× ই-পেপার প্রচ্ছদ সর্বশেষ বাংলাদেশ রাজনীতি দেশজুড়ে বিশ্বজুড়ে বাণিজ্য খেলা বিনোদন মতামত চাকরি শিক্ষা আজকের কার্টুন ফিচার সকল বিভাগ ছবি ভিডিও লেখক আর্কাইভ কনভার্টার

তিস্তা রক্ষায় ২৩৮ বছরেও নেই টেকসই পদক্ষেপ

মেরিনা লাভলী, রংপুর

প্রকাশ : ১৪ মার্চ ২০২৫ ১৪:৪৮ পিএম

পানিশূন্য তিস্তা নদীর বুক। বুধবার রংপুরের গঙ্গাচড়া উপজেলার তিস্তা সেতু এলাকা। প্রবা ফটো

পানিশূন্য তিস্তা নদীর বুক। বুধবার রংপুরের গঙ্গাচড়া উপজেলার তিস্তা সেতু এলাকা। প্রবা ফটো

২৩৮ বছরের পুরোনো তিস্তা নদী রক্ষায় টেকসই পদক্ষেপ নেওয়া হয়নি। বছরের পর বছর নদী রক্ষার নামে নষ্ট হয়েছে রাষ্ট্রের কোটি কোটি টাকা। তিস্তার আগ্রাসী আচরণে নদীভাঙন ও বন্যায় সর্বস্বান্ত হয়েছে মানুষ। ফলে উত্তরের পাঁচ জেলাবাসীর জীবন-জীবিকা ও জীববৈচিত্র্যে বিরূপ প্রভাব পড়েছে। সম্প্রতি অন্তর্বর্তীকালীন সরকার তিস্তায় টেকসই মেগা প্রকল্প বাস্তবায়নে জোর দিয়েছে। নদীর গতিপ্রকৃতি ঠিক রেখে তিস্তায় মেগা প্রকল্প বাস্তবায়নের তাগিদ দিয়েছেন নদী বিশেষজ্ঞরা।

জানা গেছে, অষ্টাদশ শতকের প্রায় শেষদিকে নদীর একটি ধারা বিভিন্ন নদীপ্রবাহের মাধ্যমে গঙ্গা নদীতে প্রবাহিত হতো। ১৭৮৭ সালে অতিবৃষ্টিতে ব্যাপক বন্যা হয়েছিল। সেই সময় নদীটি গতিপথ পরিবর্তন করে লালমনিরহাট, রংপুর, কুড়িগ্রাম, নীলফামারী ও গাইবান্ধা জেলার মধ্য দিয়ে প্রবাহিত হয়ে চিলমারী নদীবন্দরের দক্ষিণে ব্রহ্মপুত্র নদে পতিত হয়। আন্তর্জাতিক নদী তিস্তা ৩১৫ কিলোমিটারের মধ্যে বাংলাদেশের অংশে ১১৫ কিলোমিটার। যা পাঁচ জেলার ৪৪টি ইউনিয়নের ওপর দিয়ে প্রবাহিত। শাখা-প্রশাখা ও উপনদী মিলে তিস্তার সংযুক্ত নদীর সংখ্যা ২২টি।

ন্যায্য পানি পাচ্ছে না তিস্তা

তিস্তা নদী বাংলাদেশ-ভারতের একটি আন্তঃসীমান্ত নদী। ২০১১ সালে ভারতের সঙ্গে বাংলাদেশের পানি চুক্তি হয়। চুক্তি অনুযায়ী, বাংলাদেশ নদীর ৩৭ দশমিক ৫ শতাংশ এবং উজানের দেশ ভারত ৪২ দশমিক ৫ শতাংশ পানি পাবে। কিন্তু পরবর্তীতে সেই চুক্তি রক্ষা হয়নি। ভারত একতরফা পানি প্রত্যাহার করে শুষ্ক মৌসুমে তিস্তাকে করে তুলেছে মরুময়। আর বর্ষায় তিস্তার ধারণক্ষমতার চেয়ে অতিরিক্ত পরিমাণ পানি ছেড়ে ডুবিয়ে দেয় উত্তরের ৫ জেলাকে। শুষ্ক মৌসুমে পানি প্রত্যাহারের কারণে প্রতিবছর ৬ হাজার কোটি টাকা মূল্যের বোরো ধান উৎপাদন করতে পারছে না কৃষক।

