ফটিকছড়ি (চট্টগ্রাম) প্রতিবেদক
প্রকাশ : ২০ ফেব্রুয়ারি ২০২৫ ১৮:১১ পিএম
আপডেট : ২০ ফেব্রুয়ারি ২০২৫ ১৮:৩৩ পিএম
সংগীতগুরু ওস্তাদ নীরদ বরণ বড়ুয়া। ছবি : সংগৃহীত
সংগীতে বিশেষ অবদানের জন্য মৃত্যুর ২৫ বছর পরে মরণোত্তর একুশে পদক পেয়েছেন চট্টগ্রামের ফটিকছড়ির কৃতিসন্তান ও সংগীতগুরু ওস্তাদ নীরদ বরণ বড়ুয়া।
বৃহস্পতিবার (২০ ফেব্রুয়ারি) রাজধানীর ওসমানী স্মৃতি মিলনায়তনে প্রধান উপদেষ্টা ড. মুহাম্মদ ইউনূস প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত থেকে এ পদক তুলে দেন। শিল্পকলার সংগীত শ্রেণিতে পদক পাওয়া নীরদ বরণ বড়ুয়ার পদক গ্রহণ করেন তার মেয়ে শিল্পী ফাল্গুনী বড়ুয়া। মৃত্যুর ২৫ বছর পরে পদক পাওয়ায় সন্তোষ প্রকাশ করেছেন তার পরিবার ও শুভাকাঙ্ক্ষী।
ওস্তাদ নীরদ বরণ বড়ুয়ার বড় মেয়ে পুরবী বড়ুয়ার স্বামী মাস্টার অসীম কুমার বড়ুয়া বলেন, ওস্তাদ নীরদ বরণ বড়ুয়া একাধারে সংগীতশিল্পী, সংগীতগুরু, রচয়িতা, সুরকার ও নাট্যকার ছিলেন। উনার হাতে গড়া অসংখ্য ছাত্র-ছাত্রী সংগীতের বিভিন্ন ক্ষেত্রে সুনামের সঙ্গে সুপ্রতিষ্ঠিত। দেশের অনেক সংগীতগুরু ও সংগীতশিল্পী উনার শিষ্য। মৃত্যুর দীর্ঘদিন পরে হলেও সরকার ও সংস্কৃত মন্ত্রণালয় এ গুনীশিল্পীকে সম্মানিত করেছেন- এজন্য আমরা কৃতজ্ঞ। ফটিকছড়িবাসী সরকারকে ধন্যবাদ জানিয়েছেন।
পরিবার সূত্রে জানা গেছে, উপমহাদেশে শাস্ত্রীয় সঙ্গীতের উজ্জ্বল নক্ষত্র ওস্তাদ নীরদ বরণ বড়ুয়ার জন্ম ফটিকছড়ির আবদুল্লাপুর ইউনিয়নের গ্রামে ১৯৩৬ সালে। পিতা নিকুঞ্জ বিহারী বড়ুয়া ও মাতা বিরলা বালা বড়ুয়ার একমাত্র পুত্র সন্তান তিনি। আজীবন সত্যিকার অর্থে সঙ্গীতপ্রাণ এ মানুষটি ১৪ বছর বয়সে বাবা হারা হন এবং ১৫ বছর বয়সে সংগীতশিক্ষার উদ্দেশ্যে ভারতের কলকাতা যান। সেখানে তার প্রথম হাতেখড়ি হয় ওস্তাদ নাটু ঘোষের কাছে। তিন বছর যাবত নাটু ঘোষের কাছে সংগীতশিক্ষা লাভের পর তিনি বিশিষ্ট ধ্রুপদি গায়ক অনিল ঘোষের কাছে পাঁচ বছর ধ্রুপদি শিক্ষা নেন। এর পর ভর্তি হন অল-ইন্ডিয়া মিউজিক কলেজে। সেখানে সংগীতাচার্য্য প্রফুল্ল কুমার সেনের অধীনে সাত বছর শাস্ত্রীয় সঙ্গীতে জ্ঞান লাভ এবং স্নাতক প্রাপ্ত হন। পরে ১৯৬৫ সালে তিনি স্বদেশে ফিরেন।
