বরেন্দ্র বহুমুখী উন্নয়ন প্রকল্প
শাহিনুর সুজন, চারঘাট (রাজশাহী)
প্রকাশ : ১৭ মার্চ ২০২৫ ১৩:২৫ পিএম
বরেন্দ্র বহুমুখী উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ সেচসুবিধা নিশ্চিত করার জন্য খাল খনন করলেও অনিয়মের সুফল পায়নি কৃষক। চারঘাটের পিরোজপুর গ্রামে পানিশূন্য খালের স্লুইসগেট। প্রবা ফটো
বরেন্দ্র বহুমুখী উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ (বিএমডিএ) কৃষকের সেচসুবিধা নিশ্চিত করার জন্য খাল খনন প্রকল্প হাতে নিয়েছিল। সম্পন্নও করা হয়েছে এটি। কিন্তু যে উদ্দেশ্য নিয়ে প্রকল্প বাস্তবায়ন করা হয়েছে, তার সুফল পাচ্ছে না কৃষক। দুই-তিন বছর না যেতেই খনন করা সেই খাল তিন উপজেলার কৃষকের গলার কাঁটায় পরিণত হয়েছে। অনিয়ম-দুর্নীতির ঘেরাটোপে পড়ায় খাল খনন সুফল বয়ে আনতে পারেনি। দুর্নীতির কারণে ভেস্তে গেছে প্রকল্পের উদ্দেশ্য। ফলে বর্ষা মৌসুমে জলাবদ্ধতায় বিপর্যস্ত হচ্ছেন কৃষক। অন্যদিকে শুকনো মৌসুমে পানির অভাবে কৃষকরা ক্ষেতে সেচ দিতে না পেরে দিশেহারা। বিএমডিএ এর প্রকল্প একসময় আশার আলো দেখিয়েছিল। কিন্তু সেটাই এখন কৃষকের জন্য দুশ্চিন্তার কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে।
উল্লেখ্য, বিএমডিএ এর প্রকল্পের হলো ‘রাজশাহী জেলার বাঘা, চারঘাট ও পবা উপজেলার জলাবদ্ধতা নিরসন এবং ভূ-উপরিস্থ পানির প্রাপ্যতা বৃদ্ধির মাধ্যমে সেচসুবিধা সম্প্রসারণ।’ এটি বাস্তবায়নে খরচ হয়েছে ২৫ কোটি ৬০ লাখ টাকা। কিন্তু এই টাকা কৃষকের কোনো উপকারেই আসেনি। বরং এ টাকা নষ্ট হয়েছে বলে কৃষকরা মনে করেন। প্রকল্পের আওতায় বাঘা উপজেলার মুর্শিদপুর থেকে নওটিকা পর্যন্ত ৮ দশমিক ২০ কিলোমিটার, চারঘাট উপজেলার মেরামতপুর কাঁকড়ামারী বিল থেকে পিরোজপুর পদ্মা নদী পর্যন্ত ২ দশমিক ১০ কিলোমিটার ও চারঘাটের ইউসুফপুর পদ্মা নদী থেকে পবা উপজেলার কাঁটাখালি হয়ে ছত্রগাছি পর্যন্ত ১১ দশমিক ২০ কিলোমিটার খাল খনন করা হয়। এ খনন প্রকল্পের কাজ শুরু হয়েছিল ২০১৯ সালে ২৪ মে। খনন কাজ ২০২১ সালের শেষের দিকে শেষ হয়েছে।
বিএমডিএ সূত্রে জানা যায়, এই প্রকল্পের আওতায় ২১ দশমিক ৫০ কিলোমিটার খাল খনন, এক হাজার ৫৩৫ কিলোমিটার খালের পাড়ে রিটেইনিং ওয়াল নির্মাণ, খালের ওপরে চারটি ফুট ওভারবিজ, ২০টি সৌরচালিত পাতকুয়া ও ১০টি সৌর এলএলপি স্থাপন করা হয়। খালের পাশে লাগানো হয় ৮ হাজারটি ফলদ ও বনজ চারা। এর উদ্দেশ্য ছিল জলবদ্ধতা দূর করা এবং সেচ সুবিধা সুনিশ্চিত করে এক হাজার ৬০০ হেক্টর জমি ফসলাদি চাষাবাদের আওতায় নিয়ে আসা।
