ফুয়াদ মোহাম্মদ সবুজ, মহেশখালী (কক্সবাজার)
প্রকাশ : ২৪ ফেব্রুয়ারি ২০২৫ ১৮:২০ পিএম
আপডেট : ২৪ ফেব্রুয়ারি ২০২৫ ১৮:৩০ পিএম
মহেশখালীর দক্ষিণ প্রান্তে পত্রিকা বিক্রি করছেন হকার। প্রবা ফটো
এক সময়ের প্রাণচাঞ্চল্য ভরা মহেশখালীর উত্তর প্রান্ত এখন যেন খবরের খরায় ধুঁকছে। দেড় বছর হয়ে গেল, জাতীয় কিংবা স্থানীয় কোনো পত্রিকার দেখা মেলে না এ অঞ্চলে। চালিয়াতলী থেকে হোয়ানক—এ পথের নিয়মিত পাঠকেরা এখন পত্রিকার শূন্যতায় কাতর। খবরের কাগজ হাতে নিয়ে চায়ের দোকানে বসে রাজনৈতিক বিশ্লেষণ কিংবা খেলার উত্তেজনায় মেতে ওঠার দৃশ্য এখন শুধুই স্মৃতির পাতায়। কাগজে ছাপা অক্ষরের গন্ধ মাখা সকালগুলো হারিয়ে যাচ্ছে, সেই গন্ধের সঙ্গে ম্লান হচ্ছে এক প্রজন্মের পাঠ-সংস্কৃতি।
একদিন ছিল, যখন সূর্য ওঠার আগেই হকারদের সাইকেলের ঘণ্টা শোনা যেত। ‘পত্রিকা নেবেন’ ডাক শোনা মাত্রই বাড়ির বারান্দা থেকে একজোড়া হাত বেরিয়ে আসত, কেউবা মুখে পান চিবোতে চিবোতে খবরের কাগজে চোখ বুলাতো। অথচ, আজ সেই চিত্র বদলে গেছে। এখন আর কাগজ হাতে নয়, মোবাইলের স্ক্রিনেই খবর পড়ে দিন শুরু করে মানুষ। কিন্তু এই পরিবর্তন সহজে মানতে পারছে না মহেশখালীর সংবাদ-সচেতন প্রবীণরা।
নোনাছড়ি এলাকার দায়িত্বশীল পাঠক ও জামায়াতকর্মী জয়নাল আবেদীন আফসোস করে বলেন, ‘আমার দিন শুরু হতো পত্রিকার পাতায় চোখ রেখে। এখন সেই সকাল যেন অসম্পূর্ণ। অনলাইনে সব পাওয়া যায়, কিন্তু পত্রিকার মতো পরিপূর্ণতা নেই।’
আরেক পাঠক মাওলানা মুবিনুল হক বলেন, ‘আমার বাবা-দাদা কাগজ পড়ে দিন কাটিয়েছেন। আজকের প্রজন্ম মোবাইলের পর্দায় আটকে গেছে। আমাদের সন্তানদের হাতে এখন খবরের কাগজ তুলে দিতে চাই, কিন্তু পত্রিকা পাচ্ছি কোথায়?
পত্রিকা হারানোর এ ক্ষত গভীর, কারণ এটি শুধু কাগজের ঘাটতি নয়, এটি এক সংস্কৃতির বিলুপ্তি। সংবাদপত্রের কাগজ যেমন বাস্তবতার প্রতিচ্ছবি তুলে ধরে, তেমনি মানুষের চিন্তাকে শাণিত করে। এ অঞ্চলের পাঠকেরাও চায়, তাদের আঙুলের স্পর্শে আবার ফিরে আসুক সেই চিরচেনা পত্রিকার পাতাগুলো।
পত্রিকার এই সংকটের পেছনে প্রধান কারণ হকার সংকট। দীর্ঘদিন ধরে মহেশখালীর উত্তরের হকার আবুল কালাম বার্ধক্যজনিত কারণে পত্রিকা বিলি বন্ধ করে দিয়েছেন। নতুন কেউ আসছে না এই পেশায়, ফলে সংবাদপত্র পাঠকের দোরগোড়ায় পৌঁছাতে পারছে না।
এই মুহূর্তে মহেশখালীতে একমাত্র হকার হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন আবুল কালাম। তিনি ছাড়া এ অঞ্চলে কেউ পত্রিকা বিক্রি করতে রাজি নন। ফলে পত্রিকা পাঠানোর ব্যবস্থা থাকলেও তা পাঠকের হাতে পৌঁছানো কঠিন হয়ে পড়েছে। এ অবস্থায় দায়িত্বশীল পাঠকেরা নতুন প্রজন্মের কাউকে এ দায়িত্ব নেওয়ার আহ্বান জানিয়েছেন।
মহেশখালীর প্রবীণ হকার আবুল কালাম বলেন, ‘আমরা বুড়ো হয়ে গেছি। এখন আর আগের মতো সাইকেল চালিয়ে পত্রিকা বিলি করা সম্ভব হয় না। নতুন কেউ আসতে চায় না, কারণ এ কাজে আগ্রহ কমে গেছে।’
হকার সংকটের পাশাপাশি রয়েছে পত্রিকা পরিবহনের সমস্যাও। মহেশখালীর প্রত্যন্ত অঞ্চলে নিয়মিতভাবে পত্রিকা পৌঁছানোর কোনো কার্যকর ব্যবস্থা নেই। পরিবহন খরচ বাড়ায় পত্রিকার মালিকরা এদিকে বিশেষ নজর দিচ্ছে না। ফলে পাঠকের আকাঙ্ক্ষা থাকলেও তারা কাঙ্ক্ষিত সংবাদপত্র হাতে পাচ্ছেন না। সংবাদপত্র শুধু খবর নয়, এটি সমাজের দর্পণ। তাই মহেশখালীর পাঠকরা চান, সংবাদপত্র কর্তৃপক্ষ ও হকার সমিতিগুলো একসঙ্গে কাজ করুক, যেন আবারও পত্রিকা আসে এ অঞ্চলে।
পাঠক মিজানুর রহমান বলেন, ‘হকার সংকট যদি থাকে, তবে বিকল্প উপায়ে পত্রিকা আনার ব্যবস্থা করা হোক। অন্তত কিছু নির্দিষ্ট পয়েন্টে পত্রিকা রাখলেই আমরা কিনতে পারব।’
পত্রিকার এ সংকট কাটাতে স্থানীয় প্রশাসন ও সংবাদপত্র মালিকদের এগিয়ে আসার বিকল্প নেই। প্রযুক্তির অগ্রযাত্রার সঙ্গে তাল মিলিয়েও কাগুজে পত্রিকাকে টিকিয়ে রাখা সম্ভব, যদি নতুন উদ্যোগ নেওয়া হয়। স্থানীয় সংবাদ পরিবেশক, হকার সংগঠন এবং সংবাদপত্র কর্তৃপক্ষের সমন্বয়ে নতুন কোনো পরিকল্পনা গড়ে তুলতে হবে। এক সময় যে পাঠকেরা খবরের জন্য পত্রিকার দোকানে ভিড় করত, তারা আজও পত্রিকার আশায় পথ চেয়ে থাকে।
মহেশখালীতে পত্রিকা আবার ফিরবে কি না, তা সময়ই বলে দেবে। কিন্তু এ অঞ্চলের পাঠকেরা আজও সেই দিনটির অপেক্ষায় রয়েছেন, যেদিন আবার সকালে এক কাপ চায়ের সঙ্গে পত্রিকার পাতা উল্টিয়ে দিন শুরু করতে পারবেন।