চট্টগ্রাম অফিস
প্রকাশ : ২০ ফেব্রুয়ারি ২০২৫ ১৯:০৭ পিএম
চট্টগ্রামের একটি শিল্পগোষ্ঠীর বিস্তীর্ণ উপকূলীয় জমি ভূমিদস্যুর কবলে পড়েছে। স্থানীয় প্রভাবশালী মহলের ছত্রছায়ায় ওই জমি জবরদখলের পাঁয়তারা করছে। এক্সকাভেটর দিয়ে কেটে নিয়ে যাচ্ছে জমির টপ সয়েল। প্রশাসনের বিভিন্ন পর্যায়ে বারবার অভিযোগ করেও কোনো প্রতিকার মিলছে না। অদৃশ্য কারণে প্রশাসনও নির্বিকার।
আনোয়ারা উপজেলার জুঁইদণ্ডি উপকূলে ক্রয়সূত্রে এসব জমির মালিক ইমাম গ্রুপ। এই জমির ওপর শ্যেন দৃষ্টি পড়েছে স্থানীয় একটি ‘ভূমিহীন সমবায় সমিতি’ নামধারী ভূমিদস্যু চক্রের। এমনকি ইমাম গ্রুপের ওই জমির তত্ত্বাবধানে নিয়োজিত লোকজন চক্রটির হুমকির মুখে সেখানে যেতে পারছেন না। আর জমির উপরিভাগের মাটি এক্সকাভেটর দিয়ে কেটে জমির সর্বনাশ করছে। সংশ্লিষ্টরা বলছেন, এসব জমির মাটি কেটে নিয়ে ওই চক্রটি সেখানে জোরপূর্বক মাছ চাষ করার পাঁয়তারা করছে।
জসিম উদ্দিন, কলিম উদ্দিন প্রমুখের বিরুদ্ধে জমি জবরদখলের অপচেষ্টার প্রতিকার চেয়ে আনোয়ারা থানার সহকারী কমিশনার (ভূমি) এবং আনোয়ারা থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা বরাবরে ইমাম গ্রুপের পক্ষ থেকে অভিযোগও পেশ করা হয়। এরপরও কোনো কার্যকরী উদ্যোগ না নেওয়ায় উদ্বেগ প্রকাশ করছেন জমির মালিক।
এ প্রসঙ্গে ইমাম গ্রুপের ম্যানেজার জসিম উদ্দিন বলেন, আনোয়ারা উপজেলার জুঁইদণ্ডি এলাকায় ১৫-১৬ বছর আগে ইমাম গ্রুপ ১৬ একর জমি ক্রয় করে। এখন সেই জমি থেকে জসীম উদ্দিন, কলিম উদ্দিনসহ বিশাল একটি সংঘবদ্ধ চক্র জোরপূর্বক এক্সকাভেটর দিয়ে ট্রাকে ট্রাকে মাটি কেটে নিয়ে যাচ্ছে। বিষয়টি আমরা আনোয়ারা থানায় অভিযোগ আকারে জানিয়েছি। পরে আদালতের শরণাপন্ন হয়েছি। আদালতের নির্দেশনার পরও জমিতে এক্সকাভেটর দিয়ে দিনে রাতে টপ সয়েল কাটা হচ্ছে। এখন প্রশাসনকে অবহিত করার পরও অদৃশ্য কারণে কোনো ব্যবস্থা নিচ্ছে না।
জুঁইদণ্ডি ইউনিয়নের সাবেক চেয়ারম্যান মোরশেদুর রহমান খোকা নামে স্থানীয় এক বিএনপি নেতার ছত্রছায়ায় এসব হচ্ছে বলেও অভিযোগ করেন তিনি।
