ফটিকছড়ি (চট্টগ্রাম) প্রতিবেদক
প্রকাশ : ২৪ ফেব্রুয়ারি ২০২৫ ১৯:৪৫ পিএম
চট্টগ্রামের ফটিকছড়ি উপজেলার বাগানবাজার ইউনিয়নের বীর মুক্তিযোদ্ধা আব্দুর রাজ্জাকের ছেলে আব্দুস শুক্কুর। পেশায় গ্রামপুলিশ হলেও চাচা প্রয়াত বীর মুক্তিযোদ্ধা বসু মিয়াকে বাবা দেখিয়ে হাতিয়ে নিয়েছেন সরকারি কোষাগারের লাখ লাখ টাকা। দীর্ঘ ১০ বছর ধরে এমন অনিয়মের সঙ্গে জড়িত বলে অভিযোগ।
অভিযোগ আছে, তার এ অপকর্মের পেছনে জড়িত স্বয়ং বাগানবাজার ইউনিয়নের প্রশাসনিক কর্মকর্তা (সচিব) মো. বখতিয়ার উদ্দিনের নেতৃত্বে একটি চক্র। চক্রটির কল্যাণে গ্রামপুলিশ আব্দুস শুক্কুর তৈরি করে নেন দুটি এনআইডি কার্ড, জাল ওয়ারিশন সনদপত্র, মুক্তিযোদ্ধার ভাতা কার্ডসহ নানাবিধ নথিপত্র।
অনুসন্ধানে জানা যায়, বীর মুক্তিযোদ্ধা আব্দুর রাজ্জাকের ছয় সন্তানের মধ্যে আব্দুস শুক্কুর তৃতীয়। কিন্তু আব্দুর রাজ্জাকের ভাই আরেক মুক্তিযোদ্ধা মৃত বসু মিয়ার সংসারে কোনো সন্তান ছিল না। বসু মিয়ার মৃত্যুর পর মারা যান তার স্ত্রীও। ২০১৪ সালে এই আব্দুর শুক্কুর তার সন্তানহীন চাচা বসু মিয়াকে বাবা দেখিয়ে তৈরি করেন জাতীয় পরিচয়পত্র (এনআইডি)। এনআইডি তৈরির কাজে তাকে প্রয়োজনীয় কাগজপত্র সরবরাহ করে সহায়তা করেন ইউপি সচিব বখতিয়ার উদ্দিন। নির্বাচন অফিস থেকে এনআইডি ইস্যুতে সহায়তা করেন নির্বাচন কমিশনের সিনিয়র সহকারী সচিব নুরুল ইসলাম ভূঁইয়ার ছোট ভাই পল্লী চিকিৎসক শহিদুল ইসলাম ভূঁইয়া। এজন্য শহীদুল ইসলাম ভূঁইয়া ৫০ হাজার টাকা নেন বলে জানান আব্দুস শুক্কুর।
ভুয়া এনআইডিকে পুঁজি করে ইউনিয়ন পরিষদ থেকে জাল ওয়ারিশন সনদ নিয়ে আব্দুর শুক্কুর বনে যান সন্তানহীন বীর মুক্তিযোদ্ধা মৃত বসু মিয়ার একমাত্র সন্তান। ২০১৫ সাল থেকে উত্তোলন করে আসছেন বসু মিয়ার নামে বরাদ্দকৃত মুক্তিযোদ্ধা ভাতার অর্থ। যার ভাগ চলে যায় ইউনিয়ন পরিষদের সচিব বখতিয়ার উদ্দিন, পল্লী চিকিৎসক শহিদুল ইসলাম ভূঁইয়াসহ চক্রের অন্যান্য সদস্যের কাছে। অভিযোগের দায় স্বীকার করে আব্দুস শুক্কুর বলেন, ‘ভাতার টাকা উত্তোলন করে সচিবকে দিতে হয় ৫ হাজার, মুক্তিযোদ্ধা কমান্ডারকে ২ হাজার ও ডাক্তার শহীদকে (শহিদুল ইসলাম) দিতে হয় ২ হাজার টাকা। বাকি টাকা নিজের সংসারের কাজে খরচ করেছি।’