প্রকল্পের আওতায় থাকা তিন উপজেলার খালপাড়ের কৃষকেরা বলছেন, স্থানীয় জনগণের মতামত না নিয়েই কোটি কোটি টাকার এই প্রকল্প বাস্তবায়ন করা হয়েছে। জনমত জরিপের তোয়াক্কা না করেই নেওয়া সিদ্ধান্ত, যা এখন দুর্ভোগের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। বাঘা ও চারঘাটের কৃষকেরা খাল খননের বিরোধিতা করেছিলেন। কিন্তু তাতে লাভ হয়নি। বরং বাধা দেওয়ায় কৃষকরা মামলা ও হামলার শিকার হয়েছেন। বর্তমানে খনন করা সেই খালগুলো ভরাট হয়ে গেছে। বর্ষায় পানি প্রবাহিত হয় না। শুকনো মৌসুমে পানির অভাবে ফসল উৎপাদন ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। যদিও ফসলের মাঠের পাশেই রয়েছে খাল। কিন্তু মরা ও ভরাট খাল দিয়ে সেচের কাজ চলে না। চলবে কীভাবে যদি শুকনো মৌসুমে তাতে পানিই না থাকে। ফলে বিএমডিএর প্রকল্প একটা সময় কৃষকদের যে স্বপ্ন দেখিয়েছিল, বাস্তবে সেই স্বপ্নপূরণ হয়নি। বরং দুঃস্বপ্ন বয়ে নিয়ে এসেছে।
তবে বিএমডিএ কর্তৃপক্ষ বলছে, ‘এলাকায় জরিপ করেই এই প্রকল্প অনুমোদন করা হয়েছিল। এটি অনুমোদনের আগে জলাবদ্ধতা শিকার এলাকার মানুষ তাদের দুর্ভোগের কথা বলেছেন। তাদের দুর্ভোগ লাঘবে প্রকল্পটি বাস্তবায়ন করা হয়েছে।’ সরেজমিন চারঘাট উপজেলার মেরামতপুর, কাঁকড়ামারী বিল, পিরোজপুর-পদ্মা নদী খাল এলাকায় গিয়ে দেখা যায়, পদ্মা নদীর অংশে খালের কোনো অস্তিত্ব নেই। সরু খাল খনন করে তার ওপরে পাটাতন দিয়ে পিচঢালা সড়ক নির্মাণ করা হয়েছে। এখন সেই খাল পরিণত হয়েছে ড্রেনের মতো সরু গর্তে, যেখানে ময়লা-আবর্জনা ও মাটি পড়ে এক পানি বিন্দুও প্রবাহের সুযোগ নেই।
পিরোজপুর এলাকার কৃষক মামুন রানা বলেন, ‘তৎকালীন ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীরা কালভার্টের মুখে পুকুর খনন করে কাঁকড়ামারী বিলে জলাবদ্ধতা তৈরি করেছিল। পরে সেই জলাবদ্ধতা নিরসনের নামে প্রকল্প বাস্তবায়নের দায়িত্বও দেওয়া হয় তাদেরই। কিন্তু প্রকল্পের টাকার সিংহভাগ লুটপাট হয়েছে।’ তিনি আরও বলেন, ‘আগে শুধু বিলে জলাবদ্ধতা থাকলেও খাল খননের পর থেকে বর্ষাকালে বসতবাড়িতেও জলাবদ্ধতা দেখা দেয়। অথচ খাল খননের সময় মাসখানেক আগে নির্মিত দেড় কোটি টাকার নতুন সড়কও ধ্বংস করা হয়েছে। ফলে উন্নয়নের নামে এমন জনদুর্ভোগ এলাকাবাসী চায়নি।’
বাঘা উপজেলার মুর্শিদপুর-নওটিকা খালেও অনিয়মের চিত্র স্পষ্ট। এখানে মুর্শিদপুর থেকে চন্ডীপুর পর্যন্ত খাল খনন করা হয়েছে মাত্র তিন থেকে চার ফুট প্রশস্ত করে, যা কার্যত কোনো সেচ সুবিধাই দিচ্ছে না। অপরদিকে, চন্ডীপুর থেকে নওটিকা পর্যন্ত খনন করা হয়েছে পুকুরের আকৃতিতে, তবে কোথাওই পানি নেই। বরং খালের অধিকাংশ জায়গা ময়লা-আবর্জনার ভাগাড়ে পরিণত হয়েছে, কিছু কিছু অংশ দখল করে স্থাপনা নির্মাণ করা হয়েছে।
বিএমডিএর তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী নাজিরুল ইসলাম খাল খনন প্রকল্পের পরিচালক ছিলেন। তিনি বলেন, ‘জলাবদ্ধতা দূর করা ছিল প্রকল্পের মূল উদ্দেশ্য। ওই সব এলাকার মানুষ জলাবদ্ধতা থেকে বেঁচেছেন। ওখানে আর জলাবদ্ধতার অস্থিত্ব নেই। কিন্তু কেউ প্রভাব খাঁটিয়ে খাল ভরাট করলে তা পরিষ্কার করার দায়িত্ব আমার না। প্রকল্প শতভাগ কার্যকর হয়েছে বলে দাবি করেন প্রকৌশলী নাজিরুল।’