ঐতিহ্য
গলাচিপা (পটুয়াখালী) সংবাদদাতা
প্রকাশ : ০৯ মার্চ ২০২৫ ১২:১২ পিএম
পটুয়াখালীর গলাচিপা উপজেলার শাহাবাড়িতে মুড়ি ভাজার ব্যস্ততা। প্রবা ফটো
পটুয়াখালীর গলাচিপা উপজেলার পৌর শহরের ৮ নম্বর ওয়ার্ডের শাহাবাড়ির নাম শুনলেই একসময় মানুষের মনে ভেসে উঠত হাতে ভাজা সুস্বাদু মুড়ির কথা। সোনালি রঙের মচমচে এই মুড়ির খ্যাতি ছিল দূর-দূরান্তে। লবণ-পানির ছোঁয়ায় তৈরি হাতে ভাজা মুড়ি, যার স্বাদ মেশিনের মুড়ির তুলনায় একদম আলাদা। রমজান মাসে এ মুড়ির চাহিদা বেড়ে যেত কয়েকগুণ।
প্রায় দুই শতাব্দী ধরে এই এলাকার মানুষ মুড়ি ভাজাকে পেশা হিসেবে গ্রহণ করেছিল। কিন্তু কালের বিবর্তনে সেই ঐতিহ্য এখন বিলুপ্তির পথে। আধুনিকতার ছোঁয়ায় মেশিনে তৈরি মুড়ির বাজার দখল করায় ক্রমেই হারিয়ে যাচ্ছে হাতে ভাজা মুড়ির শিল্প। একসময় যে মুড়ির স্বাদ-গন্ধ বাংলার মানুষের নিত্যসঙ্গী ছিল, তা ক্রমেই হারানোর পথে।
মুড়ি ভাজার প্রক্রিয়া
হাতে ভাজা মুড়ি তৈরির ক্ষেত্রে কিছু প্রক্রিয়া অনুসরণ করতে হয়। সারি সারি মাটির চুলার ওপর বসানো হয় বড় মাটির পাত্র। একপাশে একজন কাঠ-খড় জ্বালিয়ে চুলায় আগুন দিতে ব্যস্ত, অন্যজন আগে থেকে প্রস্তুত করা চাল এনে গরম পাত্রে ঢেলে দিচ্ছেন। চাল সমানভাবে গরম করতে পাশেই আরেকজন কাঠের চামচ দিয়ে চাল টানা নেড়ে চলছেন। প্রায় পাঁচ থেকে সাত মিনিট ধরে নাড়ার পর সেই চাল ঢেলে দেওয়া হয় আরেকটি গরম পাত্রে, যেখানে ঘণ্টার পর ঘণ্টা ধরে তপ্ত হয়ে থাকা বালু অপেক্ষা করছে। গরম বালুর স্পর্শে মুহূর্তের মধ্যেই সাদা ফেনার মতো ফুলে ওঠে চাল, তৈরি হয় সুস্বাদু হাতে ভাজা মুড়ি।
পেশা পরিবর্তন করছেন কারিগররা
গলাচিপার বাসিন্দা প্রবীণ মুড়ি কারিগর নিতাই শাহা বলেন, আগে সারা রাত জেগে মুড়ি ভাজলেও চাহিদা মেটানো যেত না। কিন্তু এখন কেউ হাতে ভাজা মুড়ি খোঁজে না। পাইকাররা কম দামে মেশিনের মুড়ি কিনে নিয়ে যায়। তাই অনেক আগেই এই পেশা ছেড়ে দিয়েছি।
সময়ের সঙ্গে সঙ্গে এই শিল্পের চিত্র বদলে গেছে। বাজারে সস্তায় ও সহজলভ্য মেশিনের মুড়ির দাপটে টিকতে না পেরে অধিকাংশ কারিগর এই পেশা ছেড়ে দিয়েছেন। স্থানীয় বাসিন্দারা জানান, একসময় শাহাবাড়ির প্রায় প্রতিটি পরিবার মুড়ি ভাজার কাজে যুক্ত ছিল। তারা রাত-দিন মুড়ি ভাজতেন এবং পাইকারদের কাছে বিক্রি করতেন। কিন্তু বর্তমানে মাত্র ৫-৬টি পরিবার এই কাজে যুক্ত রয়েছে। বাকিরা পেশা বদল করেছেন। কেউ কৃষিকাজে যুক্ত হয়েছেন, কেউবা পেশা হিসেবে বেছে নিয়েছেন রিকশা। আবার কেউ চটপটি ফুসকা বিক্রি করে জীবিকা নির্বাহ করছেন।
