সাইদুল ইসলাম মন্টু, বেতাগী (বরগুনা)
প্রকাশ : ২০ ফেব্রুয়ারি ২০২৫ ১৯:২৬ পিএম
আপডেট : ২০ ফেব্রুয়ারি ২০২৫ ১৯:২৯ পিএম
দেশের উপকূলীয় জনপদ বরগুনার বেতাগী পৌরসভার সিটিসিআরআইপি প্রকল্পের একটি প্যাকেজে ১০টি সড়ক ও কালভার্টের ১৭ কোটি ৬৩ লাখ টাকার কাজে ব্যাপক দুর্নীতি ও অনিয়মের অভিযোগ উঠেছে। এ ব্যাপারে একাধিক লিখিত অভিযোগ ও সংবাদ সম্মেলন করা হলেও কোনো ফল মেলেনি বলে জানা গেছে।
বেতাগী পৌরসভা সূত্রে জানা গেছে, ২০২৩-২৪ অর্থবছরে বরগুনার বেতাগী পৌরসভার সিটিসিআরআইপি প্রকল্পের একটি প্যাকেজে ১০টি আরসিসি, কার্পেটিং ও পরিবেশবান্ধব ইউনিব্লক সড়ক ও কালভার্টের ১৭ কোটি ৬৩ লাখ টাকার কাজ চলমান রয়েছে।
স্থানীয়দের অভিযোগ, এসব সড়ক ও কালভার্টের কাজের শুরুতেই অনিয়মের অভিযোগ ওঠে। দরপত্রের প্রাক্কলন অনুযায়ী কোনোটাই করা হয়নি। সড়কের দুই পাশের ইটের গাঁথুনির নিচে তিন ইঞ্চি সিসি ঢালাইয়ের কথা উল্লেখ থাকলেও ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান কোনো রকম সাদা বালু দিয়ে এক থেকে দেড় ইঞ্চি ঢালাই করেছে। সিলেটসেন বালুর ব্যবহার করেনি বর্তমানে ১০ ইঞ্চি ইটের গাঁথুনি দিয়ে সিসি ঢালাই ঢেকে ফেলেছে, যাতে চুরি ধরা না যায়। কাজের দরপত্রের প্রাক্কলন অনুযায়ী জানা গেছে, সালেহিয়া সিনিয়র মাদ্রাসা রাস্তায় পূর্বের রাস্তা খনন করে রুলিং করে সম্পূর্ণ রাস্তায় এক ইঞ্চি বালুর লেয়ার করে দিতে হবে, যাতে নতুন ৪ ইঞ্চি কম্পেক্ট ম্যাগাডাম পরিমাপ করা যায়। তারপরে কার্পেটিং করতে হবে মিনিমাম দুই ধারের এজিংয়ের উচ্চতা থাকতে হবে ছয় ইঞ্চি। অথচ ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানগুলো তারা এজিং করেছে দুই থেকে তিন ইঞ্চি। এ ছাড়া সড়কে ৮ থেকে ১০ টনের রোলারের কথা থাকলেও সেখানে পৌরসভার এক টনের পুরোনো রোলার দিয়ে দায়সারাভাবে রুলিং করা হয়েছে। স্থানীয়রা আরও অভিযোগ করেন, প্রকল্পের কাজের শুরু থেকেই বেতাগীর পৌরসভার সাবেক মেয়র ও উপজেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি এবিএম গোলম কবির, ঠিকাদার সাবেক উপজেলা চেয়ারম্যান, হোসনাবাদ ইউনিয়ন আওয়ামী লীগে সভাপতি ও খান এন্টারপ্রাইজের স্বত্বাধিকারী খলিলুর রহমান খান এবং পৌরসভার নির্বাহী প্রকৌশলী জসিম উদ্দিনের বিরুদ্ধে তাদের যোগসাজশে এসব দুর্নীতি ও অনিয়ম করা হয়েছে। গত ৫ আগস্ট সরকার পতনের পর পৌরসভার নির্বাহী প্রকৌশলী ছাড়া সবাই পলাতক রয়েছেন।
বেতাগী পৌরসভার ৫ নম্বর ওয়ার্ডের বাসিন্দা, ব্যবসায়ী এবং কুয়াকাটা সবুজ বাংলা রিসোর্টের স্বত্বাধিকারী কেএম ফারুফ রেজা স্থানীয় সরকার বিভাগের উপদেষ্টা, স্থানীয় সরকার বিভাগের প্রধান প্রকৌশলী, স্থানীয় সরকার বিভাগের সচিব, স্থানীয় সরকার বিভাগের সিনিয়র সহকারী সচিব ও স্থানীয় সরকার বিভাগের উপসচিব বরাবরে লিখিত অভিযোগের প্রেক্ষিতে প্রকল্প পরিচালক মোখলেছুর রহমান ও প্রকল্প সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা বেতাগী পৌরসভার চলমান কাজ সরেজমিন পরিদর্শন করেন।