স্থানীয়দের অভিযোগ, এক যুগেরও বেশি সময় একই ইউনিয়নে কর্মরত থাকার সুবাধে সচিব বখতিয়ার গড়ে তুলেছেন ভুয়া এনআইডি জালিয়াতি চক্রের সিন্ডিকেট। ইউনিয়ন পরিষদ থেকে প্রয়োজনীয় সব নথি সরবরাহ এবং ইস্যু করে সিন্ডিকেট সদস্যদের মাধ্যমে জাল এনআইডি তৈরিতে সহায়তা করেন মোটা অঙ্কের টাকার বিনিময়ে। এ ছাড়া নানা সময়ে ইউনিয়নের তুলনামূলক দরিদ্র লোকজনের ওয়ারিশন সনদ জাল করে প্রতিপক্ষকে সম্পদ হাতিয়ে নিতে সহায়তা করেন।
সম্প্রতি উপজেলা প্রশাসন অভিযান চালিয়ে বাগানবাজার ইউনিয়নের এনআইডি জালিয়াতি চক্রের সদস্য রাসেলকে আটক করে ভ্রাম্যমাণ আদালতের মাধ্যমে দেয়। স্থানীয়দের অভিযোগ, এ অপকর্মের মাস্টারমাইন্ড ইউপি সচিব বখতিয়ার এখনও ধরাছোঁয়ার বাইরে।
স্থানীয় ইউপি সদস্য ও ইউনিয়ন বিএনপির সাধারণ সম্পাদক আবুল কাসেম বলেন, ‘সচিবের এসব অনিয়মের বিষয়ে আগামী মাসিক সভায় ইউএনও ও ইউনিয়নের প্রশাসককে অবহিত করা হবে।’
স্থানীয় বিএনপি নেতা লোকমান হোসেন বলেন, ‘দীর্ঘদিন ধরে সচিব বখতিয়ার গড়ে তুলেছেন অপরাধের স্বর্গরাজ্য। এসব বিষয় তদন্ত করে ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি জানাই।’ সংঘবদ্ধ সিন্ডিকেটের মাধ্যমে সরকারি কোষাগারের বিপুলসংখ্যক অর্থ হাতিয়ে নেওয়ার ঘটনায় বিস্মিত ফটিকছড়ি দুর্নীতি প্রতিরোধ কমিটির সভাপতি আলী আহমদ।
সচিব বখতিয়ার আব্দুর শুক্কুরকে বাঁচাতে গত ৬ জানুয়ারি পরিষদের প্রশাসকের স্বাক্ষরবিহীন নতুন আরেকটি প্রত্যয়নপত্র ইস্যু করেন। যেখানে সচিব, ইউপি সদস্য সাইফুল ইসলাম ও নারী ইউপি সদস্য শাহেনা বেগমের স্বাক্ষর দেখা যায়। স্বাক্ষর করার বিষয়ে নারী ইউপি সদস্য শাহেনা বেগম বলেন, ‘সচিব বখতিয়ার শুক্কুরের এনআইডি স্থানান্তরের কথা বলে আমার সই নিয়েছে।’
ইউপি সচিব বখতিয়ার উদ্দিন অভিযোগ অস্বীকার করেন। এক প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, ‘ইউএনওর নির্দেশে দুই ইউপি সদস্যের স্বাক্ষরে প্রত্যয়নপত্র দেওয়া হয়েছে।’
উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা ও ইউনিয়ন পরিষদের প্রশাসক মোজাম্মেল হক চৌধুরী বলেন, ‘ঘটনাটি জেনে ইউনিয়ন পরিষদের প্রশাসনিক কর্মকর্তাকে দুই দিনের মধ্যে প্রতিবেদন জমা দিতে বলা হয়েছে। সত্যতা পেলে জড়িতদের বিরুদ্ধে প্রতারণার মামলা করা হবে।’