তিস্তার পরিকল্পিত পরিচর্যার অভাব

নদী বিশেষজ্ঞদের মতে, বর্ষা-বৃষ্টির পানির মাত্র ৮ শতাংশ ব্যবহার করতে পারে তিস্তাপাড়ের মানুষ। বাকি ৯২ শতাংশ পানি সাগরে পতিত হয়। বর্ষাকালে তিন থেকে চার লাখ ঘনফুট পানি একযোগে তিস্তায় প্রবাহিত হয়। এ পানি তিস্তা তার বুকে ধারণ করতে পারে না। ফলে তিস্তাপাড়ে দীর্ঘমেয়াদি বন্যা ও ব্যাপক ভাঙন দেখা যায়। ভাঙনের ফলে গ্রাম, ভিটেমাটি, ফসলি জমি, ঘরবাড়ি, কবরস্থান, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, মসজিদ-মন্দিরসহ নানা অবকাঠোমো নদীতে বিলীন হয়েছে।

পানিশূন্য তিস্তা

উজান থেকে ভারত একতরফা পানি প্রত্যাহারের কারণে শুস্ক মৌসুমে তিস্তা নদীতে পানি নেই। সরু ক্যানেলের মতো করে তিস্তার পানি প্রবাহিত হচ্ছে। বর্তমানে তিস্তার বেশিরভাগ অংশে হেঁটে পারাপার হচ্ছে মানুষ। নদীতে পানি না থাকায় চরের উৎপাদিত ফসল নৌকায় করে পরিবহনে বেশ বেগ পেতে হচ্ছে। নদীতে পানি না থাকায় মাছ পাওয়া যাচ্ছে না। ফলে জেলেরা পেশা পরিবর্তন করতে বাধ্য হয়েছেন। সেচের অভাবে কৃষকের অনেক জমি পতিত থাকছে।

তিস্তার টেকসই সমাধানের দাবি

প্রতিবছর তিস্তা নদীর সঙ্গে সংগ্রাম করে টিকে থাকতে হয় তিস্তাপাড়ের মানুষকে। তিস্তার টেকসই সমাধানের দাবি জানিয়েছেন তিস্তাপাড়ের মানুষ। গঙ্গাচড়া উপজেলার লক্ষ্মীটারী ইউনিয়নের পশ্চিম ইচলীর হাসান মিয়া বলেন, ‘তিস্তা নদী তো হামার কষ্টের কারণ হয়া দাঁড়াইছে। প্রতিবছর নদীর পানিত হামার আবাদি জমি, ঘরবাড়ি চলি যায়। সাতবার ঘর সারাইবার নাগছে। নদীর টুকটাক কাম করি লাখ লাখ টাকা মারি খায়। আর হামার কষ্ট থ্যাকি যায়।’

তিস্তা রক্ষায় ছয় দফা

তিস্তা নদী রক্ষায় দীর্ঘদিন ধরে বিক্ষোভ, সমাবেশ ও কর্মসূচি পালন করে আসছে ‘তিস্তা বাঁচাও, নদী বাঁচাও’ সংগ্রাম পরিষদ। সংগঠনের সাধারণ সম্পাদক শফিয়ার রহমান বলেন, ‘তিস্তা নদী রক্ষায় আমরা সরকারের কাছে ছয় দফা দাবি উপস্থাপন করেছি। এর মধ্যে তিস্তা মহাপরিকল্পনা দ্রুত বাস্তবায়ন, অভিন্ন নদী হিসেবে ভারতের সঙ্গে ন্যায্য হিস্যার ভিত্তিতে তিস্তা চুক্তি সম্পন্ন ও তিস্তা নদীতে সারা বছর পানির প্রবাহ ঠিক রাখতে জলাধার নির্মাণ করতে হবে।’

তিস্তা রক্ষায় উদ্যোগী সরকার

আওয়ামী লীগ সরকার তিস্তা মহাপরিকল্পনার নামে ভোট রাজনীতি করেছে। নির্বাচনে জয়লাভের পরও তিস্তার পানির ন্যায্য হিস্যা আদায় কিংবা মহাপরিকল্পনা বাস্তবায়নের দৃশ্যমান উদ্যোগ গ্রহণ করেনি। অন্তর্বর্তীকালীন সরকার দায়িত্বগ্রহণের পর তিস্তা নদী সুরক্ষায় জোর দিয়েছে। এর আগে পানিসম্পদ মন্ত্রণালয়ের উপদেষ্টা সৈয়দা রিজওয়ানা হাসান তিস্তা মহাপরিকল্পনা বাস্তবায়ন নিয়ে সরকারের ইতিবাচক উদ্যোগের কথা জানান। ১০ মার্চ রংপুর জেলা প্রশাসক সম্মেলন কক্ষে তিস্তাপাড়ের মানুষ, তিস্তা নদী রক্ষা আন্দোলনকারী, সুশীল সমাজের প্রতিনিধি, রাজনৈতিক নেতৃবৃন্দসহ অংশীজনদের অংশগ্রহণে ‘তিস্তা নদীর সমন্বিত ব্যবস্থাপনা ও পুনরুদ্ধার প্রকল্প’ নিয়ে মতবিনিময় সভা অনুষ্ঠিত হয়।

