ফয়সাল আহম্মেদ, টাঙ্গাইল
প্রকাশ : ১৯ মার্চ ২০২৫ ১০:৪৫ এএম
আপডেট : ১৯ মার্চ ২০২৫ ১১:২০ এএম
উদ্বোধন হলো যমুনা রেলসেতু। প্রবা ফটো
রায়হান হোসেন ঢাকায় একটি সরকারি প্রতিষ্ঠানে চাকরি করেন। তার পরিবার রাজশাহীতে থাকায় প্রতি সপ্তাহে তাকে ঢাকা থেকে রাজশাহী যাতায়াত করতে হয়। আগে সকালের ট্রেনে রওনা দিয়ে অফিস করা সম্ভব হতো না, ফলে এক দিন ছুটি নিয়ে ঢাকায় ফিরতে হতো। এতে পরিবারের সঙ্গে সময় কাটানোর সুযোগ কমে যেত। তবে এখন রেল ব্রিজ চালু হওয়ায় রাজশাহী থেকে রওনা দিয়েও ঢাকায় অফিস করা সম্ভব হবে। রায়হানের মতো উত্তরবঙ্গের ১৬ জেলার মানুষের দীর্ঘ প্রতীক্ষার অবসান হয়েছে যমুনা রেলসেতুর উদ্বোধনের মাধ্যমে।
মঙ্গলবার (১৮ মার্চ) সকালে যমুনা রেলসেতুর পূর্ব প্রান্তের ইব্রাহিমাবাদ রেলস্টেশন থেকে ফলক উন্মোচন, ফিতা কেটে ও বেলুন উড়িয়ে সেতুটির আনুষ্ঠানিক উদ্বোধন করেন রেলপথ মন্ত্রণালয়ের সচিব এম ফাহিমুল ইসলাম। উদ্বোধনী ট্রেনটি দুপুর ১২টা ৬ মিনিটে সেতু পাড়ি দিয়ে সিরাজগঞ্জের সয়দাবাদ রেলস্টেশনে পৌঁছে ১২টা ১৯ মিনিটে। এখানেই একটি সংবাদ সম্মেলন অনুষ্ঠিত হয়।
উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে বিশেষ অতিথি ছিলেন বাংলাদেশে নিযুক্ত জাপানি রাষ্ট্রদূত সাইদা সিনিচি এবং জাইকার দক্ষিণ এশীয় আঞ্চলিক মহাপরিচালক মি. ইতো তেবুয়েকি। এই সেতু চালু হওয়ায় উত্তর-দক্ষিণ ও পশ্চিমাঞ্চলের সঙ্গে ঢাকার রেল যোগাযোগ আরও সহজ হলো। উদ্বোধনী ট্রেনে দুটি লোকোমোটিভ ইঞ্জিন, ৬টি কোচ (২টি এসি চেয়ার, ১টি শোভন কোচ, ১টি ডাইনিং কার ও ১টি পাওয়ার কার) ছিল।
রেলপথ সচিব জানান, যমুনা বহুমুখী সেতু ১৯৯৮ সালে চালু হলেও রেলের জন্য আলাদা সেতুর প্রয়োজনীয়তা অনুভূত হয়। এ কারণে নতুন এই ডেডিকেটেড রেলসেতু নির্মাণ করা হয়েছে। আগে সেতু দিয়ে ট্রেনের গতি ছিল ঘণ্টায় ২০ কিলোমিটার, যা এখন বেড়ে ১২০ কিলোমিটার হয়েছে। সেতু পার হতে সময় লাগবে মাত্র ৩ মিনিট। ডাবল লাইন চালু হওয়ায় ঢাকা থেকে উত্তরবঙ্গের জেলাগুলোতে রেল যোগাযোগ আরও গতিশীল হবে। এছাড়া পণ্যবাহী ট্রেনও চলাচল করতে পারবে, যা রেলের আয় বৃদ্ধিতে ভূমিকা রাখবে।
সেতুটি নির্মাণে মোট ব্যয় হয়েছে ১৬ হাজার ৭৮০. ৯৫ কোটি টাকা। এর মধ্যে জাপান ইন্টারন্যাশনাল কো-অপারেশন এজেন্সি (জাইকা) ৭২.৪০% অর্থায়ন করেছে। সেতুর মোট দৈর্ঘ্য ৪.৮ কিলোমিটার, পিলার সংখ্যা ৫০টি এবং স্প্যান ৪৯টি। প্রকল্পটি ২০২৫ সালের ৩১ ডিসেম্বর পর্যন্ত চলবে।
যমুনা রেলসেতু চালু হওয়ায় ঢাকা থেকে রাজশাহী ও রংপুর বিভাগের রেলযাত্রার সময় ৩০ মিনিটেরও বেশি কমবে। এছাড়া ট্রান্স এশিয়ান রেল নেটওয়ার্কের সঙ্গে যুক্ত হওয়ার ক্ষেত্রেও এই সেতু গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে বলে জানান রেলপথ সচিব।
এই সেতু দিয়ে ট্রেন চলাচলের জন্য বিশেষ পন্টেজ চার্জ প্রযোজ্য হবে, যা আগের চেয়ে ২৫ গুণ বেশি। যাত্রীদের সেবার মান উন্নয়নে নতুন কোচ ও লোকোমোটিভ কেনার প্রকল্পও নেওয়া হয়েছে। রেলপথ মন্ত্রণালয়ের তথ্য অনুযায়ী, সেতুটি পুরোপুরি ব্যবহার করতে ঈশ্বরদী-জয়দেবপুর ডাবল লাইন নির্মাণের পরিকল্পনাও রয়েছে।
যমুনা রেলসেতু চালু হওয়ায় উত্তরবঙ্গের মানুষের যাতায়াত ও পণ্য পরিবহনে সুবিধা বাড়বে, যা অর্থনৈতিক উন্নয়নে রাখবে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা।
(প্রতিবেদনটি তৈরিতে সহযোগিতা করেছে অরণ্য ইমতিয়াজ, টাঙ্গাইল ও সুজিত সরকার, সিরাজগঞ্জ)