শরণখোলা
ইসমাইল হোসেন লিটন, শরণখোলা (বাগেরহাট)
প্রকাশ : ০৪ মার্চ ২০২৫ ১০:১১ এএম
বঙ্গোপসাগর ও সুন্দরবনের জেলেরা মাছ ধরার পর শুটকি উৎপাদনে ব্যস্ত বাওয়ালি ও পেশাজীবীরা। ছবিটি পূর্ব বন বিভাগের শরণখোলা রেঞ্জের দুবলার চরের আলোরকোল শুঁটকি পল্লীর। প্রবা ফটো
দস্যুমুক্ত ঘোষণার প্রায় সাত বছর পর ফের একাধিক দস্যু বাহিনীর আবির্ভাব ঘটেছে সুন্দরবনে। চালু হয়েছে কার্ডের (টোকেন) মাধ্যমে চাঁদা আদায়ের সেই পুরোনো প্রথা। এতে আতঙ্ক দেখা দিয়েছে সুন্দরবনের শুঁটকি পল্লীতে। ভয়ে অনেকে ব্যবসা গুটিয়ে নেওয়ার কথা ভাবছেন।
২০১৮ সালের নভেম্বরে দস্যুমুক্ত হয় সুন্দরবন। সেই থেকে সাগর ও বনে দস্যূতা ছিল না বললেই চলে। যুগ যুগ ধরে চলা জেলে অপহরণ ও নির্যাতনের পাশাপাশি দস্যুদের সেই কার্ড প্রথার অবসান হয়। বন্ধ হয়ে যায় অস্ত্রের ঝঙ্কার। এরপর থেকে নির্বিঘ্নে মৎস্য আহরণ করে আসছিলেন জেলেরা। কিন্তু হঠাৎ করে দস্যুদের উত্থানে আতঙ্কিত হয়ে পড়েছেন বঙ্গোপসাগর ও সুন্দরবনের জেলে-বাওয়ালি ও পেশাজীবীরা।
গত ২৬ জানুয়ারি পূর্ব বন বিভাগের শরণখোলা রেঞ্জের দুবলার চরের আলোরকোল শুঁটকি পল্লীর ১৫ জেলেকে অপহরণ করে দয়াল বাহিনী। এ সময় সংঘবদ্ধ জেলেরা তিন দস্যুকে ধরে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর হাতে তুলে দেয়। এতে ক্ষিপ্ত হয় দস্যুরা। শুরু হয় জিম্মি জেলেদের ওপর নির্যাতন। প্রত্যেক জেলের মুক্তিপণ দাবি করা হয় ৩ লাখ টাকা। শেষ পর্যন্ত জনপ্রতি ২ লাখ ৮৫ হাজার টাকা করে মুক্তিপণ দিয়ে ২০-২৫ দিন পর জিম্মিদশা থেকে ছাড়া পান জেলেরা। দস্যুদের অব্যাহত হুমকিতে ইতোমধ্যে শুঁটকি ব্যবসা গুটিয়ে নিয়েছেন বহু ব্যবসায়ী। অপহরণের ভয়ে শত শত জেলে শ্রমিক শুঁটকি পল্লী গেছেন। দস্যু আতঙ্কে মাছ ধরতে না পারা এবং শ্রমিক সংকটে ব্যাহত হচ্ছে শুঁটকি উৎপাদন। লাখ লাখ টাকা লোকসানে পড়েছেন ব্যবসায়ীরা।
নিরাপত্তার স্বার্থে নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক আলোরকোল শুঁটকি পল্লীর এক ব্যবসায়ী জানান, জেলে অপহরণ ও দস্যু আটকের ঘটনার পর থেকে শুঁটকি পল্লীর ব্যবসায়ীদের ওপর হুলিয়া জারি করে দয়াল বাহিনীর প্রধান মজনু ডাকাত। সাগরে মাছ ধরতে হলে তাদের কাছ থেকে কার্ড নিতে হবে। এজন্য ট্রলারপ্রতি ধার্যকৃত চাঁদা পরিশোধ করতে হবে। আলোরকোল শুঁটকি পল্লীতে সাগরে মৎস্য আহরণে নিয়োজিত ট্রলারের সংখ্যা দুই সহস্রাধিক। এর মধ্যে গত এক মাসে তিন শতাধিক ট্রলারে কার্ড সংগ্রহ করা হয়েছে। এতে প্রায় কোটি টাকা চাঁদা পরিশোধ করতে হয়েছে ব্যবসায়ীদের। দস্যুদের দেওয়া বিকাশ ও নগদ নম্বরে এই চাঁদা পরিশোধ করতে হয়েছে তাদের।
