মহেশখালী (কক্সবাজার) প্রতিবেদক
প্রকাশ : ১৫ মার্চ ২০২৫ ১৬:৪৪ পিএম
বামে ঘাতক স্বামী রমজান আলী ও ডানে নিহত গৃহবধূ সুমাইয়া আকতার। ছবি : সংগৃহীত
‘ভাই, আমি সুমাইয়াকে মাইরা ফালাইছি, আমি আর বাঁচমু না, আমি আত্মহত্যা করুম’ ফুঁপিয়ে কাঁদতে কাঁদতে কথাগুলো বলছিল রমজান আলী। ওপাশ থেকে স্ত্রীর প্রবাসী বড়ভাই হতভম্ব হয়ে শুনছেন, কিছুতেই বিশ্বাস করতে পারছেন না। ঘাতক স্বামী তখন নিজের কৃতকর্মের ভয়াবহতা উপলব্ধি করে দিশেহারা।
দৈনিক প্রতিদিনের বাংলাদেশ-এর হাতে আসা এক অডিও রেকর্ডে শোনা যায়, স্ত্রীর নৃশংস হত্যার পর আত্মগ্লানিতে ভুগতে থাকা স্বামী রমজান আলী তার স্ত্রীর প্রবাসী বড়ভাইকে ফোন করে কাঁদতে কাঁদতে হত্যার স্বীকারোক্তি দিচ্ছে। সে জানাচ্ছে, কীভাবে একের পর এক নির্যাতনের পর ওড়না পেঁচিয়ে শ্বাসরোধ করে স্ত্রী সুমাইয়াকে হত্যা করেছে। একপর্যায়ে নিজের আত্মহত্যার কথাও ঘোষণা দেয় সে।
শুক্রবার (১৪ মার্চ) সকালে কক্সবাজারের মহেশখালী উপজেলার হোয়ানক ইউনিয়নের পূর্ব জামালপাড়ায় এ নির্মম ঘটনা ঘটে। ঘটনার পর থেকেই ঘাতক স্বামী পলাতক ছিল, তবে কয়েক ঘণ্টার ব্যবধানে মহেশখালী থানা পুলিশ তাকে গ্রেপ্তার করে আইনের আওতায় আনে।
মহেশখালী থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) কাইছার হামিদ এসব তথ্য নিশ্চিত করেন।
স্থানীয়দের সূত্রে জানা গেছে, সকালের আলো ফোটার পরও বাড়ির পরিবেশ ছিল অস্বাভাবিকভাবে নীরব। ঘরের ভেতর খাটে পড়েছিল এক নারীর নিথর দেহ, আর বাইরে উঠানে খেলছিল তার দুই বছরের শিশুকন্যা। পাশের নূরানী মাদ্রাসা থেকে ফিরে এসেছিল সাত বছরের ছোট ভাই সাইফুল ইসলাম। বোনের কাছে ভাত চাইতে গিয়ে কোনো সাড়া না পেয়ে ঘরে ঢুকতেই তার চিৎকারে কেঁপে ওঠে পুরো বাড়ি।
সুমাইয়ার নিথর দেহ দেখে প্রতিবেশীরা ছুটে আসেন। তাদের কেউ বিশ্বাস করতে পারছিলেন না যে হাসিখুশি মেয়েটি আর নেই। তার শরীরে নির্যাতনের চিহ্ন, গলায় ওড়না পেঁচানো। স্থানীয়দের চোখে তখন শুধুই প্রশ্ন—একজন মানুষ এতটা নিষ্ঠুর কীভাবে হতে পারে?
নিহত সুমাইয়ার দাদা মোহাম্মদ ছৈয়দ কবির জানান, তিন বছর আগে পানিরছড়া এলাকার হারুন রশিদের মেয়ে সুমাইয়ার সঙ্গে পূর্ব জামালপাড়ার রাজমিস্ত্রি শ্রমিক রমজান আলীর বিবাহ হয়। তবে বিয়ের পর থেকেই তাদের সংসারে অশান্তি লেগেই ছিল। স্বামী রমজান মেজাজি ও সন্দেহপ্রবণ ছিল। সামান্য কারণেই সুমাইয়াকে মারধর করত। পারিবারিক কলহ দিন দিন বাড়তে থাকে। কয়েকবার সালিশ বৈঠকও হয়, কিন্তু তাতে কোনো লাভ হয়নি। শুক্রবার ভোররাতে সেই দীর্ঘ নির্যাতনের চূড়ান্ত পরিণতি ঘটে।
স্ত্রীকে হত্যার পর রমজান আলী ঘর ছেড়ে পালিয়ে যায়। ফোনও বন্ধ করে দেয়। খবর পেয়ে মহেশখালী থানার ওসি মোহাম্মদ কাইছার হামিদের নেতৃত্বে পুলিশ ঘটনাস্থলে যায়।মরদেহের গলায় আঘাতের চিহ্ন দেখে প্রাথমিকভাবে অনুমান করা হয়, এটি পরিকল্পিত হত্যা। এরপরই শুরু হয় পুলিশি অভিযান। বিভিন্ন স্থানে খোঁজ চালিয়ে কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই ঘাতক স্বামীকে গ্রেফতার করে পুলিশ।
রমজান পালানোর সময় তার স্ত্রীর প্রবাসী বড়ভাইকে ফোন করে হত্যার দায় স্বীকার করে।
দৈনিক প্রতিদিনের বাংলাদেশ-এর হাতে থাকা সেই রেকর্ডে শোনা যায়, রমজান বলছে- ‘ও খালি ঝগড়া করত, আমারে শান্তি দিত না। আমি মাথা গরম কইরা মাইরা ফালাইছি… এখন আমি কী করমু’ একপর্যায়ে কান্নাজড়িত কণ্ঠে নিজের আত্মহত্যার কথাও জানায় সে।
এ বিষয়ে ওসি কাইছার হামিদ বলেন, ‘হোয়ানকে চাঞ্চল্যকর গৃহবধু হত্যার খবর পেয়ে ঘটনাস্থলে যায় পুলিশ। মরদেহের গলায় আঘাতের চিহ্ন দেখা গিয়েছে। ময়নাতদন্তের প্রতিবেদন পেলে মৃত্যুর আসল কারণ নিশ্চিত হওয়া যাবে। গ্রেপ্তার রমজান আলীর বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে।’
এ ঘটনায় নিহত সুমাইয়ার পরিবার ঘাতকের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির দাবি জানিয়েছে। এদিকে স্থানীয়রা বলছেন, পারিবারিক সহিংসতা বন্ধে কঠোর আইন প্রয়োগ জরুরি। নয়তো এমন নির্মম ঘটনার পুনরাবৃত্তি থামবে না।