আবু রায়হান তানিন, চট্টগ্রাম
প্রকাশ : ১০ মার্চ ২০২৫ ১২:১৭ পিএম
আপডেট : ১০ মার্চ ২০২৫ ১২:১৭ পিএম
চট্টগ্রামে ধর্ষণের মামলাগুলো ডিএনএ রিপোর্টের অভাবে আটকে আছে। গত দুই বছরের বেশিরভাগ মামলার ডিএনএ রিপোর্ট এখনও পাওয়া যায়নি। ছবি : সংগৃহীত
চট্টগ্রামে ধর্ষণের মামলাগুলো ডিএনএ রিপোর্টের অভাবে আটকে আছে। গত দুই বছরের বেশিরভাগ মামলার ডিএনএ রিপোর্ট এখনও পাওয়া যায়নি। ফলে অভিযোগপত্র দাখিল ও বিচার প্রক্রিয়া বিলম্বিত হচ্ছে। এতে ভুক্তভোগী ও তাদের পরিবার বিচারের আশা হারিয়ে ফেলছে।
চট্টগ্রামের রিয়াজুদ্দিন বাজারের ব্যবসায়ীর মেয়ে স্বর্ণা (ছদ্মনাম)। স্বর্ণার বাবা ব্যবসার সূত্রে পরিচিত ওমর ফারুককে তার মেয়েকে পড়ানোর দায়িত্ব দেন। ফারুক ধীরে ধীরে পরিবারের আস্থা অর্জন করে এবং এক পর্যায়ে স্বর্ণার সঙ্গে শারীরিক সম্পর্কে জড়ায়। পরে ফারুক স্বর্ণার ভিডিও ধারণ করে তাকে জিম্মি করে নিয়মিত ধর্ষণ করতে থাকে।
২০২৩ সালের মার্চ মাসে বিষয়টি প্রকাশ পেলে স্বর্ণার বাবা কোতোয়ালি থানায় মামলা দায়ের করেন। ৭২ ঘণ্টার মধ্যে ফারুককে গ্রেপ্তার করা হয় এবং তার মোবাইল থেকে স্বর্ণার আপত্তিকর ভিডিও ও ছবি উদ্ধার করা হয়। ফরেনসিক রিপোর্টেও ধর্ষণের সত্যতা মেলে। তবে দুই বছর পার হলেও মামলার অভিযোগপত্র দাখিল করা যায়নি। এর মধ্যে ফারুক জামিনে মুক্তি পেয়েছে; তদন্ত কর্মকর্তা বদলি হয়েছে তিনবার।
স্বর্ণার বাবা প্রতিদিনের বাংলাদেশকে বলেন, ‘সব প্রমাণ পাওয়া সত্ত্বেও ডিএনএ রিপোর্ট না আসায় চার্জশিট দেওয়া যাচ্ছে না। আমরা বিচার পাওয়ার ব্যাপারে হতাশ হয়ে পড়েছি। এই মুহূর্তে মামলার কী পরিস্থিতি, তদন্ত কর্মকর্তা কে? এমন প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, আমি জানি না। এখন আর খবরও রাখি না। তা ছাড়া দেশের পরিস্থিতিও পরিবর্তন হয়েছে। এই কারণে অনেক দিন আর খোঁজখবরও রাখি না।’
আরেক ঘটনায়, চট্টগ্রামের জামালখান মোড়ে ৭ বছরের শিশু বর্ষার বস্তাবন্দি লাশ উদ্ধার করা হয়। ঘটনাটা তখন দেশে বেশ আলোড়ন তুলেছিল। পাড়ার দোকানদার লক্ষ্মণ দাশ তাকে চিপস ও চকলেটের লোভ দেখিয়ে ধর্ষণ করে হত্যা করে। ২০২২ সালের ২৫ অক্টোবর এই ঘটনায় লক্ষ্মণগ্রেপ্তার হয় এবং আদালতে হত্যার দায় স্বীকার করে। তবে আড়াই বছর পরও এই মামলার অভিযোগপত্র দাখিল করতে পারেনি পুলিশ।
মামলাটির তদন্ত কর্মকর্তা কোতোয়ালি থানার উপ পরিদর্শক কোরেশী প্রতিদিনের বাংলাদেশকে বলেন, ‘মামলাটি ডিএনএ রিপোর্টের জন্য আটকে আছে। আদালতের মাধ্যমে একাধিকবার তাগাদা দেওয়া সত্ত্বেও রিপোর্ট আসেনি।’
ফলে মামলাগুলোর অভিযোগপত্র দিতে পারছে না পুলিশ। এর ফলে বিলম্বিত হচ্ছে বিচার প্রক্রিয়া। এমনকি বিচারের আগ্রহ হারিয়ে ফেলছেন ভিকটিম ও পরিবারের সদস্যরা।
চট্টগ্রামে ধর্ষণ মামলার তদন্তে ডিএনএ রিপোর্টের দীর্ঘসূত্রতা একটি বড় সমস্যা হয়ে দাঁড়িয়েছে। গত দুই বছরের প্রায় সব মামলার ডিএনএ রিপোর্ট এখনও আসেনি। কোতোয়ালি থানার এক উপ পরিদর্শক নাম প্রকাশ না করে বলেন, ‘২০২৩ সালের কোনো মামলার ডিএনএ রিপোর্ট এখনও আসেনি। ধর্ষণ মামলার ক্ষেত্রে ডিএনএ রিপোর্টে এটা নিশ্চিত হয় যে অভিযুক্ত ব্যক্তিই ভিকটিমকে ধর্ষণ করেছেন কি না। ফরেনসিকে শুধু নিশ্চিত হওয়া যায় ভিকটিম ধর্ষণের শিকার হয়েছে। ফলে ডিএনএ রিপোর্ট ছাড়া ধর্ষণ মামলার প্রতিবেদন দেওয়ার সুযোগ নেই। বাকি সব কাজ এগিয়ে নেওয়ার পরও শুধু ডিএনএ রিপোর্ট না পাওয়ায় বেশিরভাগ ক্ষেত্রে ধর্ষণ মামলার তদন্ত প্রতিবেদন আটকে থাকে। আমাদের থানায় অন্তত ২০টি মামলা আটকে আছে।’
তাহলে পুরো চট্টগ্রাম নগরে কী পরিমাণ মামলার তদন্ত ডিএনএ রিপোর্টের জন্য আটকে আছে এই বিষয়ে কথা বলতে সিএমপির উপ কমিশনার (ক্রাইম) রইস উদ্দিনের সঙ্গে যোগাযোগের চেষ্টা করেও সফল হওয়া যায়নি।
তবে এর একটা ধারণা দিয়েছেন ওয়ান স্টপ ক্রাইসিস সেন্টারের এক কর্মকর্তা। ওয়ান স্টপ ক্রাইসিস সেন্টারের এক কর্মকর্তা জানান, সারা দেশের ডিএনএ পরীক্ষা ঢাকা মেডিকেল কলেজে হয়। কয়েক মাস আগে মেশিন নষ্ট থাকায় জট তৈরি হয়। তিনি বলেন, ‘২০২২ সালের অনেক ডিএনএ রিপোর্ট এখনও আসেনি। তবে এখন জট খুলেছে।’ ঠিক কী পরিমাণ ডিএনএ পরীক্ষার রিপোর্ট পেন্ডিং আছে, এই বিষয়ে জানতে চাইলে তিনি সুনির্দিষ্ট সংখ্যা জানাতে পারেননি।