একসময় গলাচিপা পৌর শহরের বহু পরিবার হাতে ভাজা মুড়ি তৈরির সঙ্গে জড়িত ছিল। কিন্তু সময়ের সঙ্গে সঙ্গে সেই সংখ্যা কমতে কমতে এখন মাত্র দুই থেকে তিনটি বাড়িতে ৮-১০টি পরিবার এই কাজ চালিয়ে যাচ্ছে। হাতে ভাজা মুড়ি শিল্পের সঙ্গে যারা এখনও জড়িত, তাদের মধ্যে অন্যতম চায়না সাহা ও সন্ধ্যা রানী। শত প্রতিকূলতার মধ্যেও তারা এখনও পূর্বপুরুষদের এই ঐতিহ্য ধরে রেখেছেন।
চায়না সাহা বলেন, আমরা ছোটবেলা থেকেই মুড়ি ভাজছি। আগে সারা রাত জেগে কাজ করলেও আয় ভালো ছিল, কিন্তু এখন হাতে ভাজা মুড়ির তেমন চাহিদা নেই। পাইকাররা কম দামে মেশিনের মুড়ি কিনে নেন, আর আমাদের হাতে ভাজা মুড়ির দাম বেশি হওয়ায় বিক্রি কমে গেছে।
সন্ধ্যা রানী বলেন, মেশিনের মুড়ির কারণে আমাদের মুড়ি বিক্রি হচ্ছে না। অথচ হাতে ভাজা মুড়ির স্বাদই আলাদা। যদি সরকার আমাদের কিছু সহায়তা দিত বা নির্দিষ্ট বাজার তৈরি করত, তাহলে হয়তো আমরা এই পেশা ধরে রাখতে পারতাম।
তিনি আরও বলেন, বর্তমানে প্রতি দেড় কেজি চাল ভাজতে ৩৫ টাকা নেওয়া হয়। প্রতিদিন দেড় থেকে দুই মণ মুড়ি ভাজা হয়, যা আগের তুলনায় অনেক কম। আগে যেখানে প্রচুর চাহিদা ছিল, এখন সেই বাজার হারিয়ে যাচ্ছে। মুড়ি ভাজার জ্বালানি খরচ, কারিগরের মজুরি দিয়ে কষ্টসাধ্য এ কাজে লাভ কমে আসায় অনেকেই এই পেশা ছেড়ে অন্য কাজে চলে গেছেন।
তাদের মতো আরও কয়েকটি পরিবার এখনও এই পেশায় টিকে থাকার চেষ্টা করছে। কিন্তু সঠিক পৃষ্ঠপোষকতা না পেলে অল্প কিছুদিনের মধ্যেই হয়তো এই ঐতিহ্য পুরোপুরি হারিয়ে যাবে।
স্থানীয় মুড়ি ব্যবসায়ী মিজানুর রহমান বলেন, আমরা হাতে ভাজা মুড়ি বিক্রি করতে চাই, কারণ এর স্বাদ আলাদা। কিন্তু ক্রেতারা সস্তা মেশিনের মুড়ির দিকে ঝুঁকে যাচ্ছেন। দাম বেশি হওয়ায় হাতে ভাজা মুড়ি বিক্রি কমে গেছে।
গ্রামীণ ঐতিহ্য টিকিয়ে রাখতে দরকার পৃষ্ঠপোষকতা
গলাচিপা সরকারি কলেজের অধ্যক্ষ মো. ফোরকান কবির বলেন, হাতে ভাজা মুড়ি শুধু খাবার নয়, এটি আমাদের সংস্কৃতির অংশ। কিন্তু সঠিক বাজারব্যবস্থা ও সরকারি সহায়তার অভাবে এটি হারিয়ে যেতে বসেছে। মুড়ি শিল্পকে রক্ষার জন্য বিশেষ উদ্যোগ নেওয়া প্রয়োজন।
সচেতন নাগরিকরা বলছেন, হাতে ভাজা মুড়ির স্বাদ ও গুণগত মান মেশিনের মুড়ির চেয়ে অনেক ভালো। এটি সংরক্ষণ ও বিপণনের জন্য সরকারি-বেসরকারি উদ্যোগ প্রয়োজন। স্থানীয় প্রশাসন বা সমবায় সমিতির মাধ্যমে এ শিল্পকে টিকিয়ে রাখা সম্ভব হতে পারে।
হাতে ভাজা মুড়ি শুধু একটি খাদ্য নয়, এটি বাঙালির ঐতিহ্যের অংশ। গ্রামবাংলার একসময়ের গুরুত্বপূর্ণ এই শিল্প যদি হারিয়ে যায়, তবে তা আমাদের সংস্কৃতির অপূরণীয় ক্ষতি হবে। তাই সরকার ও স্থানীয় উদ্যোক্তাদের উচিত হাতে ভাজা মুড়ি শিল্পকে রক্ষা করার উদ্যোগ নেওয়া।