তারা আরও জানান, দরকষাকষির পর ট্রলারপ্রতি ২৫ হাজার টাকা চাঁদা নির্ধারণ করেছে দস্যুরা। এতে দুই সহস্রাধিক ট্রলার থেকে কমপক্ষে পাঁচ কোটি টাকা চাঁদা আদায়ের লক্ষ্য (টার্গেট) রয়েছে দস্যুদের। দ্রুত চাঁদা পরিশোধ করে কার্ড বা টোকেন নেওয়ার জন্য চাপ সৃষ্টি করা হচ্ছে। দস্যুরা মোবাইল ফোনে ব্যবসায়ীদের সতর্ক করে বলেছে, কার্ডবিহীন কোনো ট্রলার পেলে জেলেদের কেটে সাগরে ভাসিয়ে দেওয়াসহ ট্রলার ডুবিয়ে দেওয়া হবে। এরপর থেকেই আতঙ্কিত হয়ে পড়েন মহাজন ও জেলেরা।
আলোরকোল শুঁটকি পল্লীর চাকলা বেল্টের সভাপতি আব্দুর রউফ জানান, গত ২৬ জানুয়ারি অপহরণকালে তার ট্রলারের জেলেরা আটক করেছিল তিন দস্যুকে। এতে ক্ষিপ্ত হয়ে দস্যুরা মোবাইল ফোনে তাকে হুমকি দিতে থাকে। তার ট্রলার ও জেলেদের সাগরে পেলে কেটে ভাসিয়ে দেওয়া হবে। এরপর থেকে জেলেরা সাগরে নামতে পারছেন না। ব্যবসা প্রায় বন্ধ হয়ে গেছে। ছয় জেলে ভয়ে পালিয়ে গেছেন। এমনকি তিনি (আব্দুর রউফ) নিজেও নিরাপত্তাহীনতায় শুঁটকি পল্লী ছেড়ে নিজ বাড়ি আশাশুনি উপজেলার চাকলা গ্রামে অবস্থান করছেন। তার প্রায় ২০ লাখ টাকা লোকসান হয়েছে।
আব্দুর রউফ আরও জানান, তার সমিতির সদস্য শুঁটকি ব্যবসায়ী নূর মোহাম্মদ শেখ, নাছির বিশ্বাসসহ বহু ব্যবসায়ী দস্যুদের হুমকিতে ব্যবসা গুটিয়ে বাড়ি চলে গেছেন। এ ছাড়া অপহরণের ভয়ে খালেক সানা, সামাদ সানা, মোজাহিদ সানা, আাসাদুল ঢালিসহ দুই শতাধিক ব্যবসায়ীর কমপক্ষে এক হাজার জেলে শ্রমিক কাজ ফেলে পালিয়ে গেছেন। এতে চরম ক্ষতির মুখে পড়েছেন ওইসব ব্যবসায়ী।
পূর্ব সুন্দরবনের শরণখোলা রেঞ্জের আলোরকোল শুঁটকি পল্লীর ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা আসাদুজ্জামান জানান, চরের জেলে-মহাজনরা দস্যু আতঙ্কে আছেন। বহু মহাজন ও জেলে চর ছেড়ে চলে গেছেন। অপহরণের ভয়ে গভীর সাগরে যেতে পারছেন না জেলেরা। মাছ ও শ্রমিক সংকটে মহাজনরা ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছেন। নির্ধারিত চাঁদা পরিশোধ করে দস্যুদের কাছ থেকে টোকেন সংগ্রহ করে সাগরে যেতে হচ্ছে জেলেদের। এ পর্যন্ত বহু ট্রলার দস্যুদের কাছ থেকে টোকেন নিয়েছে বলে শুনেছেন তিনি।