মেগা প্রকল্পে যা হবে

পাওয়ার চায়না সূত্রে জানা যায়, তিস্তা নদীর সমন্বিত ব্যবস্থাপনা ও পুনরুদ্ধার প্রকল্পের মাধ্যমে উত্তরের ৫ জেলা লালমনিরহাট, নীলফামারী, রংপুর, কুড়িগ্রাম ও গাইবান্ধায় ১১০ কিলোমিটার নদীতে ১ হাজার ৩৩০ লাখ ঘনমিটার ড্রেজিং করা হবে। পুরো নদীর তীর প্রতিরক্ষা কাজ, নদীর দুইধারে বাঁধ নির্মাণ ও মেরামত কাজ, ৬৭টি গ্রোয়েন বা স্পার নির্মাণ ও মেরামত কাজ, নদীর দুইধারে রোড নির্মাণ কাজ, ১৭০ দশমিক ৮৭ বর্গ কিলোমিটার ভূমি পুনরুদ্ধার ও উন্নয়ন কাজ এবং পরিবেশগত ও সামাজিক সুরক্ষা কাজ করা হবে। এ প্রকল্প বাস্তবায়ন হলে নদীপাড়ের ১১ হাজার ২৩৯ কোটি টাকার সম্পদ রক্ষা পাবে।

যা বলছেন বিশেষজ্ঞরা

পাওয়ার চায়নার কান্ট্রি ম্যানেজার হান কুন বলেন, গত ৫০ বছর ধরে রংপুর বিভাগের মানুষ তিস্তার বন্যায় ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। তিস্তা প্রকল্প বাস্তবায়ন হলে দুর্ভোগ নিরসন হবে। সেই সঙ্গে তাদের যেন আর ভিটেমাটি ও ফসলি জমি হারাতে না হয় সেই ব্যবস্থা করা হবে। পাশাপাশি পরিবেশ ও জীববৈচিত্র্য ঠিক রেখে তিস্তায় মেগা প্রকল্প বাস্তবায়ন করা হবে। 

রিভারাইন পিপলের পরিচালক অধ্যাপক ড. তুহিন ওয়াদুদ বলেন, তিস্তা নদী সুরক্ষায় দুইপাড় সুরক্ষিত করতে হবে। নদীর মধ্যবর্তী ভাগে যেখানে পলি জমে, তা ড্রেজিং করার ব্যবস্থা রাখতে হবে। মেগা প্রকল্পে যে অবকাঠামো নির্মাণ করা হবে, তা যেন দীর্ঘমেয়াদে ক্ষতির কারণ না হয়, সে লক্ষ্যে উপযুক্ত পরীক্ষা-নিরীক্ষা করতে হবে। দীর্ঘদিন তিস্তা নদী সুরক্ষায় টেকসই কাজ হয়নি।

শেয়ার করুন-

মন্তব্য করুন

Protidiner Bangladesh

সম্পাদক : মারুফ কামাল খান

প্রকাশক : কাউসার আহমেদ অপু

রংধনু কর্পোরেট, ক- ২৭১ (১০ম তলা) ব্লক-সি, প্রগতি সরণি, কুড়িল (বিশ্বরোড) ঢাকা -১২২৯

যোগাযোগ

প্রধান কার্যালয়: +৮৮০৯৬১১৬৭৭৬৯৬ । ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন (প্রিন্ট): +৮৮০৯৬১১৬৭৭৮১০, +৮৮০১৮৮০৭৪৪৫৮০ | ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন (অনলাইন): +৮৮০১৮৮০৭৪৪৫৮০, +৮৮০১৭৯৯৪৪৯৫৫৯ । ই-মেইল: [email protected]

সার্কুলেশন: +৮৮০৯৬১১৬৭৭৮০৭, +৮৮০১৮৮০৭৪৪৩৩২ । ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন মূল্য তালিকা