হুমায়ুন মাসুদ, চট্টগ্রাম
প্রকাশ : ২০ মার্চ ২০২৫ ০৯:৪৯ এএম
ছবি : সংগৃহীত
‘চার পাঁচ বছর আগেও সকালে পান্তাভাত খেয়েছি। কিন্তু এখন সকালের নাশতায় রুটি বা পরোটাই খাওয়া হয়।’ সকালের খাবারে নিজের পরিবারের এই পরিবর্তনের কথা জানান ফেনী সদরের বাসিন্দা আনোয়ার হোসেন। প্রতিদিনের বাংলাদেশকে তিনি বলেন, ‘শুধু সকালেই নয়, এখন বিকালেও বাসায় আটা দিয়ে বিভিন্ন ধরনের নাশতা তৈরি হয়।’
শুধু আনোয়ার হোসেনের পরিবারই নন, দেশের অনেক পরিবারেই সকালের খাদ্যতালিকায় ভাতের স্থান নিয়েছে রুটি বা পরোটা। মানুষের দৈনন্দিন এই খাদ্যাভ্যাসের পরিবর্তনে বাজারে আটা ও ময়দার চাহিদা বেড়েছে। আর গম থেকে আটা, ময়দা তৈরি হয় বিধায় বাজারে এ দুটি পণ্যের সঙ্গে বেড়েছে গমের চাহিদাও।
বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিএস) হাউসহোল্ড ইনকাম অ্যান্ড এক্সপেনডিচার সার্ভে ২০২৩ অনুযায়ী, ২০০৫ সাল থেকে প্রতি বছর ধারাবাহিকভাবে মাথাপিছু গমের ব্যবহার বাড়ছে। বর্তমানে জাতীয় পর্যায়ে মাথাপিছু দৈনিক গমের ব্যবহার ২২ দশমিক ১১ গ্রাম। যা ২০১৬ সালে ছিল ১৯ দশমিক ৮ গ্রাম। তার আগে ২০০৫ সালে মাথাপিছু দৈনিক গমের ব্যবহার ছিল ১২ দশমিক ১ গ্রাম।
গমের ব্যবহার বাড়ার কারণÑ খাদ্যাভ্যাসে পরিবর্তন ও স্বাস্থ্য সচেতনতা। সময়, আয় ও জীবনযাত্রার মানের পরিবর্তন এর পেছনে কাজ করছে বলেও জানিয়েছেন সংশ্লিষ্টরা। কারণ সময়, আয় ও জীবনমানের পরিবর্তনে আগের যেকোনো সময়ের তুলনায় দেশে বেকারি পণ্যের চাহিদা অনেক বেশি।
চট্টগ্রাম সমুদ্রবন্দর দিয়ে গম আমদানির তথ্য বিশ্লেষণে দেখা যায়, চার বছর ধরেই ধারাবাহিকভাবে গম আমদানি বেড়েছে। উদ্ভিদ সংঘ নিরোধ চট্টগ্রাম কেন্দ্রের তথ্য অনুযায়ী, ২০২০-২১ অর্থবছরে গম আমদানি হয়েছে ৪১ লাখ ৯৮ হাজার ৪১৫ মেট্রিক টন। এর পরের বছর ২০২১-২২ অর্থবছরে কিছুটা কমে গম আমদানি হয়েছে ৩৮ লাখ ৩১ হাজার ১৪৪ মেট্রিক টন। ২০২২-২৩ অর্থবছরে আমদানি হয়েছে ৪৪ লাখ ৭৭ হাজার ৮৪৩ মেট্রিক টন। সর্বশেষ ২০২৩-২৪ অর্থবছরে আমদানি হয়েছে ৬৩ লাখ ৯০ হাজার ৭৯৮ মেট্রিক টন।
জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের তথ্য অনুযায়ী, ২০১৮-১৯ অর্থবছর গম আমদানি হয় ৫৫ লাখ ৩৬ হাজার মেট্রিক টন ও ২০১৭-১৮ অর্থবছর ৪৫ লাখ ৫ হাজার মেট্রিক টন। তার আগের (২০১৬-১৭) অর্থবছর দেশে গম আমদানির পরিমাণ ছিল ৫৬ লাখ ৯ হাজার মেট্রিক টন, ২০১৫-১৬ অর্থবছর ৪১ লাখ ৯৯ হাজার মেট্রিক টন ও ২০১৪-১৫ অর্থবছর ৩৮ লাখ ৪১ হাজার মেট্রিক টন।
এর আগের তিন বছর গম আমদানির পরিমাণ আরও কম ছিল। এর মধ্যে ২০১৩-১৪ অর্থবছর গম আমদানি করা হয় ২৬ লাখ ৭৭ হাজার মেট্রিক টন, ২০১২-১৩ অর্থবছর ১৭ লাখ ১৫ হাজার মেট্রিক টন ও ২০১১-১২ অর্থবছর ১৬ লাখ ৬১ হাজার মেট্রিক টন। তবে ২০১০-১১ অর্থবছর গম আমদানি করা হয়েছিল ৩৫ লাখ ৯৬ হাজার মেট্রিক টন, ২০০৯-১০ অর্থবছর ৩৩ লাখ ৫৮ হাজার মেট্রিক টন ও ২০০৮-০৯ অর্থবছর ২৩ লাখ ২৪ হাজার মেট্রিক টন।
মানুষের খাদ্যাভ্যাসের পরিবর্তনে গমের চাহিদা বাড়ছে জানিয়েছেন ফুলকলি ফুড প্রোডাক্টস লিমিটেডের সহকারী মহাব্যবস্থাপক (মার্কেটিং) আবু সালেহ চৌধুরী। প্রতিদিনের বাংলাদেশকে তিনি বলেন, ‘খাদ্যাভ্যাসে পরিবর্তনের কারণে দিন দিন বেকারি পণ্যের চাহিদা বাড়ছে। চাহিদা আছে বিধায় এখন বড় বড় শিল্প প্রতিষ্ঠান বিস্কুটসহ বেকারি পণ্য উৎপাদনে আসছে। যারা এই ব্যবসায় নতুন আসছে তাদের প্রত্যেকের একটা সেল আছে। আবার আগে থেকে যারা বেকারি পণ্যের ব্যবসার সঙ্গে জড়িত, তাদেরও দিন দিন বিক্রির পরিমাণ বাড়ছে। বিক্রি বাড়ছে মানেই বেকারি পণ্যের চাহিদা বাড়ছে। বেকারি পণ্যের চাহিদা বাড়ায় গমের চাহিদাও বাড়ছে। কারণ গম থেকেই তো বেকারি পণ্যের কাঁচামাল আটা-ময়দা পাওয়া যায়।’
তিনি আরও বলেন, ‘১৯৮৬ সালে এসএসসি পাস করি। ওই সময় আমরা পান্তাভাত খেয়ে স্কুলে যেতাম। কিন্তু এখন আমার মেয়েদের যদি পান্তাভাতের কথা বলি, তারা চিনবেও না। বিগত দুই দশকে মানুষের জীবনযাত্রায় অনেক পরিবর্তন হয়েছে। মানুষ অর্থনৈতিকভাবে স্বাবলম্বী হয়েছে, যে কারণে ভাতের পরিবর্তে স্ন্যাক জাতীয় খাবারের প্রতি জোর দিচ্ছে। এসব কারণে দিন দিন আটা, ময়দা জাতীয় পণ্যের চাহিদাও বাড়ছে।’