সম্প্রতি বরগুনা প্রেস ক্লাবে সংবাদ সম্মেলনে এসব অভিযোগ তুলে ধরেন স্থানীয় বাসিন্দা মারুফ রেজা। তিনি বলেন, পৌরসভার সিটিসিআরআইপি প্রকল্পের এসব অনিয়মের বিবরণ উল্লেখ করে গত ২৮ জুলাই স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয়ের প্রধান প্রকৌশলী, গত ২৪ আগস্ট স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয়ের সিনিয়র সহকারী সচিব বরাবরে, গত ২৫ আগস্ট স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয়ের সচিব এবং গত ২৫ আগস্ট পৌরসভা-১ এর উপসচিব বরাবর ব্যবস্থার নেওয়ার জন্য আবেদন করা হয়। গত রবিবারও বরিশাল বিভাগীয় কমিশনারের কাছে লিখিত অভিযোগ ও একই অভিযোগে ওইদিন সন্ধ্যায় বরগুনা প্রেস ক্লাবে সংবাদ সম্মেলন করা হয়।
মারুফ রেজা বলেন, ‘এসব অনিয়মের বিষয় নিয়ে আমি প্রতিবাদ করি। চুরি ডাকার জন্য তারা বালু ফিলিং না করে সবুজ কানন স্কুলের মাথায় এক থেকে দেড় ইঞ্চি খোয়া দিয়ে কাজ করা হচ্ছে। অথচ ধরা আছে কম্পিল্ট ৪ ইঞ্চি ম্যগাডাম। ইতোমধ্যে এসব দুর্নীতি ও অনিয়ম খতিয়ে দেখতে যথাযথ কর্তৃপক্ষ ব্যবস্থা নেওয়ার আশ্বাস দেন।’
তা ছাড়া অভিযোগপত্রে আরও জানা গেছে, পৌরসভার নির্বাহী প্রকৌশলী জসিম উদ্দিন কৌশল করে ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান খান এন্টারপ্রাইজের স্বত্বাধিকারী খলিলুর রহমানকে ঠিকাদারি কাজের দায়িত্ব দেওয়া হতো। আর খলিলুর রহমান এবং সাবেক পৌরসভার মেয়র এবিএম গোলাম কবিরের সঙ্গে ব্যবসায়ী অংশীদার। এসব কাজের অন্য যেসব ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান দায়িত্ব দেওয়া হতো তাদের কাছ থেকে সাবেক পৌর মেয়র কবির ১৪ শতাংশ অগ্রিম কেটে নিতেন এবং বিল করানোর সময় ঠিকাদারদের কাছ থেকে পৌরসভার নির্বাহী প্রকৌশলী জসিম উদ্দিন বিভিন্ন অজুহাতে ১৪ শতাংশ কেটে নেয়।
কাজের ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান খান এন্টারপ্রাইজের স্বত্বাধিকারী খলিলুর রহমান খান বলেন, অভিযোগগুলো সম্পূর্ণ মিথ্যা ও বানোয়াট। এতে কোনো ধরনের সত্যতা নেই। অযথা হয়রানি করার উদ্দেশ্যে করা হচ্ছে।
এ ব্যাপারে বেতাগী পৌরসভার নির্বাহী প্রকৌশলী জসিম উদ্দিন বলেন, ‘আমার বিরুদ্ধে আনা অভিযোগ আদৌ সত্য নয়। প্রাক্কলনে পুরোনো সড়ক ঠিক রেখে তিন ইঞ্চি ঢালাই দেওয়ার কথা রয়েছে। সাবেক পৌর মেয়র ও ঠিকাদার সাবেক উপজেলা চেয়ারম্যানের সঙ্গে ব্যক্তিগত শত্রুতার কারণে শুধু এক ব্যক্তির পক্ষ থেকে এসব অভিযোগ তোলা হচ্ছে। অভিযোগের পরও দুইবার প্রকল্প পরিচালক মোখলেছুর রহমান ও প্রকল্প সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা পরিদর্শন করেন। পরিদর্শনে তারা অভিযোগের কোনো ধরনের সত্যতা পাননি। বরং কাজগুলো যাতে দ্রুত সম্পন্ন হয় এজন্য কাজের গতি বাড়ানোর জন্য নির্দেশনা দিয়েছেন।’
বেতাগী উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা ও পৌর প্রশাসক মো. বশির গাজী বলেন, ‘অভিযোগ শোনার সঙ্গে সঙ্গে স্বচক্ষে কাজগুলো পরিদর্শন করেছি। কিন্তু কোনো অনিয়মের প্রমাণ মেলেনি। প্রাক্কলন অনুযায়ী সঠিকভাবে কাজগুলো বাস্তবায়ন হচ্ছে। বরং কাজ পড়ে থাকায় স্থানীয়দের চলাচলে চরম দুর্ভোগের শিকার হওয়ায় তাদের ভোগান্তির কথা বিবেচনা করে কাজগুলো যাতে দ্রুত সম্পন্ন করা যায় এজন্য আমি সর্বাত্মক চেষ্টা করছি।’