তার বিকশিত সংগীত প্রতিভায় আকৃষ্ট হন চট্টগ্রাম পোর্ট ট্রাস্টের তৎকালীন সিনিয়র মেডিকেল কর্মকর্তা কামাল এ খান। তিনি নীরদ বরণ বড়ুয়াকে গভীর আগ্রহ ভরে নিজ ঘরে রাখেন এবং চট্টগ্রামের সুধী সমাজে তাকে পরিচয় করিয়ে দেন। ক্রমে তিনি চট্টগ্রাম বেতার কর্তৃপক্ষের সঙ্গে পরিচিত হন এবং তাদের অনুরোধে তিনি চট্টগ্রাম বেতারে যোগ দেন। পাক-ভারত উপমহাদেশের সুপ্রাচীন সংগীতকেন্দ্র, চট্টগ্রাম আর্য্য সংগীত সমিতি তাকে বরণ করেন এবং সমিতি পরিচালিত সুরেন্দ্র সংগীত বিদ্যাপীঠের একজন সংগীত শিক্ষক হিসেবে বরণ করেন। ওস্তাদ নীরদ বরণ বড়ুয়া আর্য্য সংগীত খ্যাত সুরেন্দ্র সংগীত বিদ্যাপীঠে দীর্ঘ ২৫ বছর অধ্যক্ষ পদে অধিষ্ঠিত থেকে চট্টগ্রামে শাস্ত্রীয় সংগীত ক্ষেত্রে নবযুগের সূচনা করেন এবং দেশে অসংখ্য গুণী শিক্ষার্থী সৃষ্টি করেন। যারা এখন দেশ-বিদেশে সুনামে সংগীত সাধনায় রত আছেন।
১৯৮৮ সালে তিনি আর্য সংগীত থেকে অবসর নেন। পরে বৃদ্ধ বয়সে শিক্ষার্থীদের অনুরোধে চট্টগ্রাম বৌদ্ধ বিহারের কাছে মোমিন রোডস্থ তার বাসভবনে আবার শিক্ষাদান শুরু করেন। যা বর্তমানে ‘সুর সপ্তক সঙ্গীত বিদ্যাপীঠ’ নামে পরিচিত। এখন পর্যন্ত সংগীত বিষয়কে ভিত্তি করে একমাত্র নাটক ‘সুরের সন্ধানের’ রচয়িতা নীরদ বরণ বড়ুয়া। নাটকটি পর পর দুইবার মঞ্চস্থ হয় এবং ব্যাপক প্রশংসা অর্জন করে। ওস্তাদ নীরদ বরণ বড়ুয়া রচিত সংগীতবিষয়ক অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ, প্রয়োজনীয় গ্রন্থ ‘আরোহ আবরোহ’ সংগীত পিপাসু, অনুরাগী ও সংগীত শিক্ষার্থীদের কাছে আলোর দিশারী হয়ে পথ দেখাচ্ছে। ২০০১ সালের ৯ আগস্ট সবাইকে শোকের সাগরে ভাসিয়ে ওস্তাদ নীরদ বরণ বড়ুয়া পরপারে পাড়ি জমান।
এর আগে ১৯৭৯ সালে শিক্ষা ক্ষেত্রে অবদানের জন্য একুশে পদকে ভূষিত হন ফটিকছড়ির বখতপুর ইউনিয়নের কৃতি সন্তান বিশিষ্ট শিক্ষা ও ভাষাবিদ ড. মুহাম্মদ এনামুল হক। ২০১৮ সালে ভাষা ও সাহিত্যে অবদানের জন্য একই পদকে ভূষিত হন উপজেলার সুন্দরপুর ইউনিয়নের ছিলোনীয়া গ্রামের আরেক কৃতিসন্তান লেখক সুব্রত বড়ুয়া।