ইমাম গ্রুপ সূত্রে জানা যায়, গত ৪ ডিসেম্বর তাদের কেয়ারটেকারকে জুঁইদণ্ডিতে পেয়ে ভয়ভীতি প্রদর্শন করে এসব ভূমিদস্যু চক্রের সদস্যরা। এ বিষয়ে সেদিনই থানাকে অবহিত করা হয়। জমির মাটি কেটে উর্বরা শক্তি বিনাশের বিষয়টিও গত ২৬ জানুয়ারি সহকারী কমিশনারকে (ভূমি) অবহিত করা হয়। পরে ২৭ জানুয়ারি ফৌজদারি কার্যবিধি আইনের ১৪৫ ধারার বিধান অনুসারে প্রতিপক্ষের বিরুদ্ধে প্রসিডিং ড্র করার আবেদন জানিয়ে অতিরিক্ত জেলা ম্যাজিস্ট্রেট আদালতে মামলাও করা হয়। এর প্রেক্ষিতে ভূমির দখল ও মালিকানা বিষয়ে স্কেচম্যাপসহ প্রতিবেদন দেওয়ার জন্য আনোয়ারা সহকারী কমিশনারকে (ভূমি) নির্দেশনা দেওয়া হয়। একই সঙ্গে আনোয়ারা থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তাকে নালিশি ভূমিতে দুপক্ষের মধ্যে শান্তি-শৃঙ্খলা রক্ষার ব্যবস্থা নিতে বলা হয়। আদালতের নির্দেশনায় থানা থেকে উভয় পক্ষকে নোটিসও দেওয়া হয়। এরপরও এক্সকাভেটর দিয়ে মাটি অপসারণ চলছে সমানে সমানে।
জানা যায়, ভূমিদস্যু দলটি ‘ভূমিহীন সমবায় সমিতির’ নাম ভাঙিয়ে পতিত সরকারের সময়ে স্থানীয় আওয়ামী লীগের প্রভাবশালীদের প্রভাব খাটিয়ে বিভিন্ন এলাকার বিস্তীর্ণ খাস জমি বেদখল করে নেয়। আর এক্সকাভেটর দিয়ে সেখানকার টপ সয়েল কেটে ফেলে। সেই মাটি বিভিন্ন স্থানে পাচারের পর সেখানে তৈরি হওয়া পুকুরে করা হয়েছে মৎস্য চাষ। চক্রটি এমন বেপরোয়া হয়ে গেছে যে সরকারি খাস জায়গার পর সেখানকার ব্যক্তিমালিকানাধীন ভূমিও তাদের কবল থেকে রক্ষা পাচ্ছে না। এখন তারা হামলে পড়ে ইমাম গ্রুপের ক্রয়কৃত জমির ওপর। গত ৫ আগস্টের রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর গোষ্ঠীটি ভোল পাল্টে রাতারাতি স্থানীয় এক বিএনপি নেতার আশ্রয়ে আবার পুরোদমে তৎপর হয়ে উঠেছে।
এক্সকেভেটর দিয়ে জমি থেকে টপ সয়েল কাটা প্রসঙ্গে জানতে চাইলে জুঁইদণ্ডি ইউনিয়নের সাবেক চেয়ারম্যান মোরশেদুর রহমান খোকার মোবাইলে কল করা হলে তিনি বলেন, ‘এসব বিষয়ে আমি জানি না। তবে শুনেছি ভূমিহীন সমিতির লোকজন এসব মাটি কাটছে। এই বিষয়ে আমাকে কেন ফোন করেছেন? বলে সংযোগ বিচ্ছিন্ন করে দেন অভিযুক্ত এই সাবেক জনপ্রতিনিধি।’
অভিযোগ প্রসঙ্গে আনোয়ারা থানার ওসি মনির হোসেন বলেন, ‘জুঁইদণ্ডিতে নানান সমস্যা। জোরপূর্বক মাটি কাটার বিষয়টি আমরা দেখছি। আদালতের যেকোনো নির্দেশনা মানতে আমরা বাধ্য। বিষয়টি নিয়ে আমরা কাজ করছি। কাউকে অন্যায়মূলক কাজ করতে দেওয়া হবে না।’