাঁচিয়ে রাখতে ভৈরবে একটি কমন ফ্যাসিলিটি কেন্দ্র নির্মাণের দাবি জানান তিনি। ভৈরব বিশাল সম্ভাবনাময় পাদুকা শিল্পকে টিকিয়ে রাখতে হলে এখানকার উৎপাদিত পাদুকা বিদেশে রপ্তানি করার সুযোগ করতে হবে বলেও জানান ব্যবসায়ী নেতা আল আমিন মিয়া।
জানতে চেইলে ইউএনও শবনম শারমিন বলেন, ভৈরবে পাদুকা শিল্পের সঙ্গে জড়িত ২ লাখেরও বেশি মানুষ। এটি ভৈরব তথা দেশের অর্থনীতিতে অবদান রাখছে। এই শিল্পের উন্নতির জন্য সব ধরনের সহযোগিতার আশ্বাস দেন তিনি।